জঙ্গিদের কাছে কী এমন তথ্য ছিল, যা বিবব্রতকর অবস্থায় ফেলতে পারতো পুলিশকে?

সময়ের কণ্ঠস্বর –    যে জঙ্গিদের কাছ থেকে পুলিশ গুরুত্ব পূর্ণ তথ্য পেতে পারত তাদের এভাবে কেন খুন করা হচ্ছে ? এটা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে । তবে কি পুলিশ কোন কিছু আড়াল করতে চাচ্ছে তা না হলে এভাবে খুন কেন ? যে হত্যার রহস্য উন্মোচিত হতে পারতো অথচ তা আরও রহস্যের গভীরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কেন ?

ব্লগার ড. অভিজিৎ রায়কে হত্যা ও মাদারীপুরের শিক্ষকের ওপর হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন শরিফুল ও ফাহিমের ক্রসফায়ার তুলেছে নানা প্রশ্ন ৷

রবিবার ভোররাতে ঢাকার মেরাদিয়া এলাকায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় শরিফুল ওরফে হাদি৷ পুলিশের দাবি, একটি মোটর সাইকেলে তিনজন যাওয়ার সময় পুলিশ চ্যালেঞ্জ করলে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে৷ এরপর পুলিশ প্রতিরোধ করলে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় শরিফ৷ জানা যায়, তার গ্রামের বাড়ি বাংলাদেশের দক্ষিণের জেলা সাতক্ষীরায়৷ সেখানে অবশ্য সে মুকুল নামে পরিচিত ছিল৷

শরিফুল ছিল লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ হত্যার প্রধান সন্দেহভাজন আসামি৷ তবে পুলিশের ধারণা, সে একই ধরনের আরো সাতটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত৷ তাই তাকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়৷ পুলিশ জানায়, অভিজিৎ রায় এবং তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে শরিফ হত্যার আগে অনুসরণ করছিল৷ এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজও নাকি রয়েছে পুলিশের কাছে৷

১৫ জুন মাদারীপুর সরকারি নাজিমউদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের গণিত বিভাগের প্রভাষক রিপন চক্রবর্তীর ওপর হামলার ঘটনায় গোলাম ফাইজুল্লাহ ফাহিম নামে নিষিদ্ধ হিযবুত তাহরিরের এক সদস্যকে জনতা আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়৷ আটকের পর ফাহিমকে নেওয়া হয় পুলিশ রিমান্ডে৷ কিন্তু রিমান্ডে নেওয়ার পর রিমান্ডে থাকা অবস্থায়ই শনিবার ভোররাতে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় সে ।

জঙ্গি বিষয়ক গবেষক এবং মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নূর খান গণমাধ্যমকে  বলেন, ‘‘বন্দুকযুদ্ধে নিহত শরিফুল এবং ফাহিম জঙ্গিদের ব্যাপারে ব্যাপক তথ্যের উৎস হতে পারতো৷ পুলিশের কথা অনুযায়ী, শরিফ লেখক-ব্লগারদের সব হত্যাকাণ্ডে জড়িত৷ তাই যদি হয়, তবে স্বাভাবিক বিবেচনায় তাকে বাঁচিয়ে রাখাই তো ছিল পুলিশের প্রথম কাজ৷ কিন্তু পুলিশ কেন তা করল না? তাকে বাঁচিয়ে রাখতে কেন সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করল না তারা? এটাই আমার কাছে বড় প্রশ্ন৷’

নূর খান প্রশ্ন করেন, ‘‘এই জঙ্গিদের কাছে কী এমন তথ্য ছিল, যা বিবব্রতকর অবস্থায় ফেলতে পারতো পুলিশকে? আমরা জানি, জঙ্গিদের সঙ্গে সমাজে এবং প্রশাসনের প্রতিষ্ঠিত অনেকের যোগাযোগেরই অভিযোগ আছে৷ তাহলে কিছু একটা আড়াল করতেই কি তাদের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়া অনিবার্য হয়ে পড়েছিল?” তিনি বলেন, ‘‘জঙ্গি কেন, কোনো ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডই গ্রহণযোগ্য নয়৷ কারণ এরা যদি অপরাধী হয়ে থাকে, তাহলেও তো তাদের বিচারের মুখোমুখি করা গেল না৷ এর সেটা হলো না শুধুমাত্র বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার কারণে৷ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য এটা কিন্তু জরুরি ছিল৷”

keno-korofire

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনার শুরু হয় ২০০৪ সাল থেকে৷ ২০০৫ সালে সর্বোচ্চ ৩৫৪ জন নিহত হন৷ এরপর নিহতের সংখ্যা কমে আসলেও, ২০১৪ সাল থেকে আবারো বাড়তে থাকে এই সংখ্যা৷ ঐ বছর ক্রসফায়ারে নিহত হন ১২৮ জন৷ ২০১৫ সালে ১৪৬ এবং চলতি বছরে এ পর্যন্ত ৫৯ জন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন৷ আর এ পর্যন্ত গত প্রায় সাড়ে ১২ বছরে মোট নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৭১৫ জন৷ নূর খানের কথায়, ‘‘প্রতিটি ক্রসফায়ারের গল্প প্রায় একইরকম৷ এই গল্প আর বিশ্বাস করা যায় না৷