বাঙ্গালিয়ানায় শাড়ি এবং শাড়ি নিয়ে যত কথা (শেষ পর্ব)

shari-somoyerkonthosor
মেহেদী হাসান গালিব, সময়ের কণ্ঠস্বর-

বাঙ্গালিয়ানায় শাড়ির ব্যাবহারের নানান কথা বলেছিলাম আগের লেখায়। বাহারি নকশার, বাহারি ডিজাইনের এসব শাড়ি সেকাল থেকে একাল অব্দি মন কেড়ে চলেছে সব বয়সী নারীদের। আজ আপনাদের জানাবো আরো কিছু শাড়ির কথা।
৪। রেশমি শাড়ি : প্রাচীন লেখকরা চীন দেশকে রেশমের আদিবাস বলে মত প্রকাশ করলেও জেমস টেলর অনুমান করেন, পৃথিবীর প্রথম রেশম উদ্ভাবিত হয় বাংলাদেশে। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে এর প্রচুর প্রমাণ পাওয়া যায়। ফার্সি শব্দ ‘রেশম’ এর বাংলা অর্থ হল ‘গরদ’। এছাড়াও কৌষের, পট্ট, অংশপট্ট, কীট্টতন্তু, কীটজ প্রভৃতি নামে বিভিন্ন সংস্কৃত গ্রন্থে রেশমের উল্লেখ আছে। রেশমি শাড়ি তৈরি মোটেই সহজ কাজ নয়।
সুন্দর এক খণ্ড রেশমি শাড়ি তৈরির জন্য লাগে প্রায় ছয় হাজার রেশম পোকা। চলতি ভাষায় এই পোকার নাম পলু। পলুকে লালন করতে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, বাতাসের আর্দ্রতা, আলো, বাতাস নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দূষণ থেকে রক্ষা করার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। নির্দিষ্ট সময় পর এ গুটিপোকায় গুটি বা কোকন তৈরি হয়। কাটঘাই ও মেশিন রিলিং এই দুই মাধ্যমে পোকা থেকে সুতা তৈরি করা হয়ে থাকে।
রাজশাহী সিল্ক হল দুই জাতের। একটি দেশি, অন্যটি সংকরিত। হলদে রঙের দেশি জাতকে খারি করে নিলেই ক্রিম রঙের হয়ে যায়। দেশে-বিদেশে এর চাহিদাই অত্যাধিক। রেশমি শাড়ির বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা এর অনন্যতাকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে। রেশমি শাড়িতে নারীরা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এ শাড়ি সহজে কুঁচকায় না। ইস্ত্রি করলে রেশমি শাড়ির উজ্জ্বলতা বাড়ে। ত্বকের জন্য কোনো ক্ষতিকারক পদার্থ নেই। পরলে গরম লাগে না। রেশমি শাড়ি হল বিলাসিতা ও আভিজাত্যের প্রতীক।
৫। টাঙ্গাইল শাড়ি : টাঙ্গাইলের স্থানীয় তাঁতের শাড়ি পরিচিত ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’ নামে। টাঙ্গাইল শাড়ি তৈরি হয় টাঙ্গাইলের বাজিতপুর ও পাতরাইলের এক বিশেষ শ্রেণির তাঁতীদের হাতে। বংশ পরম্পরায় এই তাঁতীদের হাতের ছোঁয়ায় গড়ে উঠছে এক একটি অনন্য টাঙ্গাইল শাড়ি। টাঙ্গাইল শাড়িতে নকশা তোলার জন্য ব্যবহার করা হতো ফ্রান্স থেকে আসা জ্যাকার্ড এবং ফ্লাই সাটেলের মিশ্রণ। জ্যাকার্ড ব্যবহারের কারণে টাঙ্গাইল শাড়িতে ইচ্ছেমতো এবং অনেক বেশি নকশা করা সম্ভব হয়েছে।
টাঙ্গাইল শাড়িতে দুই ধরণের নকশার কাজ হয়। এক ধরণের নাম হল ঠকঠকি। এতে চিকন সুতার জমিনে বুটি এবং নকশা ছাড়া পাড় থাকে। পাড়ে বড়জোর ডোরা থাকে। অপর ধরণের নাম হল জ্যাকার্ড, যা ব্যবহারে পাড়, আঁচল ও জমিনে নকশা করা হয়ে থাকে। টাঙ্গাইল শাড়ি বিখ্যাত হয়েছে মিহি সুতার জন্য। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর টাঙ্গাইলের তাঁতীদের অনেক চড়াই উতরাই পার করতে হয়েছে। কিন্তু বাঙালি মনে কমেনি টাঙ্গাইল শাড়ির আবেদন।
পয়লা বৈশাখ, বসন্ত, ঈদ, পূজা, জন্মদিন ইত্যাদি উৎসবে টাঙ্গাইল শাড়ি নারীকে দিয়ে আসছে অনন্য এক সাজ! এই পাঁচ ধরণের শাড়ি ছাড়াও বাংলাদেশের প্রতিটি আনাচেকানাচে কারিগর ও তাঁতীদের সুনিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে আরো বহু রকমের শাড়ি।
শাড়ি যে শুধু নারীর রুপ লাবণ্যই বাড়িয়ে দেয়, তা নয়। শাড়ি আমাদের ঐতিহ্যের কথা বলে, বলে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কথা। শাড়িতেই যেনো আমাদের বাঙালিয়ানা ফুটে ওঠে একদম স্পষ্ট হয়ে!

তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া ও ক্যানভাসম্যাগাজিন.কম

বাঙালিয়ানায় শাড়ি এবং শাড়ি নিয়ে যত কথা (পর্ব ১)