গ্রামকে ভুলতে পারি না

untitled-4_207093

জন্মেছিলাম ফেনীর দাগনভুঁইয়ায়। শৈশব-কৈশোরের সোনালি দিনগুলো কেটেছে গ্রাম-মফস্বলের মানুষ আর প্রকৃতির সঙ্গে। ২০০৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে চলে এলাম ঢাকায়। ভর্তি পরীক্ষায় চতুর্থ হয়ে অনেকটা ইচ্ছা করেই ভর্তি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগে।

আবাসন সমস্যা, খাদ্যের মান নিয়ে বিড়ম্বনার কারণে শুরুর দিকে মফস্বল থেকে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে একটু বেগ পেতে হয়েছে। এক সময় সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করি। কিছু দিন পর টের পেলাম আমাদের পড়াশোনা অনেক ক্ষেত্রেই রোমান্টিক হয়ে যাচ্ছে। পড়া পড়া আর পড়া। কিন্তু কেন পড়ছি, কী পড়ছি_ এর উত্তর সেভাবে জানা ছিল না। তখন উপলব্ধি করলাম, আসলে পড়াশোনার মৌলিক কাজ হচ্ছে আমাদের জীবন-জগতের যে সমস্যা আর প্রস্তাবনা আমরা প্রতিনিয়ত সামনে দেখি তাকে প্রশ্ন করা, প্রবলেমেটাইজ করা। আর এ সমস্যা ও প্রস্তাবনায় নয়া জ্ঞান তালাশ করা। এসব কাজ না করলে আমাদের এই পড়াশোনাটা একটা নীতিবাগীশতায় রূপান্তরিত হয়। অনেক পড়লাম, কিন্তু কাজে না লাগাতে পারার ফলে এসব ব্যর্থ হয়ে যায়। ফলে পড়াশোনায় একটা নয়া দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। বিভাগের পড়াশোনার সমান্তরালে আধুনিক রাষ্ট্রের ভেতরে নারীপ্রশ্ন, মানুষের জীবন-আইন-সংস্কৃতি যে জটিল আকারে হাজির ছিল তা নিয়ে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক জানাশোনায় আগ্রহী হয়ে উঠি। অনার্স-মাস্টার্স দুটিতেই মেধা তালিকায় ছিলাম। সিজিপিএ আসে ৩.৮৪।

বিষয় হিসেবে উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজে পড়ার কারণে নারীপ্রশ্নে কিছু মৌলিক চিন্তা নাড়া দেয়। কেননা, একাডেমিক জগতে একালে নারীর প্রশ্ন খুবই সংবেদনশীল; কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক। পুঁজিতান্ত্রিক বাজার ব্যবস্থার বয়ান যেমন আছে, তেমনি আছে নানা উন্নয়ন তত্ত্ব। বাজারে নারীকে তোলা খুবই জরুরি। কারণ পুঁজির দরকার নরম আঙুল ও অসম্ভব সহ্য শক্তিসম্পন্ন সস্তা শ্রম। আরও সুবিধা, তাজরীন ফ্যাশনে পুড়িয়ে মারলে কিংবা রানা প্লাজায় জ্যান্ত কবর দিলেও কোনো তীব্র প্রতিবাদ হয় না। নারীর প্রাণ এতই সস্তা।

আসলে আমাদের সমাজে পুরুষতন্ত্র নানা স্তরে নানা কায়দায় কাজ করে। ফলে নারীর প্রশ্ন নানা রেজিস্টারে মীমাংসা জরুরি। ধর্ম, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি_ সর্বস্তরেই এমনকি টেস্টোস্টেরন ও প্রজেন্সটেরনের নির্গমনের বিচারও দরকার। সেদিক থেকে আগ্রহী হয়ে উঠি নারীপ্রশ্নে আমাদের বর্তমান সমাজে হাজির নানা ইস্যুতে কাজ করার।

ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তাত্তি্বক ও ব্যবহারিক প্রশ্নের উত্তর তারা দিতে পারবে বলে সন্দেহ তৈরি হয়েছে অনেক আগেই। সেটা প্রকটভাবে ধরা পড়ে নারীপ্রশ্নে আলোচনার ক্ষেত্রে। দর্শন, রাজনীতি, আইন, সংস্কৃতি ইত্যাদি দিক থেকেও এটি প্রকট আকারে ধরা পড়ে। ফলে দুনিয়াব্যাপী এসব প্রশ্নে চিন্তার যে মারাত্মক সংকট চলছে এবং আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরে মানুষের জীবন, নারী ইস্যুসহ অসংখ্য বিষয় যে অমীমাংসিত রয়ে গেছে, তা নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হয়ে উঠি।

একাডেমিক জগতে এসব প্রশ্নে প্রবল আগ্রহের কারণেই মাস্টার্স শেষের পরই যোগদান করি বাংলাদেশ আর্মি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানের প্রভাষক হিসেবে। পড়াশোনাকে নিছক পড়াশোনা আকারে না দেখে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোর ভেতরে মানুষের জীবন-আইন-সংস্কৃতির জটিলতা রূপান্তরের লড়াইয়ের অংশ হিসেবে নিয়ে কাজ করছি এখন। গ্রামের ছেলে বলে গ্রামকে এখনও খুব মিস করি। আমার জীবনের প্রিয় স্মৃতি সেই দাগনভূঁঁইয়া আর আলামপুর গ্রাম। মাঝে মধ্যে ভাবি, গ্রামগুলোকে আমরা শহুরে মধ্যবিত্তরা কি আমাদের উপনিবেশ বানিয়ে নিচ্ছি না? তাদের জীবন আর সংস্কৃতির নানা বিষয়ও নাড়া দেয় প্রতিনিয়ত।

প্রভাষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ আর্মি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।