জামালপুরে বুনোহাতি আতঙ্কে ২০ হাজার মানুষ

আবদুল লতিফ লায়ন, জামালপুর প্রতিনিধি:


2.jpgng

জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার ভারতীয় সীমান্তবর্তী ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নের গারো পাহাড় বেষ্টিত দশটি গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষ সব সময় বুনো হাতির আতঙ্কে থাকেন। তাদের রাত কাটে নির্ঘুম। গত ৫ বছরে বুনো হাতির আক্রমনে সাত জন নিহত ও প্রায় দুই শতাধিক মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। এ সময় ওই এলাকার কৃষকের ধান সহ প্রায় দশ কোটি টাকার বিভিন্ন ফসল খেয়েছে ভারতীয় বুনো হাতির পাল। এ ছাড়া কমপক্ষে তিন শতাধিক ঘরবাড়ি তছনছ ও কোটি টাকা মূল্যের বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা ভেঙ্গে নষ্ট করেছে হাতির পাল। হাতির আক্রমণ বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকরি কোনো প্রদক্ষেপ নেই বলে জানিয়েছেন গ্রামবাসী।

জানা গেছে, বকশীগঞ্জ উপজেলা ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নের প্রায় ১০টি গ্রাম ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত ঘেষাঁ। উল্লেখিত এলাকায় বাংলাদেশ ও ভারতের ভূখন্ডে রয়েছে বিশাল বনভূমি। বাংলাদেশের বনাঞ্চল অপেক্ষাকৃত সমতল। ভারতের গহীন বনাঞ্চলে রয়েছে অগণিত বুনো হাতি। হাতি দল বেধেঁ সমতল ভূমিতে চলাফেরা ও আহার করতে সহজ মনে করে থাকে। তাই বোরো ও আমন মৌসুম সহ সময়-অসময়ে বুনো হাতির পাল সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নের সাতানিপাড়া, গারোপাড়া, বালুঝরি, দিঘলাকোনা, লাউচাপড়া, হাতিবেড়কোনা, শোমনাথপাড়া, চন্দ্রপাড়া, হারিয়েকোনা গ্রামের সমতল বনাঞ্চলের আবাসিক ও কৃষিপ্রধান এলাকায় চলে আসে।

সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে বসবাসরত অসংখ্য বাড়িঘর ফসলাদি জমি ও বিভিন্ন বাগানে প্রবেশ করে গাছপালা দুমড়ে মুচড়ে সাবাড় করে ধ্বংসলীলা চালায়। এ সময় বুনোহাতির আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে আগুন জালিয়ে হৈ হুলোড় করে বাঁশ দিয়ে ফটকা বানিয়ে ঢাকঢোল পিঠিয়ে হাতি তাড়ানো চেষ্টা করে গ্রামবাসী। গত পাচঁ বছরে বুনো হাতির আক্রমণে বালিজুরি গ্রামের ইরফান আলী (২২), হামির উদ্দিন বাবুল (৩৫), শোমনাথপাড়া গ্রামের ফিলিপ সাংমা (৪৫), খ্রিষ্টানপাড়া গ্রামের ষ্টারসন (৪০), ঝুলগাঁও গ্রামের মজিবর রহমান (৫০), সিরাজ মিয়া (৩৮) ও সবশেষ চলতি বছরের ২৪ এপ্রিল সাতানিপাড়া গ্রামের সাজু মিয়া (২৫) সহ অন্তত সাত জনের প্রানহানি ঘটেছে। আহত হয়েছে প্রায় দুই শতাধিক মানুষ।

সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ পাহাড় থেকে লাকড়ি সংগ্রহ এবং পাহাড়ের পাদদেশে চাষাবাদ করে কোনো রকম জীবিকা নির্বাহ করে। ক্ষুধা, দারিদ্র, অশিক্ষিত, অস্বাস্থ্য ও বঞ্চনা তাদের নিত্যসঙ্গী। এর ওপর প্রতি বছর মার্চ-এপ্রিল এবং অক্টোবর-নভেম্বর মাসের প্রায় দিনই বুনো হাতির আক্রমণে দিশেহারা করে দিয়েছে তাঁদের। হাতির আতঙ্কে এমনিতে অনেক জমি পতিত থাকছে। ঝুঁকি নিয়ে আবাদ করলেও তাঁরা ফসল ঘরে তুলতে পারছেন না। ফলে পাহাড়ি জনপদের মানুষগুলো হাতির সঙ্গে যুদ্ধ করে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

এ ব্যাপারে গ্রামবাসী জানান, গত পাচঁ বছরে বুনোহাতির পাল ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নের দশটি গ্রামে বিভিন্ন ফসল সহ কমপক্ষে ১০ কোটি টাকার ক্ষতি করেছে।

উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, উপজেলার সীমান্তে দশ গ্রামের তিন শতাধিক কৃষকের প্রায় ৪৫০ একর জমির বিভিন্ন ফসল নষ্ট করেছে হাতির পাল। প্রতি বছর ৫০ লাখ টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এই উপজেলায় গত দশ বছরে আনুমানিক ৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

এ ব্যাপারে লাউচাপড়া গ্রামের মুক্তার আলী বলেন, বুনোহাতির বিচরণ এলাকায় পর্যাপ্ত খাবার নেই। ক্ষুধার্ত হলেই লোকালয়ে চলে আসে হাতির পাল। আর তখনই কেউ না কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এ ব্যাপারে দিঘলাকোনা গ্রামের আদিবাসী পিটিসং সাংমা বলেন, আমাদের জীবন জীবিকার জন্য পাহাড়ে কলা, হলুদ, আদা এবং পাদদেশের ফাঁকে ফাঁকে ধান চাষ করি। এসব ফসল খাওয়ার জন্য হাতির দল লোকালয়ে চলে আসে। প্রতিরোধ করতে গেলেই হাতির দল তাদের ওপর চড়াও হয়। এমনকি বাড়িঘরে হামলা চালায়।

এ ব্যাপারে ধানুয়া কামালপুর ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, হাতিই সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের বড় সমস্যা। হাতির সাথে যুদ্ধ করেই জীবন কাটছে এই অঞ্চলের মানুষের। তবে সমস্যা সমাধানে সরকারের প্রতি সীমান্তবর্তী মানুষের জন্য বড় কোন প্রকল্পের উদ্যোগ গ্রহনের দাবি জানান।

বকশীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল হামিদ সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, ‘হাতিধারা আক্রান্ত কৃষকদের সহযোগিতা করার মত কোনো প্রকল্প এখনও হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহযোগিতার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলে তিনি জানান।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুব্রত পাল সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, হাতি তাড়াতে বিভিন্ন প্রশিক্ষন দেয়া হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রকল্পের উদ্যোগ নেয়া হবে।