বাঙালিয়ানায় শাড়ি এবং শাড়ি নিয়ে যত কথা (পর্ব ১)

shari-somoyerkonthosor

মেহেদী হাসান গালিব, সময়ের কণ্ঠস্বর-

সেই আবহমানকাল থেকে বাঙালি সংস্কৃতির সাথে যে জিনিসগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, তার অন্যতম একটি হল শাড়ি। একজন বাঙালি নারীর সাজ তখনই পরিপূর্ণতা পায়, যখন সে শাড়ি পরিধান করে। শাড়ি যেনো একজন নারীর রুপ বহুগুণে বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। ‘শাড়ি’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘শাটী’ শব্দ থেকে, যার অর্থ ‘পরিধেয় বস্ত্র’। কিন্তু আমাদের দেশে শাড়ি শুধুমাত্র একটি পরিধেয় বস্ত্রই নয়, এটি আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির ধারক ও আমাদের বাঙালিয়ানার স্বাতন্ত্র্য পরিচায়ক। তাই শাড়ি তৈরিতে এর কারিগররা তাদের সর্বোচ্চ মেধা ও সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়ে থাকেন এবং সুঁই-সুতা ও রং দিয়ে শাড়ির প্রতিটি পরতে আঁকেন বাঙালিয়ানার ছাপ। তাতে মিশে থাকে আমাদের সবুজ শ্যামল প্রকৃতির গল্প, মিশে থাকে গ্রাম বাংলার সহজ সরল মানুষদের জীবনযাপনের গল্প। আমাদের দেশের শাড়ির কারুকাজ এতোই চমকপ্রদ ও মনোমুগ্ধকর যে বহু বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিক তাঁদের সাহিত্যে এই শাড়ির উল্লেখ করেছেন।
আমাদের দেশের শাড়িগুলো বৈচিত্র‍্যে ভরপুর। এদের রয়েছে বিভিন্ন শ্রেণিবিভাগ। একেক অঞ্চল আবার একেক শাড়ির জন্য বিখ্যাত। প্রতিটি শাড়ি তাদের নিজস্ব স্বাতন্ত্রে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। বাংলাদেশের তেমনি কিছু বিখ্যাত শাড়ির নাম হল জামদানি, বেনারসি, রেশমী শাড়ি, তাঁতের শাড়ি, কাতান শাড়ি ও পাবনার শাড়ি। এদের মধ্যে জনপ্রিয় কিছু শাড়ির স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য ও বর্ণনা নিচে উল্লেখ করা হল।
১। জামদানি: ‘জামদানি’ শব্দটি এসেছে ফার্সি ভাষা থেকে। ফার্সি ভাষায় ‘জামা’ অর্থ ‘কাপড়’ এবং ‘দানা’ অর্থ ‘বুটি’। অর্থাৎ জামদানি অর্থ হল ‘বুটিদার কাপড়’। প্রাচীন মিহি মসলিন কাপড়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে জামদানি অত্যন্ত সুপরিচিত। মসলিন কাপড়ের উপর নকশা করলে তা হয়ে যায় জামদানি। জামদানি বলতে সাধারণত শাড়িকে বোঝানো হলেও জামদানি দিয়ে নকশী ওড়না , কুর্তা , পাগড়ি, রুমাল, পর্দা এমনকি শেরওয়ানিও তৈরি করা হয়।
প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের দেশে জামদানি শাড়ির বেশ কদর রয়েছে। সেই মুঘল আমল থেকেই জামদানি শাড়ি দেশে-বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। তখনকার সময়ে, ১৭৭৬ সাল পর্যন্ত উৎকৃষ্টমানের জামদানির মূল্য ছিল ৪৫০ টাকা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকার ডেমরায় জামদানি পল্লীর তাঁতিদের আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয়। তবে মেধা আর পর্যাপ্ত পারিশ্রমিকের অভাবে তাঁতীরা আর এ পেশায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। বর্তমানে ঢাকার মিরপুরে জামদানি পল্লী স্থাপন করা হয়েছে।
বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠানে এখনো ব্যাপকভাবে জামদানি ব্যবহৃত হচ্ছে। বিপুল চাহিদা ও বাংলার প্রাচীন ইতিহাস ধরে রাখার জন্য জামদানি শিল্পের উত্তরোত্তর উন্নতি সাধন হচ্ছে।
২। বেনারসি: বেনারসি শাড়ির মূল উৎপত্তিস্থল ভারতের বেনারস শহরে। মুসলিম তাঁতিরা বংশ পরম্পরায় এই শাড়ি তৈরি করে আসছেন। কিন্তু ঠিক কবে থেকে এর সূচনা হয়েছে তা আজও অজানা। তবে প্রচলিত আছে যে বেনারসি শাড়ির তাঁতীদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন আনসারী। বেনারসের পুরোনো বাসিন্দাদের মতে, বেনারসের তাঁতশিল্পীদের নব্বই শতাংশই এই আনসারদের বংশধর!
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ভারতের বেনারস থেকে কয়েকটি পরিবার বাংলাদেশে চলে আসলে এদেশেও বেনারসি শিল্পের বিকাশ ঘটে। তারা মিরপুর ও পুরান ঢাকায় বসবাস করতে শুরু করেন এবং সেখানেই বেনারসি শাড়ি তৈরি করতে থাকেন।
বেনারসি শাড়ি তৈরিতে কাঁচা রেশম সুতার সাথে ব্যবহার হয় জরি সুতা। দেশীয় কাঁচা রেশম সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় তাঁতিরা চায়না সিল্ক সুতা ব্যবহার করে থাকেন। সহজ বুননের একটি বেনারসি শাড়ি তৈরি করতে একজন তাঁতির সময় লাগে প্রায় এক সপ্তাহ। আবার কঠিন বুননের একটি শাড়ি তৈরিতে তিনজন তাঁতির সময় লাগে প্রায় তিন মাস।
বেনারসি শাড়ির রং, কারুকাজ ও নকশায় বেশ বৈচিত্র্য দেখা যায়। ধরন বা নকশার ভিত্তিতে বেনারসি শাড়ির রয়েছে বিভিন্ন নাম। যেমন: ব্রোকেট কাতান, পিরামিড কাতান, মিরপুরী রেশমি কাতান, বেনারসি কসমস, চুনরি কাতান, প্রিন্স কাতান ইত্যাদি।
৩। কাতান শাড়ি: বেনারসি শাড়িরই আরেকটি ধরণ হল কাতান শাড়ি। দেশবরেণ্য ফ্যাশান ডিজাইনার এমদাদ হকের ভাষ্যমতে, ‘জ্যাকার্ড হ্যান্ডলুমে টানা ভরনায় দেওয়া আছে রেশম সুতো আর তাঁতির বুননের সাথে সাথে জমিনে ভেসে উঠছে বেনারসি মোটিফের লতা, ফুল, কলকা ইত্যাদি। এরই নাম কাতান শাড়ি’।
কাতানের সূত্রপাত ভারতের বেনারস থেকে হলেও কারিগররা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে কাতানের ডিজাইনে আমূল পরিবর্তন এনেছেন। মিরপুর বেনারসি পল্লীর বেনারসি কারিগর এবং ব্যবসায়ীরা হরেক রকম ডিজাইন এবং বাহারি রঙের কাতান শাড়ি তৈরি করে চলেছেন। শুধুমাত্র মিরপুরেই সীমাবদ্ধ নেই কাতান শাড়ি। টাঙ্গাইলের তাঁতিরাও তৈরি করছেন ফুলসিল্ক টাঙ্গাইল কাতান। এসব কাতান শাড়ি শুধু ব্যবহারের জন্যই আরামদায়ক নয়, দামেও সাধ্যের নাগালে। ৩০০০ টাকা থেকে ১০০০০ টাকার মধ্যেই পাওয়া সম্ভব একটি ভালো মানের কাতান শাড়ি।
আগে বিয়ে বাড়ি বা রাষ্ট্রীয় কোনো বড় উৎসবে কাতান শাড়ি ছিল মহিলাদের পছন্দের শীর্ষে। হালকা কাজের দেশি কাতানের চাহিদা ছিল ব্যাপক। তরুণীদেরও বিশেষ পছন্দ সিম্পল ডিজাইনের কাতান শাড়ি। মাঝখানে অনেকটা সময় ধরে কাতান শাড়ির চল হারিয়ে গেলেও তা এখনো বিলুপ্ত হয়ে যায়নি।

শাড়ি নিয়ে আরো অনেক কিছুই আপনাদের জানাবো পরের লেখায়।