অনেকেরই অজানা নীলফামারীর নীল উৎপাদন প্রক্রিয়া

ও্রুনব

অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম সরকার: নীলফামারীর নীল উৎপাদন প্রক্রিয়া অবিভক্ত ভারতের অন্যান্য স্থানের মতোই অভিন্ন ছিল। নীলগাছগুলো কাটার পর রায়ত নৌকা বা গরুর গাড়ি বোঝাই করে নীল কারখানায় নিয়ে আসার পর, কারখানার দশাসই চেহারার এক কর্মচারী ছয় ফুট লম্বা লোহার চেন দিয়ে এক এক আঁটি বাধার মতো করে সেগুলো মেপে নিতো। রায়ত নীলকর্মচারিকে ঠিকমতো ঘুষ দিতে পারলে অপেক্ষাকৃত কম গাছেই এক আঁটি নীল গাছের জন্য সে ১ টাকা মূল্য পেতো। গাছগুলো মাপা হয়ে গেলে কুলিরা গাছগুলো নিয়ে যেতো জোরা চৌবাচ্চায়। চৌবাচ্চার মধ্যে পাতা ওপর-নিচ করে গাছগুলো সাজানোর পর তাতে পানি ভরা হতো। গাছগুলো যাতে ভেসে না ওঠে সে কারণে বাঁশ দিয়ে নীলগাছগুলো চেপে রাখা হতো। রাত্রি বেলায় পানিভরা চৌবাচ্চায় ৮-১০ ঘন্টা ডুবিয়ে রাখার পর সকালে নীলকররা ভিজিট করতে আসতো এবং পরীক্ষা করে দেখতো চৌবাচ্চার পানির উপরিভাগে বেগুনি ও তামাটে নীল রঙ্গের ফেনা জমেছে কিনা তা পরীক্ষা করতো এবং পানির তাপমাত্রা মাপার জন্য পানিতে থার্মোমিটার ডুবিয়ে দিতো। নীলকর বিশেষজ্ঞরা যদি মনে করতো তাহলে উপরের চৌবাচ্চার তলার ছিপি খুলে ফেলার নির্দেশ প্রদান করতো। সে সময় তরলের রঙ হতো কমলা বর্ণের এবং গন্ধ হতো কটু। উপরের ছিপি খুলে দেয়ার কারণে নীচের চৌবাচ্চায় অক্সিজেনের স্পর্শ পেয়ে তরল হলুদ ফেনা সহ সবুজাভ রং ধারণ করতো। ওপরের চৌবাচ্চায় পড়ে থাকা গাছগুলো পরে উঠিয়ে নেয়া হতো। পাতাগুলো নীলের জমির সার হিসেবে এবং গাছগুলো বয়লারেরর জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা হতো। নিচের চৌবাচ্চায় রঙ্গিন তরল সম্পূর্ণ জমা হওয়ার পর, দশজন কুলি একসাথে ঝাপিয়ে পড়তো চৌবাচ্চার মধ্যে। কোমর সমান নীল পানিতে দুই সারিতে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাঁশের লাঠির সাহায্যে আঘাত দিয়ে অবিরত নীল পানি গুলো নাড়াতে থাকতো। আর এ কাজটি ধারাবাহিক ভাবে আড়াই ঘন্টা ধরে একযোগে গলা মিলিয়ে নানা রকমের আন্চলিক গান গাইতো। আর এ প্রক্রিয়ায় পানি নাড়ানোর ফলে রঙ্গিন তরলগুলো যথেষ্ট পরিমানে অক্সিজেন সরবরাহ হলে নীলকরদের নির্দেশে কুলিরা লাফ দিয়ে উপরে উঠে আসতো। কুলিরা এ কাজটি করতো একযোগে এবং ঠিক তার আগেই চৌবাচ্চার মধ্যে তারা শেষবারের মতো একবার পাক খেয়ে নিতো যাতে করে চৌবাচ্চার মধ্যে ঘূর্ণির সৃষ্টি হয়। ফলে পানির ঘূর্ণি শেষ হলে চৌবাচ্চার নিচে চমৎকার নীল রঙ্গের তলানি জমতে শুরু করে। পরবর্তীতে ওপরের দিকের লালচে রঙ্গের পানি ফেলে দিয়ে নীল রঙ্গের তলানি পাশের ভবনের বয়লারে পাম্প করে নিয়ে যাওয়া হতো। বয়লারে ফুটানোর সময় ঐ ঘন নীল মাঝে মাঝে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে নাড়ানো হতো।

প্রায় দু’ঘন্টা ফুটানোর পর আরও ঘন হয়ে যাওয়া নীল সামান্য গভীর চৌবাচ্চার ওপর বিছিয়ে রাখা চাদরের ওপর ছড়িয়ে রাখা হতো তলানী ঝরানোর জন্য। তারপর, নীল বিছানো চাদর ভাঁজ করে, তার ওপর চাপ প্রদান করা হতো অতিরিক্ত পানি বের করে ফেলার জন্য। জমাট বেধে যাওয়া নীল এরপর সাবানের মতো আয়তাকার বড় বড় পিন্ডে পরিণত হতো। এই বার গুলো পরে তিন থেকে সাড়ে তিন বর্গ ইঞ্চি মেপে কেটে নিলেই তৈরি হয়ে যেতো নীলের কেক। এই কেকের গায়ে কোম্পানির নাম ও তৈরির তারিখ ছাপ মেরে দেওয়া হতো। এরপর বারগুলো শুকানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হতো ড্রাইং রুমে। সেখানে সুন্দর করে একর পর এক শেলফে কেকগুলো রেখে দেওয়া হতো প্রায় মাস তিনেকের মতো। ভেজা অবস্থায় প্রতিটি কেকের ওজন হতো গড়ে প্রায় ২৪ আউন্স। আর, শুকানোর পর ওজন হ্রাস হয়ে সেই কেক পরিণত হতো আট আউন্সে। পরিশেষে নীল কেকগুলো বাক্সে ভরে পুরাকালের সাকামাছা বন্দর হয়ে নদী পথে কলকাতা পাঠানো হতো নিলামের জন্য।

লেখক- আইনজীবি, ইতিহাস গবেষক ।