ঘরে বসেই বাড়তি আয় নারীদের

aRaihajar-Nario

এম এ হাকিম ভূঁইয়া, আড়াইহাজার প্রতিনিধি: নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার উপজেলার ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়নের প্রায় শতাধিক পরিবারে নারী সদস্যরা ঘরে বসেই শাড়ী, থ্রি-পিস ও ওড়ণায় পুঁতি বসানোর কাজ করে বাড়তি টাকা আয় করছেন। কাপড়ে বাহারি রংয়ের পুঁিতর রকমারী ডিজাইনের সমম্বয় ঘটিয়ে প্রত্যন্ত এই গ্রামাঞ্চলের নারীরা খোঁজে পেয়েছেন পথ চলার নতুন দিগন্ত। সুচিশিল্পের ছোঁয়ায় ধীরে ধীর বদলে যাচ্ছে ঐ গ্রামের অবহেলিত নারীদের জীবনচক্র। এক সময়ের অবহেলিত এই নারীরা খুব সহজেই এপেশায় স্বাবলম্বী হচ্ছেন। স্থানীয় পর্যায়ে এর ব্যাপক চাহিদা থাকায় ও স্বল্প পুঁিজতে অধিক ভাল জনক হওয়ায় অনেকেই ঝুঁকছেন এ কাজের দিকে। সামনে ঈদ তাই তাদের কাজের চাপ অনেক। এক সময় গৃহস্থালীর কাজের বাইরে গৃহবধূরা অসল সময় কাটাতেন। বর্তমানে এই কাজ করে তারা দিনভর ব্যস্ত সময় পার করছেন। এক সময় অভাব ছিল যাদের নিত্যসঙ্গী, তারাই এখন এটাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তাদের অভাবের সংসারে গড়ে তুলেছেন সচ্ছলতার ভিত। তাদের সংসারে এখন সোনালী দিন। নানা রংয়ের কাপড়ে বাহারি রংয়ের পুঁিত বসিয়ে তাদের জীবন প্রণালীও রঙ্গিন করে তুলেছেন। দূর করতে সক্ষম হয়েছেন পরিবারে লেগে থাকা দীর্ঘ দিনের অভাব। বসে নেই বাড়ির ছোট্ররাও। লেখাপড়ার পাশাপাশি ওই গ্রামের অনেক শিক্ষার্থীও পুঁিত বসানোর কাজ করে বাড়তি টাকা আয় করছেন। জোগাচ্ছেন লেখাপড়ার খরচ। এগিয়ে নিচ্ছেন তাদের শিক্ষা কার্যক্রম। কাপড়ে অপরূপ সৌন্দর্যের কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পোশাক প্রেমী নারীরা প্রতিদিন ভিড় করছেন কারিগরদের বাড়িতে। তাদের পছন্দ মতো পুঁতি বসিয়ে নিচ্ছেন কাপড়ে। এলাকায় ঘুরে ঘুরে পুঁতি বসানো থ্রি-পিস, ওড়ণা, শাড়ী, লেহেঙ্গা কিনে নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ফেরি করে বিক্রি করে অনেকেই খুঁজে পেয়েছেন কর্মসংস্থান।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, হরধুম কাজ চললে ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামে। নরিংদী গ্রামের গৃহবধূ শাহীদা বাড়িতে বসেই শাড়িতে পাথর, চুমকি, জরি বসানোর কাজ করছেন। পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে তার মেয়ে শাহীনুর মাকে সহযোগিতা করছেন। এতে তাদের পরিবারের এসেছে স্বচ্ছলতা। সুচিশিল্পের কাজ করে ওই ইউনিয়নের আরও অনেকেই পরিবারে সচ্ছলতা এনেছেন। তিনি র্দীঘ ১৩ বছর ধরে কাপড়ে পুঁতি বসানোর কাজ করছেন। এতে তার সংসাররে সচ্ছলতা এসেছে বলে জানিয়েছেন শাহীদা।

পুঁতি কারিগর সাবিনা সুলতানা বলেন, ‘আমার চারটি ছেলেমেয়ে। সবাই পড়ালেখা করে। আগে অভাব থাকলেও অহ্যান সংসারে সচ্ছলতা আইছে। একটা সময় অনেক কষ্টে করে সংসার চললেও আমার সংসারে অহ্যান অভাবে নাই।’ তার চোখে মুখে আনন্দের ছাপ। সংসারে তার বাধ ভাঙা সুখের হাঁসি। ১৫ বছর ধরে তিনি পুঁতি বাসানোর কাজ করছেন। তার বাড়িতে পাঁচ জন নারী শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তিনি বলেন, তার স্বামী রুপগঞ্জের গাউছিয়া থেকে কাপড় কিনে নিয়ে আসেন। তাতে সপ্তাহ জুড়ে তিনি ও কারিগররা মিলে রকমারি ডিজাইনের পুঁিতর কাজ করেন। পরে দেশের বিভিন্ন স্থানের বড় বড় শপিং মলে পাইকারী বিক্রি করে থাকেন। সামনে ঈদুল ফিতর থাকায় কাজের চাপক বেশি। একজন নারী দৈনিক ১০ থেকে ১৫ টি থ্রি-পিসে পুঁিত বসাতে পারেন। একজন কারিগর দৈনিক ১৫০ থেকে ২০০ টাকা উপার্জন করে থাকেন।

গ্রামটিতে ঢুকতেই চোখে পড়ে নানা বয়সের নারী কারিগররা থ্রি-পিস, শাড়ী, লেহেঙ্গারে হরেকরকমের কারুকাজ করছেন সকাল হতে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত পুঁতি বাসানোর কাজ করছেন। দেখা গেছে, কেউ পুঁতি সাজিয়ে দিচ্ছেন। কেউ কাপড়ে পেনসিল দিয়ে নকশা এঁকে দিচ্ছেন। কেউ বিশেষ আঠা দিয়ে পুঁিত কাপড়ে বসাচ্ছেন।

রীতা জানান, একটি শাড়ির কাজ শেষ করতে ৫-৬ দিন সময় লাগে। প্রতিটি শাড়িতে তারা পাঁচশ’ টাকা করে পারিশ্রমিক পান। শতাধিক নারী সুচিশিল্পে কাজ করে আজ স্বাবলম্বী। ঈদ সামনে রেখে এখন তারা ভীষণ ব্যস্ত। এ এলাকার যেসব মেয়ের অন্য এলাকায় বিয়ে হয়েছে ঈদের সময় এখানে এসে তারাও বাড়তি আয় করছেন। এসব শাড়ি ঢাকার বেনারসি পল্লীসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি হয়। তিনি আরও বলেন, স্বামীর আয়ের ওপর তাদের নির্ভর করতে হলেও বর্তমানে তারা নিজেরাই পুঁিতর কাজ করে বাড়তি আয় করছেন। একটা সময় ছিল গৃহস্থালী কাজের বাইরে তাদের তেমন কোনো কাজ ছিল না। অনেকটা অসল কাটাতে হত তাদের। কাজের ব্যস্ততায় এখন যেন তাদের নাওয়া- খাওয়ার সময় নেই। স্বামীর আয়-রোজগারের পাশাপাশি গৃহবধূরা সংসারের আর্থিক সমস্যার সমাধান করছেন। পাশাপাশি সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলছেন তাদের প্রিয় ছেলে মেয়েদের। সম্ভবনার এশিল্পকে তারা তাদের জীবন-জীবিকার নির্বাহের একমাত্র চালিকা শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। সংসারের খরচ শেষে তারা ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয়ও করছেন।

পাইকারী বিক্রেতা আলমগীর বলেন, বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে পুঁতি বাসানো থ্রি-পিস, ওড়ণা, শাড়ী তিনি পাইকারী কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠা বড় বড় মাকের্টে বিক্রি করছেন। তিনি দীর্ঘ ১০ বছর ধরে এই ব্যবসার সাথে জড়িত আছেন। তিনি আরও জানান, মান ও প্রকার ভেদে একটি থ্রি-পিসের মূল্য ৫০০ টাকা থেকে ৬০০টাকা হয়ে থাকে। একটি ১৫০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এম এ হাকিম ভূঁইয়া
আড়াইহাজার প্রতিনিধি
০১৯২৪-৫১৩৯৯৬
২১-৬-১৬