করাত কলে সয়লাব ঘুমধুম: নির্বিচারে নিধন অব্যাহত

kat gash2

ইমরান জাহেদ, কক্সবাজার থেকে: উখিয়ার পার্শ্ববর্তী সীমান্ত নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নে ব্যাঙ্গের ছাতার মত গজে উঠছে অবৈধ সরকারি অনুমোদনবিহীন করাত কল। এসব করাত কলে রাতদিন কাঠ চিরাইয়ের ফলে একদিকে যেমন নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন হচ্ছে অন্যদিকে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একধরণের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অসাধু কতিপয় বনদস্যু যত্রতত্রে গড়ে তুলছে ৭টি অবৈধ স’মিল বা করাত কল।

প্রতি ১ কিঃ মিঃ অন্তর অন্তর ঘাটে ঘাটে বসানো হয়েছে এসব অবৈধ স’মিল। এসব স’মিল স্থাপনের ফলে সামাজিক বনায়নের সবুজ বনাঞ্চল নির্বিচারে উজাড় করা হচ্ছে। শুধু তাই নয় উখিয়া ও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় স’মিল স্থাপন হওয়ায় মিয়ানমার থেকে কাঠ সংগ্রহ করে তা অবৈধ স’মিলগুলোতে চিরাই হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বন বিভাগ সংশ্লিষ্টরা রহস্যজনক কারণে একটি মাত্র পাহাড়ী ইউনিয়নে ৭টি করাত কল বসানোর অনুমতি প্রদান করেছে তা জনমনে প্রশ্নবিদ্ধ। সম্প্রতি ঘুমধুম কচুবনিয়া এলাকার মসজিদ কমিটি কর্তৃক একে একে ৩টি করাত কল বসিয়ে নির্বিচারে বন উজাড় করে চলছে। অভিযোগ উঠছে, নাইক্ষ্যংছড়ি বন রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বিট কর্মকর্তা ছৈয়দ আলম মোটা অংকের টাকায় ঘুষ নিয়ে এসব অবৈধ স’মিল বসানোর দায়সারা অনুমোদন দিয়েছেন বলে স্থায়ীদের অভিযোগে জানা গেছে। বিশেষ করে মিয়ানমার সীমান্তের জিরো পয়েন্টের স্পর্শকাতর স্থানে এসব অবৈধ স’মিল স্থাপন করে পাহাড়ী অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশের যে ক্ষতি সাধন করে চলছে তার মাশুল একমাত্র পাহাড়ী জনগোষ্ঠিকে ভোগ করতে হবে বলে এখানকার সচেতন মহলের অভিযোগ। স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা খালেদ সরওয়ার হারেজ, আব্দুর শুক্কুর, কামাল মেম্বার, ইয়াকুব আলী, নুরুল আলম সিকদার সহ একাধিক পাহাড়ী অঞ্চলের বাসিন্দারা জানান, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ, হুন্ডি সিরাজ, রশিদ মেম্বার, ফরিদ আলম, দীপক চেয়ারম্যান, নুরু মেম্বার, আবুল কালাম, সুবত বড়ুয়া মেম্বারের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরস্পর যোগসাজসের মাধ্যমে রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বিট কর্মকর্তাকে মোটা অংকের টাকায় ম্যানেজ করে পুরো ঘুমধুম ইউনিয়নকেই স’মিলের রাজ্যে পরিণত করেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত এসব অবৈধ করাত কল সরেজমিনে তদন্ত ও অনুসন্ধানপূর্বক করাত কল উচ্ছেদের ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পুরো ঘুমধুম ইউনিয়ন ন্যাড়া ভূমিতে পরিণত হবে। আর এতে করে সবচেয়ে ভয়াবহ ও মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে পাহাড়ী অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ। ঘুমধুম সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আক্তার আহমদ ও সাবেক ইউপি মেম্বার লক্ষীকান্ত বড়–য়া জানান, কাঠ চোর সন্ত্রাসী ফরিদ আলমের ভাই পুলিশের চাকুরী করার সুবাদে তার দাপট দেখিয়ে নির্বিচারে পাহাড় কেটে অবৈধভাবে ঝুঁকিপূর্ণ একটি ভবন নির্মাণ করা হয়। এ ফরিদ আলমের নেতৃত্বে চলছে তার অবৈধ স’মিলে কাঠ চিরাইয়ের পাশাপাশি রাত পোহালেই বাড়ীতে অচেনা অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা ও ইয়াবা পাচারকারীদের নিরাপদ আড্ডাস্থল বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। এসব ইয়াবা চোরাচালানি পাহাড় কাটা থেকে শুরু করে সামাজিক বনায়নের বনাঞ্চল উজাড় করে অবৈধ করাত কলের চিরাই করে তা খোলা বাজারে চড়া দামে বিক্রি করে আসছে। আর এত করে ইয়াবা চোরাচালানী ফরিদ তার ভাই চট্টগ্রামের বাশখালী থানার ওসি’র ভাই পরিচয় দিয়ে সাগর পথে বেশ কয়েকটি ইয়াবার চালান ওই বাঁশখালী থানায় খালাস করা হয় বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।

এছাড়াও স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা নামধারী চোরাকারবারী আবুল কালাম অবৈধ স’মিল বসিয়ে পরিবেশের ক্ষতি করে আসলেও সংশ্লিষ্ট পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন। জাহাঙ্গীর আজিজ চেয়ারম্যানের ১টি স’মিল, হুন্ডি সিরাজের ১টি, আবুল কালামের ১টি, সাবেক চেয়ারম্যান দীপক বড়–য়ার ১টি, ফরিদ আলমের ১টি, সুবত বড়–য়ার ১টি সহ মোট ৭টি অবৈধ করাত কল বিদ্যমান রয়েছে। ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজ বন রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বিট কর্মকর্তা ছৈয়দ আলম এসবের নাটেরগুরু বলে জানা গেছে। শুধু তা নয় এই দুই কর্মকর্তার মাসিক আয় অন্তত এ খাত থেকে ৪ থেকে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঘুষের লেনদেন হয় বলে জানা গেছে। কারবারী মোঃ হোছন জানান বর্তমানে প্রতিটি অবৈধ স্থাপিত করাত কলে ১৫ থেকে ২০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন প্রজাতির অবৈধ কাঠের মজুদ রয়েছে। বিশেষ করে আবুল কালামের স’মিলে ২০ লক্ষ টাকার মত সেগুন কাঠের মজুদ রয়েছে। যা সরাসরি অভিযান পরিচালনা করে এসব কাঠ উদ্ধার পূর্বক সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করে নিতে পারে। অভিযুক্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বন কর্মকর্তা ছৈয়দ আলমের দ্রুত অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানিয়ে স্থানীয়রা বলেন, এ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ঘুষ বাণিজ্যের কারণে একের পর এক গড়ে উঠছে অবৈধ স’মিল। দুর্নীতিবাজ এ কর্মকর্তাদ্বয়ের লাগাম টেনে ধরা না হলে ঘুমধুমের বনাঞ্চল অচিরেই বৃক্ষশূণ্য হয়ে পড়বে। সেই সাথে ঘুমধুমের পরিবেশ হুমকিরমুখে তো রয়েছে। এ প্রসংগে জানতে অভিযুক্ত বিট কর্মকর্তা ছৈয়দ আলমের মোবাইল ফোনে একাধিক বার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।