সেলিনা হোসেনের ধারাবাহিক উপন্যাস : ১৮তম কিস্তি

salina_hossain1465394005

মশিরুল মৃদু হেসে ঘাড় নেড়ে সম্মতি দেয়। বলে, যা। পথে দেরি করিস না। তুই ফিরে না আসা পর্যন্ত আমি জেগেই থাকব রে। আচ্ছা, আমি সিনেমা শেষ হলেই চলে আসব। আপনি আমার জন্য একটুও ভাববেন না। মশিরুলের কানে লেগে থাকে দুইবার উচ্চারণ করা একই কথা। মায়া হয় ওর জন্য। ভাবে, সিনেমা দেখে ফিরে এলে ওকে টাকা দিয়ে বলবে, কাল তোর ছুটি। সারাদিন ঘুরে আয় কোথাও থেকে।

মশিরুল ওর দিকে তাকায় না। কথাও বলে না। ওকে শুধু মাথায় রাখে। ও ততোক্ষণে খবরের ভেতর ঢুকে গেছে। দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে যায় মঈন। দরজা বন্ধের শব্দ এক ধরনের ঝমঝম ঘূর্ণির যন্ত্রণা দেয়। মশিরুলের মনে হয় মাথাটা বুঝি ছিঁড়েই পড়ে যাবে। আসলে শব্দ দরজা থেকে আসেনি। স্মৃতির দরজা ঘূর্ণির সৃষ্টি করেছে। ওটা মগজের ভেতরে প্রবল বেগে বইছে। তারপরও ও পত্রিকার খবরের দিকে নজর দেয় এবং প্রতিটি শব্দ ভেতরে ঢোকাতে থাকে ‘ভোলার মনপুরায় মেঘনা নদীতে ট্রলারডুবির ঘটনার দ্বিতীয় দিনে আরো দুই শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখনও নিখোঁজ রয়েছেন পনেরো জন। এদিকে মেঘনাপাড়ের আকাশে-বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে স্বজনহারাদের শোকের মাতম। নিখোঁজদের সন্ধানে চলছে নদীতে ট্রলার নিয়ে স্বজনের উদ্ধার অভিযান। অন্যদিকে ট্রলার ডুবে মারা যাওয়া প্রত্যেকজনের পরিবারকে বিশ হাজার এবং আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি এগারো জনের প্রত্যেককে পাঁচ হাজার টাকা প্রদান করেছে প্রশাসন। এ ঘটনায় ট্রলার চালকের সহকারী মো. সুমনকে আটক করেছে পুলিশ।’

একটু পড়ার পরে খবর অন্য পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে। ওকে পাতা উল্টে এগারো পৃষ্ঠার পাঁচ নম্বর কলামে যেতে হবে। ওর মনে হয় দরজার কোনো শব্দ হয়নি। সেই কত বছর আগের ট্রলারের শব্দ এখন এই ঘরে। ও নিজেও ট্রলারে করে বাবাকে খুঁজেছে। আর পাড়ে দাঁড়িয়ে ওর মা বিলাপ করে কাঁদছিল। তার কান্নায় মেঘনা নদীপাড়ের আকাশে মাতম ছিল। এই ঘরেও সেই মাতমের ধ্বনি। আসলে সব ধ্বনি ওর বুকের ভেতর। ও দেখতে পায় ঘরের চারদিকে কাচের দেয়াল। চারদিকের দেয়ালে মেঘনা নদী। পাড়ে ওর মা। নদীতে যে ট্রলারটি স্বজনদের খুঁজছে তার সঙ্গে ও নিজেও আছে। বাবা নদীর কথা বলতেন। পূর্ববঙ্গের নদী কীভাবে এই ভূখণ্ডে পলিমাটি নিয়ে আসছে সেসব কথা বলতেন।

কাচের দেয়ালের ভেতর থেকে বাবা ওকে নীহারঞ্জন রায়ের বই থেকে পড়ে শোনাচ্ছেন, ‘এইসব নদনদী উচ্চতর ভূমি হইতে প্রচুর পলি বহন করিয়া আনিয়া বঙ্গের বদ্বীপের নিন্মভূমি গড়িয়াছে। সেই হেতু বদ্বীপ-বঙ্গের ভূমি কোমল, নরম ও কমনীয়। পশ্চিম, উত্তর এবং পূর্ববঙ্গের কিয়দংশ ছাড়া বঙ্গের প্রায় সবটাই ভূতত্ত্বের দিক হইতে নবসৃষ্ট ভূমি। বাংলার নদনদীগুলি ঐতিহাসিক কালে উদ্দাম প্রাণলীলায় কতবার যে পুরাতন খাত ছাড়িয়া নূতন খাতে, নূতন খাত ছাড়িয়া আবার নূতনতর খাতে বর্ষা ও বন্যার জলকে ছুটাইয়া লইয়া গিয়াছে তাহার ইয়ত্তা নাই।’

দুইহাতে চোখের পানি মোছে মশিরুল। বলে, কোমল নরম মাটির কোনো অতলে তুমি ঘুমাতে গেলে বাবা, যে শেষ দেখা আর দিলে না। মেঘনা নদীর কাছে যাব। নদীতে ভাসব। তোমার শরীরের ঘ্রাণটুকু নিয়ে ফিরে আসব। আবার এই বাড়ির ঘরগুলো তোমার আর মায়ের কথা বলবে। কখনও ফিসফিসিয়ে, কখনও জোরে জোরে। যেভাবে মা কাঁদতে কাঁদতে বলতেন তোমার কথা ঠিক সেভাবেই।

মশিরুল পৃষ্ঠা উল্টে খবরের শেষ অংশ পড়তে থাকে : ‘মনপুরা উপজেলার রামনেওয়াজ ঘাট থেকে শুক্রবার সন্ধ্যায় শিশুসহ দুজনের লাশ উদ্ধার করেছেন স্থানীয় জেলেরা। সারাদিন স্বজনহারাদের দেখা গেছে, ট্রলার নিয়ে মেঘনা নদীতে নিখোঁজদের সন্ধান করতে। নূরুন্নাহার নামের এক মহিলার আর্তনাদে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। তার দুই সন্তান রনি, জনি আর স্বামী বেল্লালসহ তিনিও ডুবে গিয়েছিলেন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করেছেন। বাঁচানো যায়নি ছেলে রনিকে। রনির লাশ উদ্ধার করেছেন জেলেরা। তবে এখন পর্যন্ত তার স্বামী এবং জনি নিখোঁজ রয়েছেন। তারা নারায়ণগঞ্জ থেকে ভোলার মনপুরার কলাতলীর চরে বোনের বিয়ে উপলক্ষে যাচ্ছিলেন। একই অবস্থা উপজেলার দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের বিবি হালিমা ও সাবিহা খাতুনের।

অসুস্থতার খবর পেয়ে দাদিকে দেখতে আসার সময় ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ হয়েছে আট বছরের শিশু জান্নাত। গতকাল সন্ধ্যায় জান্নাতের লাশ উদ্ধার করেন জেলেরা। এদিকে যে ট্রলারডুবিতে এসব মানুষ মারা গেছেন, সেই ট্রলার মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হলেও মামলা নিতে পুলিশ গড়িমসি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও গণমাধ্যমকর্মী ও স্থানীয়দের চাপের মুখে ট্রলারের হেলপার মো. সুমনকে আটক করেছে পুলিশ। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এ ঘটনায় মামলা হয়নি। তবে মনপুরা থানার ওসি জানান, এ ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। মামলার প্রস্তুতি চলছে। এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

খুব মনোযোগ দিয়েই খবরটি পড়ে মশিরুল কাগজটা ভাঁজ করে নিজের পড়ার টেবিলে রাখে। ভাবে, মনপুরায় গেলে এসব পরিবারের খোঁজ করবে। কিংবা করতে নাও পারে। বরং খোঁজ করবে সেইসব পরিবারকে যারা তার বাবার সঙ্গে নিখোঁজ হয়েছিলেন। তাদের নাম-ঠিকানা লেখা আছে ওর ডায়েরিতে। কোথাও ওর বাবার কবর নেই- এই সত্য মেনে নিতে পারেনি ওর মা। কবরের কাছে দাঁড়িয়ে দোয়া পড়া হলো না। এমন মৃত্যু কেন হবে মানুষের? তবে ওর মা যতদিন ঠিকমতো চলাফেরা করেছে ততদিন বছরের সেই তারিখটিতে মা-ছেলে মনপুরা গিয়েছে। মেঘনা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দোয়া পড়েছে মা। বলেছে, নদী তুই মানুষটাকে গিলে ফেললি কেন? কী অপরাধ করেছিলাম আমরা তোর কাছে? নদীরে।

মায়ের বাঁধভাঙা চোখের পানির সাক্ষী মশিরুল মা মারা যাওয়ার পরে আর তেমন করে মেঘনা নদীর ধারে যায়নি। নদী কাঁদায়-হাসায়। নদী মাছ ধরার সুযোগ দিয়ে ভাতের জোগান দেয়। চিকিৎসার পয়সা দেয়। পড়ালেখারও সুযোগ করে দেয়। নদী চলাচলের ব্যবস্থা করে। যার কাছ থেকে এতকিছু নেওয়ার আছে তার তলানিও কিছু চায়- এটা মশিরুলের ধারণা। দেওয়া-নেওয়া সাঙ্গ করে প্রকৃতিও। আজকের খবরটিও তো তেমনই। হয় মৃত্যু, না হয় নিখোঁজ। অথবা জীবিত উদ্ধার।

কাগজটা রেখে ঘর থেকে বের হতেই শুনতে পায় দোতলার ধুপধাপ আওয়াজ। ও বুঝে যায় যে শরীফ আর নিশাত মারামারি করছে। প্রায়শ এমন ঘটনা ঘটে। সঙ্গে আছে চিৎকার এবং গালাগালি। পরে নিশাতের কান্না। সম্পর্কের টানাপোড়েনের নির্মম শব্দ ওর কানে এসে পৌঁছায়। ও দরজায় হেলান দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। দেখতে পায় এক স্থবির রাত ওর চারপাশে ঘন অন্ধকার চিত্রিত করেছে। ও জানালার কাছে এসে দাঁড়ালে দুজনের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ও স্পষ্ট শুনতে পায়। ওইসব কুৎসিত শব্দ না শোনার জন্য ও জানালা বন্ধ করে পর্দা টেনে দেয়। ডাইনিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ায়।

একদিন নিশাত ওকে বলেছিল, যতদিন তোমার জীবনে কেউ না আসবে ততদিন তুমি আমাকে আশ্রয় দাও। তোমার জীবনে কেউ এলে আমি নিঃশব্দে সরে যাব। কেউ কিছু জানবে না।

শুরুটা এমনই ছিল।

নিশাতের সঙ্গে আড়ালে-আবডালে সম্পর্ক ভালোই দাঁড়িয়েছে। শরীফ ব্যবসার সূত্রে বিভিন্ন সময় দেশের বাইরে থাকে। ঢাকায় থাকলেও অনেক রাতে বাড়ি ফেরে। সকাল দশটার মধ্যে বেরিয়ে যায়। বাড়িতে নিশাত মেয়েকে নিয়ে সময় কাটায়। ওকে স্কুলে দিয়ে এলে ঘরে কেউ থাকে না। আত্মীয়স্বজন মাঝে মাঝে আসে। তাতে তেমন কোনো বাধা হয়নি। দুজনের সমঝোতার জায়গা সুযোগের ব্যবহারে গিট্টু বেঁধেছে। এবং ভালোই চলছে।

শুরুর পরিণতি অন্যরকম করে তুলতে চাইছে নিশাত। দুদিন আগে বলেছে, শরীফের উপর প্রতিশোধ নিতে চাই। ওর সঙ্গে ঘর করে আমি তোমার কাছ থেকে একটি সন্তান চাই। মশরু, তুমি আমাকে নিরাশ করো না।

মশিরুল এমন একটি প্রস্তাবে খুশি-অখুশির দ্বন্দ্বে ছিল। খুশির কারণ ছিল, একক জীবনযাপন করার ব্রত নিয়ে একটি সন্তানের বাবা হওয়া তো আনন্দের। কোনোদিন নিশাত যদি বাচ্চাটির দায়িত্ব নিতে বলে তাহলে নেবে। খুশি হয়েই নেবে। আর অখুশি ওর কাছে দ্বিধার শব্দ হয়েছিল। কাজটি সঙ্গত কি-না সেই প্রশ্নে দ্বিধা।

নিশাত দুদিন পরে আবার জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি তো কিছু বললে না মশরু?

আমাকে ভাবতে দাও নিশু।

আমার সঙ্গ কী তোমার কাছে আনন্দের না?

গভীর আনন্দের। যতদিন এই আনন্দ থাকবে ততদিন আমি অন্য নারীর কথা ভাবব না।

শরীফ যদি এই বাড়িতে না থাকে, তখন?

তখনেরটা তখন বুঝব। এখন ভাবব না।

সেদিন নিশাত আর কিছু বলেনি। মশিরুলের বুকে মাথা ঘষতে ঘষতে বলেছিল, জীবনটা কষ্টের। অ্যাডজাস্ট না হলে তো ভালোবাসা থাকে না। ভালোবাসাহীন যৌন সম্পর্ক অবৈধ। বিয়ের স্বীকৃতি থাকলেই কি সন্তান বৈধ হয়? আমার ভেতরে অনেক প্রশ্ন মশরু।

প্রশ্ন নিয়ে জীবন কাটানোতে থ্রিল আছে। প্রশ্নহীন সম্পর্ক তো তাপহীন নিশু। আমি তো তাই মনে করছি। কিন্তু সমাজ বলে একটি ব্যবস্থা আছে। এই ব্যবস্থা মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে। তাকে মেনে চলতে হয়। মানুষ তো যার যার খুশিমতো জীবন কাটাতে পারে না। তাহলে প্রবল অনাচারের সৃষ্টি হবে।

তোমার বক্তৃতা থামাও মশরু। তুমি যা বলছ এসব তো আমিও জানি। আমি কি এসব বুঝি না মনে করছ?

মশিরুল হা-হা করে হেসেছিল সেদিন।

নিশাত তর্জনী তুলে শাসিয়ে বলেছিল, হাসি থামাও। হাসছ কেন?

হাসব না তো কী করব? আমরা সবই বুঝি, আবার এসবের বাইরেও যেতে যাই। আনন্দ খুঁজি। তাই না নিলু?

খুঁজবই তো। খুঁজব না কেন? আমি কি রোবট?

মোটেই না। তুমি গতির মানুষ। গতি তোমাকে শক্তি দেয়। শক্তি তোমার ইমাজিনেশন বাড়িয়ে দেয়। তখন তুমি তীব্রগতিতে ছুটতে পারো।

আজ তোমার হয়েছে কী মশরু?

কথা কি বেশি বলছি?

তাইতো দেখছি। মনে হচ্ছে বাতাসের বেগে ছুটছে তোমার কথা।

ঠিক আছে চুপ করলাম।

আমি তোমার ঠোঁটজোড়া বন্ধ করে দেই?

দাও।

নিশাত যখন চুমুতে ভাসিয়ে দিয়েছিল আমাকে, আমার তখন বাবার বলা নদীর কথা মনে হচ্ছিল। বাবা পড়ছিলেন নীহাররঞ্জন রায়ের ‘বাঙালীর ইতিহাস’। আর মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম আমি- ‘বাংলার এই নদীগুলি সমগ্র পূর্ব ভারতের দায় ও দায়িত্ব বহন করে। উত্তর ভারতের প্রধানতম দুইটি নদী গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের বিপুল জলধারা, পলিপ্রবাহ এবং পূর্ব-যুক্তপ্রদেশ, বিহার ও আসামের বৃষ্টিপাতপ্রবাহ বহন করিয়া সমুদ্রে লইয়া যাইবার দায়িত্ব বহন করিতে হয় বাংলার কমনীয় মাটিকে। সেই মাটি সর্বত্র এই সুবিপুল জলপ্রবাহ বহন করিবার উপযুক্ত নয়। এই জলপ্রবাহ নুতন ভূমি যেমন গড়ে, মাঠে যেমন শস্য ফলায়, তেমনই ভূমি ভাঙেও, শস্য বিনাশও করে। বাঙালি ক্রোধভরে পদ্মাকে বলিয়াছে কীর্তিনাশা, পদ্মা বাঙালির অনেক কীর্তিই নাশ করিয়াছে সত্য; অথচ এই মেঘনা-পদ্মাই তো আবার স্বর্ণশস্যের আকর; এই পদ্মার দুই তীরে তো বাংলার ঘনতম মনুষ্যবসতি, সমৃদ্ধ ঐশ্চর্যের লীলা।’

মশিরুল সেদিন নিশাতকে বলেছিল, তুমি আমার নদী গাঙ্গেয় বদ্বীপ।

তাহলে আজ থেকে আমাকে বদ্বীপ ডেকো। আমি একটি ভূখণ্ড হতে চাই। সে ভূখণ্ড, হাজার বছরের ইতিহাসে যে ভূখণ্ড একটি স্বাধীন দেশ হয়েছে।

বাহ্। বেশ সুন্দর করে বললে বদ্বীপ। থ্যাঙ্কু। এই স্বাধীন দেশের জন্য নিখোঁজ হয়েছেন একজন মানুষ। তার রক্তাক্ত শরীরটি লাশের জিপের পেছনে বেঁধে নিয়ে গিয়েছিল নিষ্ঠুর সৈনিকরা।

কার কথা বলছ?

লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন।

ওহ, কত জীবনদান। তোমার বাবা তোমাকে যেভাবে ইতিহাস শুনিয়েছেন আমার বেলায় তা হয়নি। আমার বাড়িতে লেখাপড়া কম ছিল। টাকা ওড়ানোর নেশা বেশি ছিল। সেজন্য আমি অনেক জানাশোনা থেকে দূরে রয়ে গিয়েছি। তবে মাইশাকে আমি তোমার মতো করে বড় করে তুলব।

ভেরি গুড। তাহলে ও আমার মেয়ে হবে।

নিশাতের দৃষ্টি খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। গুনগুন করে গাইতে গাইতে সিঁড়ি দিয়ে উঠেছিল। শফিকুলের মনে হচ্ছিল সিঁড়ির এক একটি ধাপ নিশাতের জীবনের এক একটি পর্যায়। আজ এই মধ্যরাতে ও তেমন একটি পর্যায়ে আছে। এই সিঁড়ি কীভাবে ছড়িয়ে আর একটিতে কীভাবে পা রাখবে সেই চিন্তা এখন ওর মাথায় ঢুকেছে। মশিরুল জানে, নিশাত জেদী নারী। যা ভাবে সেটা করেই ছাড়ে। না করে ও ছাড় দেবে না।

উপরতলা নিশ্চুপ হয়ে গেছে। আর কোনো শব্দ নেই। মশিরুল ফ্রিজ থেকে বিরিয়ানি বের করে ওভেনে দেয়। গরম করে নিয়ে টেবিলে আসে। কোকের ক্যান ফ্রিজ থেকে বের করে আনে। সঙ্গে পুডিংও। সবকিছুই নিশাত নিজের হাতে করে। তারপর ওর জন্য নিয়ে আসে। খেতে বসে মনে হয় মঈন ফিরছে না কেন। ঘড়ি দেখে। না, সিনেমা হয়তো এখন শেষ হয়েছে। রাস্তায় কিছুক্ষণ সময় তো লাগবেই। ও ধীরেসুস্থে খাওয়া শেষ করে। প্লেট- গ্লাস ধুয়ে রাখে। চারদিকে তাকিয়ে দেখে আর কিছু করার আছে কি-না। না, মঈন রান্নাঘর সুন্দর করে গুছিয়ে রেখেছে। কোথাও এলোমেলোভাবে কিছু রাখা নেই। ও সুইচ অফ করে। ডাইনিং স্পেসের বাতিটা জ্বালিয়ে রেখে বেডরুমে আসে। বেডশিট উঠিয়ে রেখে বিছানা ঠিক করে। মশারি টাঙায়। নিশাত একদিন বলেছিল, তুমি যখন বিয়ে করবে তখন নতুন একটি খাট কিনবে। এই খাটটি অন্য ঘরে নিয়ে রাখবে। আমার স্মৃতিস্বরূপ।

মশিরুল সেদিন ওকে কিছু বলেনি। এ ধরনের আবেগের সঞ্চয় ওর বাবা-মায়ের জন্য আছে। বাবার জন্য মেঘনা নদীর পাড়ে ঘুরে আসা। মায়ের কবরে যাওয়া। কবরের ধারে বসে থেকে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কথা শোনা, যারা দুটো টাকার জন্য ওর পেছনে পেছনে আসে। মোনাজাতের সময় ওর সঙ্গে হাত তুলে দোয়া পড়ে। যেটুকু ওদের জানা আছে সেটুকুই হয়তো পড়ে। মশিরুল জানতে চায় না যে, ওরা কতটুকু জানে। মা-বাবার কাছ থেকে কতটুকু শিখেছে সেটুকুই জানে ওরা। শুধু জানতে চায়, কী দিয়ে ভাত খেয়েছে, স্কুলে যায় না কেন। বাবা কী করে, মা কী করে। ওরা অবলীলায় নিজেদের কথা বলে। বলতে বলতে হা-হা হি-হি হাসিতে ভরিয়ে তোলে নিজেদের। কতটুকু কাঙ্খিত হয়ে বড় হচ্ছে, সে কথা ওদের কেউ বলে না। মশিরুল মায়ের না থাকার দুঃখ বুকে নিয়ে ওদের জন্যও দুঃখ নিয়ে বাসায় ফেরে। এ এক অন্যরকম দুঃখবোধ। ও জানে, ওর কাছে এর কোনো সমাধান নেই। সেজন্য দুঃখের মাত্রা গভীর। বাবা যে সঞ্চয় দিয়ে গেছে তা দিয়ে ও নিজের ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা করে। তাহলে ওর কৃতিত্ব কোথায়? ও নিজেকে উত্তর দেয়, ভবঘুরে জীবনে। আবারও প্রশ্ন, ভবঘুরে জীবনে তুমি নিজেকে ধরে রাখতে পারনি। তুমি অত্যন্ত ঘরমুখী ছেলে। নিশাতের সঙ্গে সম্পর্ক তোমার যাযাবর জীবনের কথা বলে না। নিজেকে এড়াতে চেও না মশিরুল। তোমার বাবা সংসারী হয়েও তিনি যাযাবর জীবনের আচরণ করেছেন। ঘুরেছেন নদীতে, ঘুরেছেন দেশের আনাচে-কানাচে। সুযোগ পেলেই বাইরে যাওয়ার ডাক নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। হাঃ, মশিরুল জীবনের পরিসর এত ছোট নয়। তোমার বোঝায় ঘাটতি আছে মনে রেখো। ও শুয়ে পড়ে। নিজেকে এভাবে খতিয়ে দেখা ওর অভ্যেস। এটাকে ও বাবার শাসন মনে করে। এই বয়সেও বাবার শাসন ওর চাই। মাঝে মাঝে ওর এমনই হয়। জহিরুল বলে, বেশি একা একা থাকলে এমনই তো হবে। তখনও মনে মনে কাউকে না কাউকে আঁকড়ে ধরতে হয়।

মশিরুল তেড়ে উঠে বলে, তুই কি করে জানিস? তুই তো একা থাকিস না?

এসব জানতে হয় না। এসব বোঝা যায়। এ ধরনের বোঝার ইচ্ছা সব মানুষেরই থাকা উচিত।–(চলবে…)