‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতের আগে ফাহিমের ভিডিও জবানবন্দি, ‘ফাঁস করে দিয়েছে চাঞ্চল্যকর তথ্য’

23_6

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- মাদারীপুরের সরকারি নাজিমউদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষক রিপন চক্রবর্তীকে কুপিয়ে হত্যার সময় হাতেনাতে আটক জঙ্গি সন্ত্রাসী ফয়জুল্লাহ ফাহিম সদর উপজেলার মিয়ারচর এলাকায় শনিবার সকালে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। মৃত্যুর আগে ফাহিম চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য দিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ জানতে পেরেছে- হিজবুত তাহরীর, জেএমবি ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নামে জামায়াত ও শিবিরের প্রশিক্ষিত ক্যাডাররা এসব হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে। মূলত সামনে জঙ্গি নামধারীদের ব্যবহার করা হলেও পেছনে রয়েছে যুদ্ধাপরাধী দলের ক্যাডাররা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এখন তারা কিলিং মিশনে পরিচিতি পাওয়া জঙ্গি সদস্যদের ব্যবহার করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব ক্যাডাররাও অংশ নিচ্ছে।

জিজ্ঞাসাবাদে ফাহিম অন্তত তার পরিচিত সহযোগী হিসেবে দেড় ডজন ব্যক্তির নাম-পরিচয় জানিয়েছে। এছাড়া কয়েকটি বড় অস্ত্রের মজুদের সন্ধানও দিয়েছে ফাহিম। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের নানামুখী তৎপরতা ও অভিযান অব্যাহত আছে।

কেন তাদের এমন হত্যা মিশনে নামানো হয়েছে প্রশ্নের জবাবে ফাহিদ পুলিশকে জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি ভারতকে বিক্ষুব্ধ করে তুলতেই তাদের মাঠে নামানো হয়েছিল। এজন্য বেছে বেছে তাদের দিয়ে হিন্দু পুরোহিতসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনকে হত্যা করানো হচ্ছে। আর নিরাপদ মনে করে ঢাকার বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলকে তারা বেছে নিচ্ছে। নির্দেশদাতারা জানিয়েছে, ভারতের অকুণ্ঠ সমর্থন নিয়ে এ সরকার ক্ষমতায় টিকে আছে। তাই ভারতকে ক্ষুব্ধ করতে না পারলে কোনোভাবেই এ সরকারকে বিদায় করা যাবে না। আর তাদের এ মিশন সফল হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে জামায়াত-শিবির।

ফাহিম জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানিয়েছে, ধাপে ধাপে তাদের এ হামলা আরও শক্তিশালী হবে। এরপর সমাজের বিশেষ ব্যক্তিদের ওপর হামলার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশী নাগরিকদের ওপর আত্মঘাতী হামলা চালানোর পরিকল্পনাও রয়েছে জামায়াতের। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জামায়াত হাত মিলিয়েছে হিযবুত তাহরীর, জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ বেশকিছু জঙ্গি সংগঠনের প্রশিক্ষিত সদস্যদের সঙ্গে। ইতিমধ্যেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল গঠন করে তাদের প্রশিক্ষণও দেয়া হচ্ছে।

শনিবার সকালে মাদারীপুরে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার আগে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য দিয়ে গেছে গোলাম ফয়জুল্লাহ ফাহিম। ফাঁস করে দিয়েছে ভয়ংকর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে এমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলের নেতৃত্বে থাকা অন্তত ১৮ জনের নাম।

কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশানল (সিটি) ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, গোলাম ফয়জুল্লাহ ফাহিমকে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় ফাহিমের দেয়া তথ্য ভিডিও করে রেখেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এছাড়া ফাহিমের দেয়া তথ্যানুযায়ী পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা গত দু’দিনে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে অসংখ্য অভিযান পরিচালনা করে। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে পুলিশ ভয়ংকর জঙ্গিদের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। শনিবার উত্তরা থেকে ১০৮টি চাইনিজ পিস্তল, ২১৭টি ম্যাগাজিন, ১১টি বেয়োনেট ও ১ হাজার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, তার দেয়া তথ্যে তিন জঙ্গিসহ ইতিমধ্যেই চারজনকে আটক করা সম্ভব হয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে হাসান আল বান্না সোহাগ নামে একজন আইনজীবীও রয়েছেন। যিনি মাদারীপুরে ওই কিলিং মিশনে যাওয়ার আগে ফাহিমসহ ৬ জনের ওই দলটিকে দেড় লাখ টাকা দিয়েছিলেন। শুক্রবার বিকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন কাজলা এলাকা থেকে জামায়াতপন্থী ওই আইনজীবীকে আটক করা হয়।

তিনি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর আইনজীবী হিসেবে পরিচিত। কিলিং মিশনে যাওয়া দলটিকে তিনি মাদারীপুরে তার এক বন্ধুর (আইনজীবীর) কাছে পাঠিয়েছিলেন। ওই আইনজীবী মূলত মাদারীপুর সরকারি নাজিমউদ্দীন কলেজের প্রভাষক রিপন চক্রবর্তীকে চিনিয়ে দেন। ইতিমধ্যেই ওই আইনজীবীকে গোয়েন্দারা নজরদারির মধ্যে রেখেছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে ওই আইনজীবীর নাম প্রকাশ করতে চাননি।

উল্লেখ্য, বুধবার বিকেলে সরকারি নাজিমউদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ছাত্রী হোস্টেলের সামনে কলেজ প্রভাষক রিপন চক্রবর্তীর ভাড়া বাসায় হামলা চালায় ৩ জন দুর্বৃত্ত। হামলা শেষে পালিয়ে যাওয়ার সময় গোলাম ফাইজুল্লাহ ফাহিমকে (২০) আটক করেন জনতা। গুরুত্বর অবস্থায় প্রভাষক রিপন চক্রবর্তীকে বরিশাল শেরে-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল সুত্রে জানা যায় শুক্রবার পযন্ত প্রভাষক সুস্থ রয়েছেন । এবং গত বৃহস্পতিবার(১৬-০৬-১৬) রাতে পুলিশের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় ৬ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করা হয়েছিল।