আমানতের ওপর ক্রমাগত সুদ কমেও ব্যাংকগুলো প্রবৃদ্ধি পাচ্ছে

index

অর্থনীতি ডেস্ক: বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আমানতের ওপর সুদ ক্রমাগত কমাচ্ছে। তা সত্ত্বেও ব্যাংকগুলোর আমানত কমছে না, বরং ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিনিয়োগের অন্য সব পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়েই তার বাড়তি অর্থ ব্যাংক জমা রাখতে বাধ্য হচ্ছে।

গত বছরের মার্চের তুলনায় চলতি বছরের মার্চে দেশের ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে ১৩.০৪ শতাংশ। গত বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালের মার্চে এর আগের বছরের মার্চের তুলনায় আমানত বেড়েছিল ১২.৫০ শতাংশ হারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে দেশের ৫৬টি ব্যাংকে জমা হওয়া আমানতের স্থিতি ছিল সাত লাখ ৫৫ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে তলবি আমানত ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা এবং মেয়াদি আমানত ছিল ছয় লাখ ৮১ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকা। আর ২০১৫ সালের মার্চে সামগ্রিক আমানতের স্থিতি ছিল ছয় লাখ ৬৮ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে তলবি আমানত ছিল ৬৪ হাজার ২০২ কোটি টাকা এবং মেয়াদি আমানত ছিল ছয় লাখ চার হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, তলবি আমানত বাড়ার হার মেয়াদি আমানত বাড়ার হারের থেকে বেশি। গত মার্চে তলবি আমানত বেড়েছে ১৫.৭৩ শতাংশ এবং মেয়াদি আমানত বেড়েছে ১২.৭৬ শতাংশ হারে। অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, মেয়াদি আমানতের একটি বড় অংশ সঞ্চয়পত্রে চলে যাচ্ছে বলে ব্যাংক খাতের মেয়াদি আমানতের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম। ২০১৫ সালের মার্চে মেয়াদি আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩.১৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ বিরূপাক্ষ পাল বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন যে হারে বেড়েছে, সেই হারে তাদের খরচ বাড়েনি। তাই খরচের অতিরিক্ত অর্থ তারা ব্যাংকে সঞ্চয় করছেন। গত বছরের জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বাড়িয়েছে সরকার। এর ফলে সরকারি সব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বেতন প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে বর্ধিত ওই বেতনের অর্থ পেতে শুরু করেছেন সরকারি কর্মকর্তারা।

এদিকে ঋণের সুদহার কমার পরও ব্যাংকের সামগ্রিক ঋণ বিতরণ সেভাবে বাড়েনি। তবে বেসরকারি খাতের ঋণ বিতরণে কিছুটা গতি এসেছে।

গত বছরের মার্চের তুলনায় চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৯.৪৭ শতাংশ। অথচ গত বছরের মার্চ শেষে বিতরণ করা ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩.৩১ শতাংশ।

অগ্রিমের হিসাবের মধ্যে কলমানি মার্কেটের দেওয়ার ঋণ, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্থিতি এবং অর্জিত সুদও অন্তর্ভুক্ত। বিনিয়োগের হিসাবের মধ্যে ট্রেজারি বিল ও বন্ড, শেয়ার এবং সিকিউরিটিজ অন্তর্ভুক্ত।

সামগ্রিক ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে গেলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্য এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত এপ্রিল শেষে বেসরকারি খাতে বিতরণ করা ব্যাংক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা। এই পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫.৫৯ শতাংশ বেশি। আবার সরকারি খাতে বিতরণ করা নিট ঋণ কমেছে ৬.৪৬ শতাংশ।

রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস সালাম বলেন, ছোট ছোট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বেশি ঋণ নিচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের এই শিল্পগুলো বেশির ভাগই গ্রামকেন্দ্রিক। তা ছাড়া ব্যাংকগুলোও তাদের অলস তারল্য কাজে লাগানোর জন্য ঋণ দিতে বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছে। এ কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ কিছুটা বেড়েছে।

এদিকে চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার নিট ঋণ নিয়েছে ২৬ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা। সর্বশেষ এপ্রিল মাসে এ খাত থেকে নিট ঋণ এসেছে তিন হাজার ৩০৪ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষক জায়েদ বখত সম্প্রতি বলেছেন, ‘সাধারণ মানুষের বিনিয়োগের অন্য সব পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে গেছে বলা চলে। ব্যাংকে টাকা রাখলে ৭ থেকে ৮ শতাংশ সুদ পাওয়া যায়। শেয়ারবাজারের অবস্থা তো দিন দিন আরো খারাপ হচ্ছে। তাই বেশি মুনাফা পাওয়ার সবচেয়ে বেশি নিরাপদ বিনিয়োগ সঞ্চয়পত্রের দিকেই ঝুঁকছে মানুষ।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল শেষে ব্যাংক খাতের আমানতের গড় সুদহার দাঁড়িয়েছে ৫.৭৭ শতাংশ এবং ঋণের গড় সুদহার দাঁড়িয়েছে ১০.৬৪ শতাংশ। অথচ এক বছর আগেও আমানতের গড় সুদহার ছিল ৮.০৪ শতাংশ এবং ঋণের গড় সুদহার ছিল ১১.৮৮ শতাংশ। আর ২০১৪ সালের এপ্রিল শেষে আমানতের গড় সুদহার ছিল ৮.১১ শতাংশ এবং ঋণের গড় সুদহার ছিল ১৩.২৫ শতাংশ।