ঔষধি গাছ বদলে দিয়েছে ১০ গ্রামের মানুষের ভাগ্য

nator-owsud-18-06-16 - small

তাপস কুমার, নাটোর প্রতিনিধি: নাটোর শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের গ্রাম খোলাবাড়িয়া। গ্রামে প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে সবুজের সমারোহ। রাস্তার দুই পাশের জমিতে শুধু গাছ আর গাছ। তবে যেন-তেন গাছ নয়। অনেক জটিল রোগ সারানোর ক্ষমতা নিয়ে জন্মায় এ সব গাছ। গাছের পরিচয়েই খোলাবাড়িয়ার গ্রামটিকে ডাকা হয় ‘ঔষধি গ্রাম’ নামে।

সরজমিনে লক্ষীপুর,খোলাবাড়ীয়া থেকে হয়ে কাঠালবাড়িয়া পর্যন্ত রাস্তার দুধারে দেখা যায় নানা ধরণের ঔষধি গাছের সমারোহ । এগুলোর মধ্যে রয়েছে ঘৃত কমল, স্বর্ন লতা, পাথরকুচি, উলট কম্বল ,ঘৃত কৃমারী, শতমুল, মিছরীদানা, তুলশী, থানকুচি, জার্মানীলতা, হরীতকী, বহেরা, আমলকি, চিরতা ,তালমাখনা, তেলাকুচি বাসক, তাল মাখনা অশ্বগন্ধা , শিমুল মূল, লজ্জাবতী সাদা লাল, হস্তি গন্ধা ,তেজবল , দুধরাজ ,নাগেশ্বর ,আমরুল, ঘোড়া চান্ডাল, কাল ধুতরা, ঘিয়া বাবলা, লতা কস্তরী, আলকুচি অপরিচিতা, ভুই কুমরাসহ নান প্রজাতির গাছ।

খোলাবাড়ীয়া গ্রামের জয়নাল আবেদীন জানানলেন, ঔষধি গাছের ওপর খোলাবাড়ীয়া, খামারপাড়া, আমির গঞ্জ, হিসুলী, কাঠালবাড়ীয়া,এতিম মোড়, চৌরী, দক্ষিণপুর, মোল্লার মোড়, বড়বড়িয়া, ইব্রাহীমপুর গ্রামের প্রায় ৮০০জন চাষী নির্ভরশীল। তারা নানা প্রজাতির ঔষধি গাছের চাষ করে আসছেন প্রায় দুদশক থেকে। কিন্তু বিক্রি করার জন্য সে ধরণের কোন বাজার গড়ে না উঠায় তারা পড়েছেন বিপাকে।

আইয়ুব আলী নামে একজন চাষী জানান, বর্তমানে সিলেট কুমিল্লা ঢাকা চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থান থেকে কিছু কিছু লোকজন এসে ঔষধি গাছ কিনে নিয়ে যান। তবে সেটার পরিমাণ বেশী নয়। এ কারনে স্থানীয় কিছু দরিদ্র লোকজন এ সমস্ত ঔষধি গাছগুলো নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ফেরী করে বিক্রি করেন। যদি বড় কোন কোম্পানী এখান থেকে ভেষজ গাছগুলো সংগ্রহ করতেন তা হলে চাষীরা উপকৃত হতে পারতেন। তবে সম্প্রতি আমল পরিবর্তন হয়েছে অনেক খানী। স্থানীয়ভাবে আমিরগঞ্জ বাজারে ঔষধি গাছ প্রক্রিয়া জাত করে বিক্রি করা শুরু হয়েছে। এখানে গড়ে উঠেছে ৮/১০টি দোকান। সমস্ত দোকানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ঔষধি গাছ থেকে গুড়া বা ডাষ্ট তৈরী ও প্যাকেটজাত করে বিক্রি করা শুরু করেছেন। এতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঔষধি গুন সম্পন্ন পণ্য গুলো পাঠানো সহজ হচ্ছে। চাষীরা ও লাভের মুখ দেখতে পারছেন। ঔষধি গ্রামটিকে পরিচিত করে তোলার নেপথ্যে রয়েছেন আফাজ উদ্দিন। তিনি স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে আফাজ পাগলা নামে পরিচিত।

লক্ষীপুর খোলাবাড়ীয়া ইউনিয়নের নব-নির্বাচিত চেয়ারম্যান বাতেন ভুইয়া জানান, ওষধি গাছের ওপর নির্ভর করেই অনেকে হয়েছেন স্বাবলম্বী, পাল্টে ফেলেছেন জীবনযাত্রা। উদ্যোগটি লাভজনক হওয়ায় পার্শবর্তী গ্রাম গুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে ওষধি গাছের চাষ। স্থানীয় লোকজন জানান, প্রায় ৪০বছর আগের কথা। খামখেয়ালি প্রকৃতির আফাজ উদ্দিন তার নানির কাছ থেকে ঔষধি গাছের গুণাগুণ জানতে পারেন। এরপর নানা ধরনের ঔষধি গাছের চাষ এবং কবিরাজি চিকিৎসা শুরু করেন। শুধু নিজেই চাষ করে থেমে থাকেননি। অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করেন ঔষধি গাছ লাগাতে। প্রথমে তার কথায় কেউ গুরুত্ব না দিলেও ধীরে ধীরে সবাই বুঝতে পারে এটি খুবই লাভজনক উদ্যোগ। ওই গ্রামের ভেষজ বিক্রেতারা জানান, বহু বছর ধরে আফাজ পাগলার পরামর্শে তারা ঔষধি গাছের চাষ শুরু করেছেন। এতে তারা অন্যান্য ফসলের চেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন।

আলাপকালে আফাজ উদ্দিন বলেন, ‘একাত্তর সালের যুদ্ধের সময় আমার কঠিন ব্যাধি হইছিল। ব্যাধির পর দেখা গেল কোনো চিকিৎসাপত্রতে কাজ হইতাছে না। তহন আমার নানি কিছু গাছ-গাছড়ার চিকিৎসা করত। নানির কাছে চিকিৎসা কইরা আমি ভালো হইলাম। তহন থাইক্যা গাছের প্রতি আমার একটা টান সৃষ্টি হইল। নানির কাছ থাইক্যা গাছের গুণাগুণ শিখলাম। এহন মানুষের চিকিৎসা করাই আর ওষুধের গাছ লাগাইতে পারামর্শ দিই। দূর-দূরান্ত থাইক্যা লোকজন আসে চিকিৎসা নিতে। আল¬ার রহমতে তাদের উপকার হয়। আর আমার দেহাদেহি খেলাবাড়িয়া গেরামসহ আশপাশের গেরামের লোকজন ওষুধের গাছের চাষ করতাছে। আমার পরামর্শ হইল বাড়ির আশপাশে ওষুধের গাছ লাগান।’ আফাজ উদ্দিনের বয়স অনেক, তারপরও থেমে নেই ঔষধি গাছ চাষের উৎসাহ। বর্তমানে বিভিন্ন স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের বিনামূল্যে গাছের চারা সরবরাহ করেন। তার ইচ্ছা একদিন সমগ্র নাটোর ঔষধি গ্রাম হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে।

আফাজ পাগলা কৃষিক্ষেত্রে অবদানের কৃতিস্বরূপ২০০৯ সালে ‘চ্যানেল আই কৃষি পদক’ পান। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে পেয়েছেন বেশ কয়েকটি পুরস্কার। অবসরে তিনি একাকী থাকতে পছন্দ করেন। অবসর সময়টুকু আধ্যাত্মিক গান গেয়ে অতিবাহিত করেন। বর্তমানে ঔষধি চাষ সম্প্রসারণ এবং বাজার জাত করার সুবিধার্থে স্থানীয় ঔষধি চাষী এবং ব্যবসায়ীলা সম্মিলিত ভাবে গঠন করেছেন নাটোর ঔষধি গ্রাম সংগঠন । এই সংগঠনের অন্যতম নেতা মোতালেব হোসেন বলেন, দেশে নানা বিধ আয়ুরবেদিক কোম্পানী রয়েছে । তারা যদি এখান থেকে ভেষজ ঔষধ তৈরীর জন্য ওষধি গাছগুলো কিনতো তাহলে চাষিদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটতো। কিন্তু তারা এখানকার উৎপাদিত সামগ্রী না কিনে ভারত থেকে আমদানি করে নিয়ে আসছে যা আমাদের জন্য দুঃখ জনক।

রজব আলী নামে আমির গঞ্জের একজন চাষী জানান, এক বিঘা কুমারী চাষ করতে প্রথম বছর দেড় থেকে দুই লাখ টাকা খরচ হয়। পরবর্তী বছরে খরচ হয় ৮০ থেকে একলাখ টাকা। কিন্তু বিক্রি হয় তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা। ঘৃত কুমারীর মধ্যেই আমরা অন্যান্য ঔষধি গাছের চাষ করে থাকি। হাসান নামে অপর একজন কৃষক জানান, এপি বা হামদর্দের প্রতিনিধিরা নাটোরে এসে ৩’শ গ্রাম ঘৃত কুমারীর দাম ধরেন ৭ থেকে আট.শ টাকা । অথচ অন্য ফরিয়াদের কাছে আমরা একই পরিমাণ পণ্য বিক্রি করি সাড়ে চার থেকে ৫ হাজার টাকা । একারণে আয়ুরবেদিক কোম্পানী গুলোর কাছে ঔষধ বিক্রি করে আমাদের লাভ হয়না। তরাও তেমন আসেনা। হাসান আলী ঔষধি চাষ সম্প্রসারণের জন্য ব্যাংক ঋন সুবিধা সহ সরকারী পৃষ্ট পোষকতা দাবি করেন।

হৃদয়/এসএস