‘জঙ্গি হুমকিতে তিন মন্ত্রীসহ ৩৪ ভিআইপি’

57007_189

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- সরকারের তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, ১ সংসদ সদস্য এবং ৩০ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি জঙ্গি হামলার হুমকিতে রয়েছেন। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, ব্লগার ও নিম্ন আদালতের বিচারক রয়েছেন। এসব ব্যক্তির চলাচলে সতর্কতা পালন করতে সরকারের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

বুধবার এক জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের শীর্ষ এক গোয়েন্দা সংস্থা থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ওপর সম্ভাব্য হামলা সংক্রান্ত নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে মৌলবাদী উগ্র জঙ্গি সংগঠন কর্তৃক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ওপর সম্ভাব্য হামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বলা হয়েছে, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম, সংসদ সদস্য ইকবালুর রহিম, সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনতাসীর উদ্দিন খান মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. একে আজাদ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. আআমস আরেফিন সিদ্দিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাবেরী গায়েন, অধ্যাপক আরাফাত রহমান, অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, ঢাকার সাবেক চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) বিকাশ কুমার সাহা।

এছাড়া সাংবাদিক আবেদ খান, শ্যামল দত্ত, মুন্নি সাহা, অঞ্জন রায়, নবনিতা চৌধুরী ও মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, ভাস্কর ফেরদৌস প্রিয়ভাষিণী, ৭১-এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবীর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, রামেন্দু মজুমদার ও সৈয়দ হাসান ইমাম, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার, গণজাগরণ মঞ্চের একাংশের সভাপতি কামাল পাশা, ব্লগার শাহিন রেজা, মাহমুদুল হক মুন্সি বাঁধন, আরিফ জেবতিক, কানিজ আকলিমা সুলতানা, এফএম শাহীন, সঙ্গীতা ইমাম এবং ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসুর জীবননাশের হুমকি রয়েছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহল, উগ্র মৌলবাদী সংগঠন কর্তৃক হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপতৎপরতা অব্যাহত রাখার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্লগার আহমেদ হায়দার রাজিবকে হত্যার পর ডক্টর অভিজিৎ রায়, নিলাদ্রি চ্যাটার্জি ওরফে নিলয়, আশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাসসহ সারা দেশে বেশকিছু মুক্তচিন্তক, ব্লগার, বিদেশি নাগরিক এবং ধর্মীয় যাজক, পুরোহিতকে হত্যা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়।

সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকী এবং ঢাকায় কলাবাগানে সমকামীদের অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব তনয়কে হত্যা করা হয়েছে।

এসব ঘটনায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ উগ্র মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠনের সম্পৃক্ততা প্রকাশ পেয়েছে। বিগত সময়ে উগ্র মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠী বিভিন্ন সংগঠনের নামে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি, মুক্তচিন্তক, কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছে।

সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকায় কলাবাগানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের পর সারা দেশে ক্ষোভ ও আতঙ্ক রয়েছে।

সম্ভাব্য হামলার ধরণ সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুষ্কৃতকারীরা অপারেশন চালানোর আগে বেশ কিছুদিন ধরে ভিকটিমদের গতিবিধি রেকি করে থাকে। ভিকটিমের বাসায়, অফিসে প্রবেশ করে বা ভিকটিম বাসা থেকে বের হওয়ার সময় বা বাসায় ফেরার সময় আবাসস্থলের কাছে আক্রমণের শিকার হয়েছেন।

তবে অভিজিৎ রায়কে বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ৩ নং গেটের কাছে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। জঙ্গিগোষ্ঠী টার্গেট কিলিং হিসেবে তাদের অপারেশন পরিচালনা করে আসছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কিলিং অপারেশনে অংশ নেয়া ব্যক্তিরা উন্নতমানের ছোট আগ্নেয়াস্ত্র ও বোমা বহন করলেও প্রায় সবক্ষেত্রে ধারালো চাপাতি ব্যবহার করে ভিকটিমকে ঘাড়ে ও মাথায় আঘাত করার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। ঘটনাস্থল থেকে পালানোর সময় বাধা পেলে আগ্নেয়াস্ত্র/বোমা ব্যবহার করতে দেখা গেছে। ঘটনার সময় তারা সাধারণত প্যান্ট, শার্ট, টি-শার্ট পরিধান এবং ছোট ব্যাগ বহন করতে দেখা গেছে।

ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, সংঘটিত ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণের সময় দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা সতর্কতার কারণে বর্তমান সময়ে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা হামলার শিকার হচ্ছেন।

বিশেষ প্রতিবেদনে পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বর্তমানে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করছে এবং ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত করতে এবং দেশে-বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে স্বার্থ হাসিলের জন্য স্বার্থান্বেষী মহল টার্গেট কিলিংয়ের মাধ্যমে গুপ্তহত্যা চালাচ্ছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক ভাবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোসহ জনগণকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে ১৬টি সুপারিশ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, জঙ্গিগোষ্ঠীর কাছ থেকে প্রাণনাশের হুমকি পাওয়া এবং হামলার শিকার সম্ভাব্য ব্যক্তিদের নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন। হামলার শিকার হওয়ার সম্ভাব্য ব্যক্তিদের বাসভবন/কর্মস্থল, বাসভবন/কর্মস্থল থেকে বের হওয়া ও ফিরে আসার সময়, অনুষ্ঠানস্থলে অবস্থানকালীন সময়ে এবং চলাচলের পথে পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা রাখা দরকার।

এছাড়া, ঢাকা মহানগরীতে বসবাসরত হামলার শিকার হওয়া সম্ভাব্য ব্যক্তিদের তালিকা সংশ্লিষ্ট থানায় সংরক্ষণ করে তাদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যায়। জঙ্গি সংগঠনগুলোর আর্থিক সহায়তা দেয়া প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দল এবং সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যায়।