মধ্যবিত্তের বাবা-দিবস নেই।

fathers-day--by-somoyer

আখতারুজ্জামান আজাদ

আমরা যারা মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মেছি, পরিবারের প্রতি তাদের আবেগ-ভালোবাসা অক্টোপাসের আট পায়ে আটকানো। মায়ের কোল ছেড়ে স্কুলে ভর্তি হবার পর থেকেই পরিবারের সাথে আমাদের তৈরি হয় অঘোষিত দূরত্ব, হাই স্কুলে উঠলে সেই দূরত্বটি পরিণত হয় বার্লিন প্রাচীরে, কলেজে ওঠার পর থেকে সেই বার্লিন প্রাচীরটি রূপ নেয় চীনের মহাপ্রাচীরে। আমরা চাইলেই বাবার সাথে হেসে কথা বলতে পারি না, মাকে জাপটে ধরে কাঁদতে পারি না, বড় বোনের সাথে ভাগাভাগি করতে পারি না ব্যক্তিজীবনের সুখ-দুঃখ। ঘরে থেকেও আমরা যেন পরের মানুষ, নিজ ঘরে আমরা যেন পরবাসী।

গল্পে-নাটকে আমরা পিতা-মাতা-সন্তানের সুমধুর সম্পর্ক দেখি, রাতে খাবার টেবিলে ত্রিপক্ষীয় রসালাপ দেখি, জীবনের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করতে দেখি, দেখি সন্তানের বিষন্নতা দূরীকরণে পিতা-মাতার সপ্রতিভ পদক্ষেপ; অধুনা ফেসবুকে দেখি উচ্চবিত্ত পিতা-মাতাদের সাথে সন্তানদের জম্পেশ ‘হ্যাং-আউট’, জমকালো শপিং; দেখি পিতা-মাতাদের সাথে সন্তানদের বর্ণিল-বর্ণাঢ্য ‘সেলফি’।

কিন্তু আমাদের মধ্যবিত্ত ঘরগুলোর চেহারা ভিন্ন। আমাদের একের পর এক জন্মদিন চলে যায়। পরিবারের কেউ মুখ ফুটে আমাদেরকে ‘শুভ জন্মদিন’ বলেন না। আমরা ঈদের পাঞ্জাবি পরে সফেদ শ্মশ্রুমণ্ডিত প্রৌঢ় আব্বার সাথে কোলাকুলি করার সাহস পাই না, মা-বোনকে ‘ইদ মোবারক’ বলতে সংকোচ বোধ করি। জন্মদিনে মা আলাদা খাবার রাঁধেন, নিঃশব্দে খেয়ে উঠে পড়ি; ঈদের আগে মা নীরবে হাতে টাকা গুঁজে দেন, একা গিয়ে পাঞ্জাবি কিনে আনি, ইদের দিন নতুন পাঞ্জাবি পরে নীরবেই মায়ের সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাই। মা রান্নায় ব্যস্ত থাকেন। রান্নায় ব্যাঘাত ঘটবে ভেবে সংশয়ে-সংকোচে ইদের দিনটিতেও মায়ের চরণযুগল ছোঁয়ার সাহস হয় না। আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোয় আয়োজন আছে, আড়ম্বর নেই; অনানুষ্ঠানিক আবেগ আছে, আবেগের আনুষ্ঠানিক প্রকাশ নেই।

আমাদের ব্যক্তিজীবনে প্রায়ই নিঃসঙ্গতাজনিত দুর্যোগ আসে, জনতার মাঝে নির্জনতা প্রায়ই আমাদেরকে রাহুর মতো গ্রাস করে। সেই বেদনার কথা কাউকে আমরা বলতে পারি না। ঘরের দরোজা-জানালা বন্ধ করে আমরা নিঃশব্দে কাঁদি, শব্দ করে কাঁদার বিধান আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোয় নেই। মানসিক দুর্যোগলগ্নে আমাদের ইচ্ছে করে মাকে শক্ত করে জাপটে ধরে আশ মিটিয়ে কাঁদতে, মাকে জড়িয়ে ধরে খুব এক-ঘুম ঘুমোতে, নিজের পিঠে বাবার হাতের সমবেদনার ছোঁয়া পেতে। বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরতে পারলে সন্তানের বেদনার সবটুকু কর্পূরের মতো উবে যায়। কিন্তু আমরা চাইলেই মাকে জাপটে ধরতে পারি না, মাকে বলতে পারি না লোকমা তুলে খাইয়ে দিতে; বাবাকে বলতে পারি না তার শ্রম-কিণাঙ্ক-কঠিন হাতটিকে একটু কাঁধে রেখে প্রশ্রয়ের প্রসাদ বিলোতে। বাবা-মাকে বেদনার কথা বলতে আমরা লজ্জা পাই, আমরা কুঁকড়ে যাই, আমরা গুটিয়ে যাই। আমাদের বেদনারা কুয়োর মধ্যে আটকাবস্থায়ই হাবুডুবু খায়, আমাদের বেদনারা দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র হয়ে ঘুরপাক খেতে-খেতে সুদাসলে বাড়তে থাকে গুণোত্তর ধারার মতো।

আব্বা আমাকে দ্বিতীয় ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে দেয়ার জন্য দুবার আমার সাথে স্কুলে গেছেন, তৃতীয়বার গেছেন স্কুলের অভিভাবক-সম্মেলনে; আর যাননি বা যাবার দরকার হয়নি। কলেজে ভর্তি হয়েছি একা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি একা। শৈশবে অসংখ্য বক্তৃতা-বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি। মা-আব্বার ইচ্ছে ছিল আমার অন্তত একটি বক্তৃতা দেখবার। কিন্তু আমি অযুত জনতার সমাবেশে নিঃশঙ্কচিত্তে ভাষণ দিতে পারলেও মা-বাবার সামনে মাইক্রোফোনে কথা বলতে গেলে জিভ-হাত-পা অবশ হয়ে যাবে বিধায় তাদেরকে কখনও আমার বক্তৃতা-আবৃত্তি দেখানো হয়নি। এ আমার আজন্ম দুর্ভাগ্য।

মা-বাবা কখনও আমার কোনো কার্যক্রমে বাধা দেননি। কোনো সিদ্ধান্তও চাপিয়ে দেননি কখনও। ইচ্ছে হয়েছে, মাধ্যমিকে বিজ্ঞান পড়েছি; ইচ্ছে হয়েছে, উচ্চ-মাধ্যমিকে কলা পড়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ইচ্ছে ছিল ইংরেজি সাহিত্য পড়ার। আর বাবা-মায়ের ইচ্ছে ছিল ছেলেকে জজ-ব্যারিস্টার বানাবার। তাও তারা মুখ ফুটে বলেননি। তাদের অব্যক্ত ইচ্ছের মূল্য দিতেই ইংরেজিতে না গিয়ে আইনে গিয়েছিলাম এবং এখন বুঝি— আইন পড়তে যাওয়াটাই ছিল আমার বেহিশেবি জীবনের বৃহত্তম ভুল। আমাদের বংশে কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েননি, বংশের কেউ কখনও সুট-টাই পরেননি। অ্যাকাডেমিক প্রয়োজনে এখন থেকে অর্ধদশক আগে যেদিন আমি প্রথমবার সুট-টাই পরি, সেদিন আমাকে দেখে বাবা-মা কেঁদে ফেলেছিলেন; সেদিন একুশ বছর বয়সী আমিও একুশ বছরের জমানো আবেগের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বাবা-মাকে জাপটে ধরে সবেগে কেঁদেছিলাম। ‘বড়’ হবার পর বাবা-মাকে একমাত্র ঐ একবারই জড়িয়ে ধরা।

আব্বা-মা জানেন— লেখালেখির পেছনে আমি অফুরন্ত সময় খরচ করি, জেনেও তারা কখনও বাধা দেননি। বইয়ের ফ্ল্যাপে আমার ছবির নিচে লেখকের বাবা-মায়ের ঘরে যখন তারা নিজেদের নাম দেখেন, তখন তারা নিঃশব্দে অশ্রুপাত করেন। বছর দুয়েক আগে মাকে একদিন বইমেলায় নিয়ে গিয়েছিলাম; স্টলে পুত্রের বই বিক্রি হতে দেখে মা সেদিন অতি-আবেগে অস্থির হয়ে পড়েছিলেন, বাসায় যথেষ্ট বই থাকা সত্ত্বেও সেদিন তিনি প্রকাশকের কাছে পরিচয় লুকিয়ে গাঁটের পয়সা খরচ করে আমার একটি বই কিনে নিয়ে এসেছিলেন; অদূরে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য আমি দেখেছি, ঐ অনির্বচনীয় সুখদৃশ্য আমার আমৃত্যু মনে থাকবে।

আমাদের মধ্যবিত্ত সংসারগুলো জুড়ে থাকে এক অদ্ভুত আঁধার। বড় হবার পর আমাদের মায়েরা হয়ে যান দূরের মানুষ, বাবারা সৌরজগতের বাইরের কেউ। এখানে আমাদেরকে কাঁদতে হয় একা, হাসতে-খেতে-ঘুমোতে হয় একা। অসুখে না পড়লে আমাদের কপালে আমরা মায়ের হাতের স্পর্শ পাই না। তাই ক্ষুব্ধচিত্তে ঈশ্বরকে বলি মাঝে-মাঝে একটু অসুখ দিতে।

আমার একটি বইও বাবা-মাকে কেন উৎসর্গ করিনি, এই প্রশ্নটি অনেকেই করেন। উত্তরটি হচ্ছে— আমার কাছে বইয়ের মতো ক্ষুদ্র বস্তু উৎসর্গের পাত্র-পাত্রী বাবা-মা নন, স্বপ্ন দেখি আরো বড় কিছু তাদেরকে উৎসর্গ করার। তাদেরকে তাই কোনো বই উৎসর্গ করিনি, ভবিষ্যতেও করব না।

মাকে নিয়ে কেন আমি কোনো কবিতা লিখিনি, এই প্রশ্নও অনেকে করেন। উত্তরটি হচ্ছে— আমি ডোবা-পুকুর-দিঘি-নদী-সমুদ্র নিয়ে কবিতা লিখতে পারি, মহাসমুদ্র নিয়ে লিখতে পারি না; মহাসমুদ্র নিয়ে কবিতা লেখার সাহস-সামর্থ্য-স্পর্ধার কোনোটিই আমার নেই।