আইনশৃংখলা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে জনমতে প্রশ্ন

arms-uttora-pik

সময়ের কন্ঠস্বর: শনিবার উত্তরা থেকে বিপুল পরিমাণ বিদেশী অস্ত্রের বড় চালান উদ্ধার করে পুলিশ। আইনশৃংখলা বাহিনীর কঠোর নজরদারির মধ্যে বিপুল পরিমাণ এ অস্ত্রের চালান ঢুকে পড়ায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জনমতে। বিগত সময়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা বিদেশী নামি-দামি ব্র্যান্ডের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করলেও বর্তমানে অস্ত্রের ব্যবহার সাধারণ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে।

অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র এখন সন্ত্রাসীদের হাতে হাতে। ফলে প্রায় সময়ই বিদেশী অস্ত্রসহ পুলিশের কাছে ধরাও পড়ছে সন্ত্রাসীরা। পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হচ্ছে বড় ধরনের অস্ত্রের চালানও। এসব অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় আতংকিত হয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষ।

শনিবার উত্তরায় অবৈধ অস্ত্রের এ বিশাল মজুদ উদ্ধারের পর খোদ রাজধানীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারির মধ্য দিয়েও এতো বিদেশী অস্ত্র আসছে কোথা থেকে ?

পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সাধারণ অভিযান চালিয়ে মোট অস্ত্র উদ্ধার হয় ১৭ হাজার ৫৬৫টি। ২০১৫ সালে ১ হাজার ৩০১টি, ২০১৪ সালে ২ হাজার ৩২৮টি, ২০১৩ সালে ১ হাজার ৭১৫টি, ২০১২ সালে ২ হাজার ৯৮ টি, ২০১১ সালে ২ হাজার ২৩৪টি, ২০১০ সালে ২ হাজার ৮১৮ টি, ২০০৯ সালে ২ হাজার ২০৬ এবং ২০০৮ সালে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয় ৩ হাজার ৯৫টি।

বিপিডিসির এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়,  চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কয়েক বছরে অস্ত্রের দামও বেড়েছে কয়েকগুণ। তবু চাঙ্গা অবৈধ অস্ত্রের বাজার। নজরদারি না থাকায় দেশের অন্তত দেড়শ’ অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেট বিভিন্ন সীমান্তের অন্তত ৫৭টি পয়েন্ট দিয়ে অবৈধ অস্ত্রের চালান দেশে আনছে। পরে তা ছড়িয়ে দিচ্ছে সারা দেশে। সগঠনটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতীয় অস্ত্রের পাশাপাশি চীন ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে আসা অবৈধ অস্ত্র ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীসহ সারা দেশে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) এম মুনীরুজ্জামান বলেন, সীমান্তের চিহ্নিত অস্ত্র চোরাচালানের প্রবেশপথগুলো বন্ধ করতে না পারায় দেশে অবৈধ অস্ত্রের মজুদ বাড়ছে। এছাড়া যেসব বিদেশী অত্যাধুনিক অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে, সেগুলোর প্রতিটিরই বিশেষ সিরিয়াল নম্বর আছে। সেসব নম্বরের সূত্র ধরেও অস্ত্রের কোম্পানি, কোম্পানি থেকে কেনা ডিলারের নাম-ঠিকানা, এমনকি খুচরা ক্রেতারও সব তথ্য জানা সম্ভব। নামিদামি ব্র্যান্ডের অস্ত্র কোম্পানি থেকে বৈধ ডিলাররাই কিনতে পারেন। সেসব ডিলারের কাছ থেকে যারা অস্ত্র কেনেন, তাদেরও নাম-পরিচয়সহ বৈধ কাগজপত্র থাকে। এর ব্যতিক্রম যেখানে হয়, মূলত সেখান থেকেই অস্ত্র অবৈধভাবে চোরাকারবারিদের হাতে চলে যায়। এসব বিষয়ে ব্যাপক তদন্ত হলে অস্ত্র চোরাকারবারিদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট শনাক্ত করা সম্ভব। তবে সরকারের পক্ষ থেকে তেমনভাবে গুরুত্ব না দেয়ায় অস্ত্র চোরাকারবারির বরাবরাই লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়।

তিনি আরো বলেন, অবৈধ অস্ত্রের পেছনে আন্তর্জাতিক মাফিয়া ও চোরাচালানিদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক কাজ করছে। সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র পাচার বন্ধে বিজিবির মুখ্য ভূমিকা পালন করার কথা। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের জোরদার তৎপরতা হ্রাস পায়। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ ও বিজিবির কিছু অসৎ সদস্য চোরাকারবারিদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেয়। ফলে অবৈধ অস্ত্র নিয়ে বাহকরা অবাধে সীমান্ত পার হয়ে দেশে প্রবেশ করার সুযোগ পাচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের উদাসিনতাকেও তারা দায়ী করছেন।

বড় অস্ত্র চালান আটকের কয়েকটি ঘটনা: দেশে সবচেয়ে বড় অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে ২০০৩ সালে। ওই বছরের ১ ফেব্র“য়রি ২ হাজার বিমানবিধ্বংসী গোলা, ২২ হাজার রাউন্ড ভারি মেশিনগানের গুলি, ১৭ হাজার এসএমজির গুলি ছাড়াও বিভিন্ন অস্ত্রের আরও ৪৩ হাজার গুলি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা হয় ৬০টি অত্যাধুনিক অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক। এর পরের বছর ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রামের ইউরিয়া সার কারখানার ঘাটে (সিইউএফএল) উদ্ধার হয় দেশের সর্ববৃহৎ ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালান। ট্রলার থেকে অস্ত্রের ওই চালানটি ট্রাকে তোলার সময় আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা আটক করেন। এ ঘটনার সঙ্গে তৎকালীন বিএনপি জোট সরকারের জোগসাজশ থাকার অভিযোগ ওঠে। পরে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে এসব অস্ত্র র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে ব্যবহারের জন্য দেয়া হয়। এরপর ২০১১ সালে গাজীপুরের কালিয়াকৈর এলাকার গহিন বন থেকে উদ্ধার করা হয় অত্যাধুনিক একে-৪৭ রাইফেল ও ২০ হাজার রাউন্ড গুলি। একই বছরের ২১ এপ্রিল হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের হ্যাঙ্গার গেট থেকে ১১৮ কার্টনে আনা বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়। পরে জানা যায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে যৌথ মহড়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে একটি বিশেষ বিমানে (টিআরইকে-২৭) ওই অস্ত্র বাংলাদেশে আনা হয়। তবে বিষয়টি আগেভাবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে না জানানোয় তা কাস্টমস আটকে দেয়। পরে ওই অস্ত্রের চালান আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২০১৪ সালের ৩ জুন হবিগঞ্জের দুর্গম পাহাড়ের বিভিন্ন বাংকার খুঁড়ে ২শ’ রকেট লাঞ্চারসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে র‌্যাব। পরে জানা যায়, উদ্ধার করা এসব অস্ত্রের মালিক ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন অল ত্রিপুরা টাইগার ফোর্স (এটিটিএফ)। এরপরেও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছোটখাটো অস্ত্রের চালান উদ্ধার করেন আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা। সর্বশেষ শনিবার বিকাল থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত উত্তরার পঞ্চবটি এলাকায় বৌদ্ধ মন্দিরের পেছনে একটি খাল থেকে বিপুলসংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে। রাজধানী থেকে বিপুল পরিমাণ এ অস্ত্র উদ্ধারের পর শুরু হয়েছে তোলপাড়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারী আরো বাড়িয়ে জগনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার হোক এমনটাই দাবি সাধারণ জনগনের।