এক মানসিক প্রতিবন্ধীকে পুলিশের সামনে পিটিয়ে হত্যা

murderrrr


রেজাউল সরকার(আঁধার), কাপাসিয়া থেকে ফিরে :

দুদিন আগে ঘর থেকে পালিয়ে যাওয়া সচ্ছল পরিবারের বিকৃতমস্তিষ্ক অবোধ ছেলেটা বাড়ি থেকে প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার দূরে এক গ্রামজুড়ে ঘোরাঘুরি করছিল। খিদের যন্ত্রণায় ছটফট করা ছেলেটি কেউ উচ্ছিষ্ট দিলেও বেজায় খুশি হয়ে খেত। আলুথালু ঘোরাঘুরির একপর্যায়ে রাত প্রায় ৯টার দিকে গ্রামের এক বাড়ির উঠানে ঢুকে পড়ে। ওই সময় ঘর থেকে তাকে দেখে চিৎকার করে ওঠে বাড়ির এক কিশোরী। বাড়ির লোকজন ঘর থেকে বেরিয়ে উঠানে তাকে দেখে ‘ডাকাত-ডাকাত’ বলে চিৎকার করলে ভয়ে পাশের গোয়ালঘরে ঢুকে পড়ে ছেলেটি। এরপর বাড়ির প্রধান ফটক তালাবদ্ধ করে ওই গোয়ালঘরের ভেতর ছেলেটিকে নির্মমভাবে পেটায় বাড়ির লোকজন।
ডাকাত হানা দিয়েছে ভেবে ততক্ষণে বাড়ির সামনে লাঠিসোঁটা হাতে জড়ো হন ১০০ থেকে ১৫০জন গ্রামবাসী। পরে হাত-পা বেধে ছেলেটিকে গ্রামবাসীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। তারা অবোধ ওই ছেলেটাকে প্রথমে বেধড়ক পিটুনি দিয়ে দুপায়ে দড়ি বেধে উল্টোকরে গাছের সঙ্গে ঝুলায়। গাছে ঝুলিয়ে ‘ডাকাত সহযোগীদের’ পরিচয় জানার নামে নিষ্ঠুরতার জবাবে ছেলেটি দু-তিনবার স্রেফ জবাব দিয়েছিল ‘খিদা লাগছে’। ছেলেটির সরল জবাবে গ্রামবাসী আরো ক্ষিপ্ত হন। পরে তারা মাটিতে ফেলে শাবল দিয়ে একটি চোখ উপড়ে তা নিয়ে উল্লাস করেন। তারপর মাথা থেঁতলে দেন ছেলেটির। খবর পেয়ে টহল পুলিশ সেখানে পৌঁছানোর পরও প্রায় এক ঘুন্টা পিটানো হয়। তার পর পুলিশ ছেলেটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
জেলার কাপাসিয়া উপজেলার বারিষাব ইউনিয়নের নয়ানগর গ্রামে মর্মন্তুদ ওই ঘটনাটি ঘটে গত ১১ জুন রাতে। নিহত ছেলেটির নাম জাহিদুল ইসলাম সজিব (১৮)। সে পাশের ঘাগটিয়া ইউনিয়নের খিরাটি উত্তরপাড়া গ্রামের মৃত জাকির হোসেন মুকুলের একমাত্র ছেলে। জাহিদুল ইসলাম সজিব পাশের খিরাটি বঙ্গতাজ ডিগ্রি কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। কিন্তু মস্তিষ্কে সমস্যা দেখা দেওয়ায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়া হয়নি তার। গত প্রায় আড়াই মাস ধরে সজিবকে বদ্ধপাগল বলেই জানত গ্রামবাসী।
এদিকে ঘটনার পরদিন খবর পেয়ে নিহত ওই হতভাগ্য ছেলেটির স্বজনরা থানায় গেলেও মরদেহ দেখতে দেননি পুলিশ। এমনকি পুলিশ সজিবকে অজ্ঞাতপরিচয় ডাকাত বলে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে মরদেহ পাঠান। পুলিশের কা- এখানেই থেমে থাকেনি, অজ্ঞাতপরিচয় ডাকাত গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার ঘটনাসহ ডাকাতির চেষ্টা করায় পৃথক দুটি মামলাও নেন পুলিশ। পরে মর্গ থেকে শনাক্ত করে স্বজনরা মরদেহ নিয়ে গিয়ে দাফন করেন।
স্বজনদের অভিযোগ, ঘটনার রাতেই নিষ্পাপ একজন মানসিক প্রতিবন্ধীকে হত্যা করা হয়েছে বলে জেনে যান পুলিশ। এরপর পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পরও বিকৃতমস্তিষ্ক অবোধ সজিবকে অজ্ঞাতপরিচয় ডাকাত বলেই মামলা নেন পুলিশ।
স্বজনরা আরো অভিযোগ করেন, হত্যাকা-ের ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করতে গেলে পুলিশ তাঁদের তাড়িয়ে দেন।
স্বজনরা জানায়, জাকির হোসেন মুকুল পাশের খিরাটি বঙ্গতাজ ডিগ্রি কলেজের অফিস সহকারী ছিলেন। কিন্তু তিনি ছিলেন সচ্ছল। গত ২০১৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান। তাঁর এক ছেলে ও দুমেয়ের মধ্যে জাহিদুল ইসলাম সজিব ছিল সবার বড়।
স্বজনরা আরো জানায়, জাহিদুল ইসলাম সজিব ছিল মেধাবী ছাত্র। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণি থেকে টেলেন্টপুলে বৃত্তি পায় সে। ২০১৪ সালে ঘাগটিয়াচালা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি পাস করে সজিব। এরপর পাশের খিরাটি বঙ্গতাজ ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হয় সে। এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে কলেজের নির্বাচনী পরীক্ষায়ও অংশ নিয়েছিল। কিন্তু এরপরই মানসিক সমস্যা দেখা দেয় তার।
খিরাটি বঙ্গতাজ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আওলাদ হোসেন জানান, সজিব ছিল খুবই মেধাবী ছাত্র। কিন্তু নির্বাচনী পরীক্ষার পর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলায় ফরম পূরণ করা হয়নি তার।
সজিবের দাদি শুক্করি বেগম জানান, গত প্রায় তিন মাস আগে হঠাৎ সজিবের আচরণে অসংলগ্নতা ধরা পড়ে। যেকাউকে ভয় পেত সে। প্রায়ই বাড়ির পাশে তার বাবার কবরের পাশে গিয়ে বসে থাকত। গুমরে কাঁদত। বেশির ভাগ সময় একা একা কথা বলত সে। এরপর ঘর থেকেই বের হত না সজিব।
সজিবের চাচা দুবাসীপ্রবাসী আনোয়ার হোসেন জানান, একমাত্র ভাতিজার এমন অবস্থা দেখে তিনি আর বিদেশে যাননি। অনেক চেষ্টা করেও তাঁরা সজিবকে চিকিৎসকের কাছে নিতে পারেননি। ব্যর্থ হয়ে অনেক কবিরাজ ডেকে এনে বাড়িতে রেখেই সজিবের চিকিৎসা করিয়েছেন। কিন্তু সুফল না পাওয়ায় তাঁরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সজিবকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করার।
সজিবের মা রেবেকা সুলতানা রেবা জানান, প্রায় দুমাস আগে ওই ঘর থেকে সজিব একবার বেরিয়ে গিয়েছিল। পরে ব্যাপক খোঁজাখুঁজির পর পাশের আড়ালবাজার থেকে তাকে বাড়ি ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর থেকে সজিব নিজেই ঘরের বিতর থেকে তালা বদ্ধকরে রাখত । স্রেফ খাবার সময় হলেই সে নিজেই খুলে দিত তালা। সজিব কারো সঙ্গে কথাও বলত না। তার থাকার ঘরে কেউ যেতে চাইলে খেপে যেত সে। অনেক খিদে পেলে খাবার চেয়ে খেত। তাকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে যেতে চাইলেও সজিব রাজি হত না।
সজিবের দাদি শুক্কুরি বেগম আরো জানান, সজিব খুবই খেতে চাইত। খাবার নিয়ে গেলে খুবই খুশি হত। হাতে খাবার দেখলে ছুটে আসত। রাতে তার ঘরে সে একাই থাকত।
শুক্কুরি বেগম জানান, গত ৯ জুন রাতে বারান্দার গ্রিল ভেঙে বেরিয়ে যায় সজিব। পরদিন সকালে সজিবের ঘরে তাকে না পেয়ে ব্যাপক খোঁজাখুঁজি করেন তাঁরা। কিন্তু সজিবের কোন হদিসই পাননি।
সজিবের নানা আরজু মিয়া জানান, গত ১২ জুন তিনিসহ তাঁর মেয়ে রেবেকা সুলতানা রেবা, প্রতিবেশী আলমগীর হোসেনসহ তাঁরা সজিবের নিখোঁজের ঘটনায় কাপাসিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে যান। সাধারণ ডায়েরি করার পর থানায় এক কনস্টেবলের মোবাইল ফোনে গণপিটুনিতে নিহত অজ্ঞাতপরিচয় ডাকাতের মরদেহের ছবি দেখে ‘সজিব’ বলে চিৎকার দিয়ে সংজ্ঞা হারান রেবেকা সুলতানা রেবা।
আরজু মিয়া অভিযোগ করেন, ওই সময় মরদেহ দেখতে চাওয়ায় পুলিশ তাঁদের থানা থেকে তাড়িয়ে দেন। ১৩ জুন তাঁরা গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে গিয়ে সজিবের মরদেহ শনাক্ত করেন। তিনি আরো বলেন সজিবের বয়স ১৮ কিন্তু থানা পুলিশ ও বিমাকর্মী মিনহাজ প্রচার দেয় ৩৫বছর বয়সী এক ডাকাত কে মারা হয়েছে।
গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) ডা. আবদুস সালাম সরকার বলেন, ‘শনাক্ত হওয়ার পর মরদেহ নিহতের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’
যা ঘটেছিল ওইদিন ঃ পাশের বারিষাব ইউনিয়নের নয়ানগর গ্রামের একটি বীমা কম্পানির কর্মকর্তা মিনহাজ উদ্দিন। রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাড়ি থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে নয়ানগর জামে মসজিদে তিনি তারাবি নামাজ পড়তে যান। ওই সময় বাড়িতে ছিলেন তাঁর স্ত্রী মাজেদা খাতুন, ছেলে শরীফ হোসেন, ছোট ভাইয়ের স্ত্রী হনুফা বেগম ও তাঁর বাতিজা ইসমাইল হোসেন নাতনি সাবিনা ইয়াসমীন।
মিনহাজ উদ্দিন বলেন, মসজিদে থেকে বাড়িতে ডাকাত হানা দেওয়া খবর পেয়ে ছুটে গিয়ে দেখি প্রায় ১০০ থেকে ১৫০জন গ্রামবাসী এক ডাকাতকে ধরে গণপিটুনি দিচ্ছেন।
ইসমাইল হোসেন জানান, ঘরের ভেতর থেকে তাঁর ভাগ্নি অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সাবিনা ইয়াসমীন প্রথমে ডাক চিৎকার দেয়। ছুটে বাইরে বেরিয়ে উঠানে এক ডাকাতকে দেখে তিনি তখন ‘ডাকাত-ডাকাত’ বলে চিৎকার করেন। ওই সময় ডাকাতটি বাড়ির গোয়ালঘরে ঢুকে পড়ে। চিৎকারে পাশের বাড়ি থেকে তাঁর মামা হারুন-অর রশীদ ছুটে গিয়ে বাড়ির প্রধান ফটক তালাবদ্ধ করে গোয়ালঘরে ওই ডাকাতকে বেদম পিটুনি দেন।
ইসমাইল হোসেন আরো জানান, ততক্ষণে টের পেয়ে বাড়ির সামনে ১০০ থেকে ১৫০জন গ্রামবাসী লাঠিসোঁটা হাতে জড়ো হন। পরে আটক হওয়া ডাকাতকে বাইরে নিয়ে গেলে গ্রামবাসী বেদম গণপিটুনি দেন।
খবর পেয়ে কাপাসিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সেন্টুচন্দ্র সিংহের নেতৃত্বে টহল পুলিশ রাত ১১টার দিকে ঘটনাস্থল পৌঁছান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, পুলিশ সেখানে গিয়ে সজিবকে নিস্তেজ অবস্থায় দেখেন। কিন্তু পুলিশের সামনেই কেউ কেউ নিস্তেজ সজিবের শরীরে লাঠি কিংবা শাবল দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করছিলেন। একপর্যায়ে এসআই সেন্টুচন্দ্র সিংহ এগিয়ে গিয়ে সবাইকে নিরস্ত করেন। ওই সময় এসআই সেন্টুচন্দ্র সিংহ সজিবকে নাড়াচাড়া করে বেঁচে আছেন দেখে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য একটি গাড়ির ব্যবস্থা করতে বলেন স্থানীয় ইউপি সদস্য সেলিম প্রধানকে।
ইউপি সদস্য সেলিম প্রধান বলেন, আমি আধা ঘণ্টা পর ইঞ্জিনচালিত একটি রিকশাভ্যান (টমটম) ব্যবস্থা করে দিলে পুলিশ ওই রিকশাভ্যানে তুলে সজিবকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরো জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল গিয়ে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা অবস্থান করেন। ওই সময় ওই বীমা কর্মকর্তা মিনহাজ উদ্দিনের বাড়ির ভেতর গিয়ে তাঁর সঙ্গে একান্তে দীর্ঘ সময় কথা বলেন এসআই সেন্টুচন্দ্র সিংহ।
তবে এসআই সেন্টুচন্দ্র সিংহ দাবি করেন, আমি ওই রাতে তরগাঁও, বারিষাব ও কড়িহাতা ইউনিয়ন এলাকায় টহল দায়িত্বে ছিলাম। আমার সঙ্গে ছিলেন কনস্টেবল মনিরুজ্জামান, সাইদুল ইসলাম, আয়নাল হোসেন, বিশেষ আনসার সদস্য দীপঙ্কর। থানার ডিউটি অফিসার মুঠোফোনে আমাকে রাত সাড়ে ১০টায় ডাকাত হানা দেওয়াসহ এক ডাকাতকে ধরে গণপিটুনি দেওয়ার খবর জানালে আমি ওই এলাকায় যাই।
তবে তাঁর সামনে মারধর করা হয়নি দাবি করে এসআই সেন্টুচন্দ্র সিংহ বলেন, আমি গিয়ে আটক হওয়া ডাকাতকে রক্তাক্ত নিস্তেজ অবস্থায় দেখতে পাই। ওই সময় বীমা কর্মকর্তা মিনহাজসহ তাঁর পরিবারের লোকজন দাবি করেছিল, সশস্ত্র ডাকাতদল তাঁদের বাড়িতে হানা দিয়েছিল। ডাকাতিকালে গ্রামবাসী ওই ডাকাতকে ধরে গণপিটুনি দেন। ডাকাতদলের অন্য সদস্যরা পালিয়ে যান।
তবে বাড়ির ভেতর মিনহাজ উদ্দিনের সঙ্গে একান্তে দীর্ঘসময় কথা বলার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ঘটনার তথ্য জানতে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলাম।
গ্রামে ডাকাত আতঙ্কও ছিল নাঃ নয়ানগর গ্রামে প্রায় আড়াই হাজার মানুষের বসবাস। ওই বীমা কর্মকর্তা নিজেই স্বীকার করে বলেন, প্রায় তিন মাস আগে চান মিয়ার বাড়িতে ডাকাতির একটি ঘটনা ঘটেছিল। এরপর গ্রামে কোন ডাকাতি হয়নি। গত প্রায় ১০ বছরে গ্রামের কারো বাড়িতে ডাকাত হানা দেয়নি। বারিষাব ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য সেলিম প্রধান বলেন, গ্রামে কোন ডাকাত আতঙ্কও ছিল না।
প্রত্যক্ষদর্শীদের কথাঃ একদফা গণপিটুনি দিয়ে দুপায়ে দড়ি বেধে উল্টোকরে গাছের ডালে ঝুলিয়ে আটক হওয়া তরুণের কাছে তার ডাকাত সহযোগীদের নাম জানতে চাওয়া হয়। ওই সময় দু-তিনবার শুধু ওই তরুণ ‘খিদে লাগছে’ বলে শব্দ উচ্চারণ করে। পরে তাকে ‘ভয়ঙ্কর জাত ডাকাত’ বলে আখ্যা দিয়ে কোন স্বীকারোক্তি না দেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে মাটিতে ফেলে ফের নির্যাতন চালান গ্রামবাসী। একপর্যায়ে শাবল দিয়ে তার ডান চোখ উপড়ে ফেলা হয়। এরপর থেঁতলে দেওয়া হয় মাথা।
প্রত্যক্ষদর্শী মুদি দোকানদার আবুল বাশার বলেন, প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় ধরে অবর্ণনীয় নির্যাতন চললেও আটক হওয়া ওই তরুণ একটিও কথা বলেনি। এমনকি নড়াচড়াও করতে দেখিনি।
ওই গ্রামের মৃত ইয়াকুব আলীর ছেলে ওষুধ ব্যবসায়ী আবদুল বাতেন বলেন, আটক হওয়ার সময় ওই তরুণের হাতে কালো পলিথিনে মোড়া দুমুঠো মুড়ি ও ছোলা ছিল।
একদিন আগে খাবার চেয়ে খেয়েছিল ছেলেটিঃ পাশের বারিষাববাজারের অনেক ব্যবসায়ী গত শনিবার বিকেলে ঘোরাঘুরি করতে দেখেছিলেন। একা একাই কথা বলছিল ছেলেটি। বাজারে সড়কের পাশে ছোলামুড়ি বিক্রেতা তানবীর হোসেন জানান, গত শনিবার বিকেলে তাঁর কাছে গিয়ে ‘খিদে লাগছে’ বলে পেট দেখাচ্ছিল ছেলেটি। পরে তিনি দুমুঠো মুড়ি ও ছোলা দেন।
নিহত জাহিদুল ইসলাম সজিবের বাড়িতে এখন আহাজারি ঃ কাপাসিয়া সদর থেকে খিরাটিবাজারের দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। খিরাটিবাজার থেকে উত্তর দিকে সিংগুয়া সড়কে এক কিলোমিটার দূরে খিরাটি উত্তরপাড়া গ্রাম। বাঁ পাশে ওই সড়ক থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে সজিবের বাড়ি। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেল, একমাত্র ছেলের মর্মন্তুদ হত্যাকা-ে পাগলপ্রায় নিহত সজিবের মা রেবেকা সুলতানা রেবা। বাড়ির উঠানে কপালচাপড়ে বিলাপ করছিলেন সজিবের দাদি শুক্কুরি বেগম। থেমে থেমে চিৎকার দিয়ে ওঠছিল সজিবের ছোট বোন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী রুবাইয়া জাহান শশী। ছয় বছর বয়সী আরেক বোন ইসরাত জাহান নিশি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল ওই ঘরটির দিকে; যে ঘরে থাকত তার বড় ভাই।
কান্নায় ভেঙে পড়ে নিহত সজিবের মা রেবেকা সুলতানা রেবা বলেন, আমার ছেলে পাগল ছিল এটা গ্রামের সবাই জানত। এত মেধাবী একটা ছেলে পাগল হয়ে যাওয়ায় গ্রামের মানুষজন কতই আফসোস করেছেন। তার সুস্থতার জন্য দোয়া করেছেন, মানত করেছেন। আর এই ছেলেটাকেই ডাকাত বলে কী অবর্ণনীয় নির্যাতন করে মারা হল।
রেবেকা সুলতানা রেবা দাবি করেন, মানুষ কত ভয়ঙ্কর হলে একজন নিরীহ ছেলেকে এভাবে হত্যা করতে পারে। আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে, তারা যতজনই হোক, আমি তাঁদের ফাঁসি চাই।
নিহত সজিবের দাদি শুক্কুরি বেগম পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, টহল পুলিশ ঘটনাস্থল পৌঁছার পর তাঁদের উপস্থিতিতেও আধাঘণ্টা সময় ধরে তাঁর নিষ্পাপ নাতির ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালান মিনহাজসহ তাঁর লোকজন।
সজিবের মানসিক ভারসাম্য হারানোর বিষয়টি জানত গ্রামের সবাইঃ গ্রামের প্রায় সবাই জানতেন সজিবের মানসিক ভারসাম্য হারানোর বিষয়টি। পাশের এমএ মজিদ বিজ্ঞান কলেজের শিক্ষক প্রতিবেশী শাহজাহান বলেন, খুবই মেধাবী ছাত্র ছিল সজিব। প্রায় আড়াই মাস ধরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাকে ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখা হত।
ঘাগটিয়া ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য কফিল উদ্দিন বলেন, ‘মেধাবী একজন ছাত্র হঠাৎ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পাগল হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি গ্রামের সবারই জানা। অনেকে ওই ছেলেটার জন্য দোয়া করেছেন।
ওই ঘটনায় দুটি মামলাঃ ঘটনার পরদিন রাতে ওই বীমা কর্মকর্তা মিনহাজ উদ্দিন বাদী হয়ে কাপাসিয়া থানায় ৭ থেকে ৮জন অজ্ঞাতপরিচয় ডাকাতকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্ত করছেন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সেন্টুচন্দ্র সিংহ। হত্যাকা-ের ঘটনায় এসআই সেন্টুচন্দ্র সিংহ অজ্ঞাতপরিচয় ১০০ থেকে ১৫০জন গ্রামবাসীকে আসামি করে আরেকটি মামলা দায়ের করেন। এই মামলাটি তদন্ত করছেন উপপরিদর্শক (এসআই) শাহজাহান মিয়া। ওই মামলায় জাহিদুল ইসলাম সজিবকে অজ্ঞাতপরিচয় ডাকাত বলে বিবরণে উল্লেখ করা হয়। আর দুটি মামলায় সজিবের বয়স দেখানো হয়েছে ৩৫ বছর।
পুলিশের বক্তব্যঃ সজিবসহ ৭ থেকে ৮জন সশস্ত্র ডাকাতদল হানা দেওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সেন্টুচন্দ্র সিংহ বলেন, গণপিটুনিতে নিহত ওই ডাকাত ছাড়া অন্য কোন ডাকাতকে কেউ দেখেনি। নিহতের সঙ্গে আরো কেউ ছিল কিনা তারও কোন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না।
অপরদিকে গণপিটুনিতে অজ্ঞাতপরিচয় ডাকাত নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শাহজাহান মিয়া বলেন, গণপিটুনিতে নিহত ডাকাতের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করতে পারিনি। তবে লোকমুখে শুনছি, এটা নাকি পাগল ছিল। বিষয়টি বুঝতে পারছি না।
কাপাসিয়া থানার পরিদর্শক (ওসি) আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘নিহত ডাকাতের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।
গাজীপুরের অতিরিক্তি পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।