জমে উঠেছে ঈদের অর্থনৈতিক বাজার

index

সময়ের কণ্ঠস্বর – জমে উঠেছে ঈদের বাজার, শবেবরাত, রোজা ও ঈদকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী টাকার প্রবাহ বাড়ে। এই টাকার বড় অংশ ব্যয় হয় খাবার-দাবার, পোশাক, ভ্রমণ, ভোগবিলাস ও প্রসাধনীতে। বেড়ে গেছে ঈদকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ। প্রতিবছরই বড় হচ্ছে দেশের ঈদের অর্থনীতি। এবছর ঈদকেন্দ্রিক এই অর্থনীতির আকার হতে পারে ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা।

ঈদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এতদিন পোশাক, খাবার আর জুতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন মানুষ ঘরের আসবাবপত্র, ফার্নিচার সামগ্রী, ইলেকট্রনিক পণ্য কিনছে। একইভাবে মানুষ ঈদ উপলক্ষে একে অন্যকে উপহার দিচ্ছে বা পাঠাচ্ছে। ঈদকে কেন্দ্র করে অনলাইনে ব্যবসাও (ই-বিজনেস) বেড়েছে। এখন এই উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষজন পরিবার পরিজন নিয়ে দেশ-বিদেশে ভ্রমণেও যাচ্ছে। ঈদ উদযাপনকে উছিলা করে মানুষ ব্যয় করছে সাধ্য অনুযায়ী। ঈদ কেন্দ্রিক অর্থনীতির বিস্তার এখন শাড়ি, লুঙ্গি থেকে শুরু করে নতুন গাড়িতে গিয়ে ঠেকেছে।

ঈদকে কেন্দ্র করে বিভিন্নভাবে দেশে টাকার প্রবাহ বাড়ে। সমৃদ্ধ হয় ঈদ অর্থনীতি। ঈদ অর্থনীতিতে যেসব খাত থেকে অর্থের যোগান হয় সে খাতগুলো হচ্ছে- সরকারি বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস, প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিটেন্স, মানুষের জমানো আয়, রাজনৈতিক নেতাদের দান অনুদান বা ঈদ বখশিশ, মানুষের জাকাত-ফিতরা, রোজা ও ঈদকে কেন্দ্র করে চাঙা হওয়া শহর ও গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোয় উৎপাদিত পণ্যের বিক্রিত অর্থ, মৌসুমী ফল বিক্রির অর্থ, ব্যাংকগুলোর ছাড় করা কৃষিঋণ, সরকারি দান অনুদানের অর্থ যুক্ত হয় ঈদ অর্থনীতিতে।

ঈদ অর্থনীতির বেশির ভাগই ব্যয় হয় গ্রামে। এই সময়টাতে শহরের তুলনায় গ্রামে টাকার প্রবাহ বাড়ে। চাঙা হয় গ্রামীণ অর্থনীতি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে দেশের ৫৭টি ব্যাংকের সারাদেশে শাখা রয়েছে ৮ হাজার ৮৪৯টি। এর মধ্যে গ্রামীণ শাখা ৫ হাজার ৪৯টি। যা মোট শাখার ৫৭ দশমিক ১১ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতে শহরের তুলনায় গ্রামীণ শাখাই বেশি। ব্যাংকগুলোয় গ্রামের আমানতের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা এবং ঋণের পরিমাণ ৫২ হাজার কোটি টাকা। রোজা ও ঈদ উপলক্ষে এ টাকার একটি অংশ গ্রামেও খরচ হয়। এছাড়া বিভিন্ন এনজিও ও গ্রামীণ ব্যাংক থেকেও টাকার প্রবাহ বাড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে ২০১২ সালের রোজা শুরুর আগের মাসে জুনে রেমিট্যান্স এসেছিল ১০৭ কোটি ডলার। কিন্তু রোজার শুরুর পর জুলাইয়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ১২০ কোটি ১২ লাখ ডলার। এর পরের মাসে আগস্টে তা আবার কমে দাঁড়ায় ১১৭ কোটি ডলার। ২০১৩ সালে জুনে রেমিট্যান্স এসেছিল ১০৫ কোটি ডলার। ওই বছর রোজা শুরুর মাস জুলাইয়ে এসেছিল ১২৩ কোটি ৮১ লাখ ডলার। ঈদের পরে আগস্ট মাসে তা কমে দাঁড়ায় ১০০ কোটি ডলার। ২০১৪ সালের রোজা শুরুর আগে মে মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ১২১ কোটি ডলার। রোজা শুরুর পর জুন মাসে তা ১২৮ কোটি ৭০ লাখ ডলারে উন্নীত হয়। আবারও জুলাইয়ে আরও বেড়ে ১৪৯ কোটি ২৫ লাখ ডলারে উন্নীত হয়। পরের মাস আগস্টে রেমিট্যান্স কমে ১১৭ কোটি ৪৪ লাখ ডলারে নেমে আসে। ২০১৫ সালে ১৯ জুন থেকে রোজা শুরু হলেও এর আগের মাসে অর্থাৎ মে মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৩১ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। ওই বছর ১২ জুন পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৬০ কোটি ৪২ লাখ ডলার।

একইভাবে রোজা ও ঈদের সময় যাকাত-ফিতরার টাকা যুক্ত হয় ঈদ অর্থনীতিতে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র হিসাব মতে, প্রতিবছর যাকাত ও ফিতরা বাবদ রোজা ও ঈদের মাসের অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে বাড়তি ৬০ হাজার ৪শ’ কোটি টাকা। যদিও এ টাকার একটি বড় অংশই চলে যায় গ্রামে। রোজা ও ঈদে নানা কর্মসূচিতে শহরের চাকরিজীবীরা গ্রামে যাচ্ছেন। যে কারণে গ্রামেও টাকার প্রবাহ বাড়ে। এছাড়া গ্রামের দরিদ্র মানুষের সহায়তার জন্য শহরের লোকজন সাধ্য অনুযায়ী অর্থের জোগান দিচ্ছে।

জানা গেছে, ঈদে সবচেয়ে বড় বেচাকেনা হয় পোশাক। সারাদেশের ফ্যাশন হাউসগুলোয় আনুমানিক ছয় হাজার কোটি টাকার পোশাক বেচাকেনা হয়। সারা বছর তাদের যে ব্যবসা হয়, তার অর্ধেকই হয় রোজার ঈদে।

রাজধানীর ইসলামপুরে প্রতিদিন গড়ে ৫০-৬০ কোটি টাকার কাপড়ের ব্যবসা হয়। ঈদের আগে কখনো কখনো তা শতকোটি টাকায়ও গিয়ে ওঠে। রাজধানী ঢাকার ইসলামপুরের ব্যবসায়ীদের অনুমান, এখানে বছরে ১৮-২০ হাজার কোটি টাকার পোশাকের বেচাকেনা হয়। এর ৩০-৪০ শতাংশ বিক্রি হয় রোজার মাসে। রোজার ঈদে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরেও ঈদের পোশাকের একটা বিরাট বাজার দখল করে আছে ভারত-পাকিস্তান থেকে আসা নানা পোশাক। ওই বাজারটা স্বাভাবিকের তুলনায় অন্তত তিনগুন বেশি হবে। এই পোশাকের বাজার হতে পারে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার মতো বলেই মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

ঈদে আপ্যায়নের অন্যতম আনুষঙ্গ হচ্ছে সেমাই। কয়েকটি সেমাই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ঈদুল ফিতরে দেশে আনুমানিক কমবেশি ৭০ লাখ কেজি নানা প্রকার সেমাইয়ের চাহিদা থাকে। সর্বনিম্ন দাম ধরলেও ঈদের সময় আনুমানিক ১০৫ থেকে ১০৯ কোটি টাকার সেমাই বেচাকেনা হয়।

ঈদের সময় কেনার তালিকায় থাকে অলঙ্কার। ঈদের পরপরই বিয়ে-শাদির ধুমও পড়ে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) বলছে, সারাদেশে ১০ হাজার জুয়েলারির দোকান আছে। রমজান মাসে প্রতিটি দোকানে কমবেশি দুই ভরি করে বিক্রি হলেও ২০ হাজার ভরি স্বর্ণালঙ্কার বেচাকেনা হয়। টাকার অংকে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৯০ থেকে ১০০ কোটি।

ঈদ অর্থনীতি প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেছেন, ঈদের সময় সারাদেশেই অর্থের প্রবাহ বাড়ে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খাত হলেও সব মিলিয়ে তা বিশাল পরিমাণের অর্থনীতিতে রূপ নেয়। ঈদ ও রোজাকে কেন্দ্র করে শহর বা গ্রামের উভয় এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মানেও পরিবর্তন দেখা দেয়। এ সময় ব্যয় করার জন্য দেশের সবাই কিছু না কিছু অর্থ বরাদ্দ রাখেন। অর্থের যোগান রাখেন।