আপনার সন্তানের মিথ্যে বলা অভ্যাসের কারন যখন আপনি নিজেই !

আপনার সন্তানের মিথ্যা বলার কারণ আপনি না তো!

আফসানা নিশি, লাইফস্টাইল কন্ট্রিবিউটর, সময়ের কণ্ঠস্বর

আপনার সন্তানের মিথ্যা বলার কারণ আপনি না তো? জানি লেখাটা পড়ে অবাক হচ্ছে সবাই। বিশেষ করে যারা সন্তানের বাবা-মা তারা বেশি অবাক হচ্ছেন।ভাবছেন আমি কেনো আমার সন্তানকে মিথ্যে বলা শেখাবো। আমি তো সব সময় তাকে সত্যের পথে থাকার শিক্ষা দান করি। পড়ে অবাক হলেও এটাই বাস্তব সত্যি যে,আপনার সন্তান আপনার জন্যই মিথ্যে বলে।

আপনি তাকে দিনের পর দিন মিথ্যে বলতে বাধ্য করছেন। আপনার সন্তান জন্মের পর থেকে আপনার ছায়ায় আপনার আদর্শে বড় হয়। আপনি তাকে যা শিক্ষা দান করবেন সে সেটাই শিখবে। কিন্তু শিক্ষা দানের জন্য তার মনে ভয় নয় সাহস জোগান।

অনেক বাবা-মা আছে তারা সন্তানের দুষ্টুমি বন্ধ করতে তাকে বিভিন্ন রকম ভয় দেখায়। যেমন:তুমি যদি খেলনা ভাঙ্গ তবে তোমাকে ভিষণ মারবো। স্কুলে গিয়ে কোন দুষ্টুমি করবে না,করলে কিন্তু স্কুল যাওয়া বন্ধ করে দেবো। তুমি যদি টিফিন না খেয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে আসো তবে বাসায় তোমার খাওয়া বন্ধ। আপনারা মনে করেন যদি এভাবে শাসন করা হয় তবে আপনার সন্তান ভয়ে আর এই কাজগুলো করবে না। আমি বলব,আপনার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। এতে হিতে বিপরীত হবে। বাচ্চা স্কুলে গিয়ে টিফিনটা হয়তো খাবে না। ফেলে দিয়ে ফাঁকা টিফিন বক্স এনে আপনাকে বলবে দেখো মা আমি সব খেয়েছি। আসলে কি সে সব খাচ্ছে? না। বরং খাবার নষ্ট করার সাথে সাথে সে বাসায় ফিরে আপনাকে মিথ্যে বলছে। কারণ তার মনে ভয় আছে খাবার খায়নি শুনলে মা মারবে বা দুপুরে খেতে দেবে না।

হয়তো বিকেলে মাঠে খেলতে যেতে দিবেন না। আপনার একটা কথা তার মনে এমন এক ধরণের ভীতির সৃষ্টি করবে যার থেকে সে নিজের মনের মতো করে আরো অনেক ভয়ের জন্ম দেবে। হয়তো আপনার সন্তান স্কুলে দুষ্টুমি করছে কিন্তু আপনাকে মিথ্যে বলছে। স্যার খাতার পিছনে নোটিশ লিখে দেওয়ার পরেও বলবে,না আম্মু আমি কিছু করিনি। অন্যরা দুষ্টুমি করেছে,স্যার আমার নামেও মিথ্যে নালিশ করেছে। আসলে কি তাই? আপনার সন্তান কিন্তু অপরাধ করছে এবং আপনার ভয়ে সে বাসায় এসে সেটা আড়াল করতে মিথ্যে বলে। কারণ তার মনে প্রচন্ড ভয় কাজ করছে। সে বুঝতে পারছে আপনি সত্যিটা জানলে তাকে খুব মারবেন বা সত্যি সত্যি স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেবেন।

somoyerkonthosor-your-child

এভাবে যদি আপনার ভয়ে সে নিয়মিত মিথ্য বলে তবে এই মিথ্যা একদিন আপনার সন্তানকে পৌঁছে দেবে অপরাধের চরম শেখরে। সন্তানকে নিজের বাধ্য করার জন্য আরো অনেক উপায় আছে। আপনি তাকে একই কথা অন্য রকম করে বলুন। তাকে বলুন,সোনা খেলনা ভাঙ্গবে না। খেলনা ভাঙ্গলে তুমি কি নিয়ে খেলবে। এগুলো খেলা শেষে যত্ন করে তুলে রাখবে। বাচ্চার ব্যাগে টিফিন বক্স দেওয়ার সময় তাকে বলুন, বাবু সবটুকু খাবার শেষ করবে। না খেলে শরীর খারাপ হবে। তুমি যদি আজ সব টুকু খাবার শেষ করতে পারো তবে বিকেলে একটু বেশি সময় খেলতে দেবো। স্কুলে দুষ্টুমি করবে না। সবাই খারাপ বলবে। কোন সমস্যা হলে এসে আমাকে বলবে আমি স্যারদের সাথে কথা বলবো।

তাহলে কি আপনার সন্তান একই রকম অপরাধ করবে? আমি বলব, না। আপনার এই কথাগুলো কিন্তু আপনার সন্তানের মনে ভয় না বরং সাহস আর উৎসাহ জাগাবে। সে বিকেলে খেলতে পারবে ভেবে টিফিনে সব টুকু্ খাবার খাওয়ার চেষ্টা করবে। না পারলে হয়তো বাসায় ফিরে বলবে,আম্মু তুমি একটু বেশি খাবার দিয়ে দিয়েছিলে। আমি সবটা খেতে পারিনি তবে অনেক খেয়েছি। তখন আপনি যদি হাসি মুখে বলেন ভাল সোনা আমার। আজ তাহলে তোমার পুরষ্কার স্বরূপ,বিকেলে আধা ঘন্টা বেশি খেলার সময় পাবে। তাহলে লক্ষ্য করে দেখবেন আপনার সন্তানের মুখে কোন মিথ্যে ভয়ের ছাপ নেই। তার চোখে মুখে একটা খুশি আর আত্নবিশ্বাসের ছায়া। স্কুলে কোন সমস্যা হলেও সে মিথ্যে না বলে বরং নিজে থেকে এসে আপনাকে সব বলবে। কারণ সে জানবে আপনি তাকে মারবেন না। আপনি পারবেন স্কুলে গিয়ে স্যারদের সাথে কথা বলে তার শাস্তিটা মাফ করাতে।

আমি আমার নিজের দেখা একটা বাস্তব ঘটনা থেকে বলছি-আমার পাশের বাসায় একজন মহিলা তার ৭ বছরের মেয়েকে নিয়ে থাকে। স্বামী কাজের সুত্রে একটু দূরে থাকে। সপ্তাহে ১ বা ২ দিন আসে। মহিলা নিজেও চাকরি করেন। সকালে যায়,সন্ধ্যায় ফেরে।মেয়েটা সারাদিন অন্যের বাসায় থাকে। সন্ধ্যায় যখন তিনি বাসায় এসে মেয়েকে নিয়ে পড়াতে বসেন তখন শুরু প্রচন্ড চেচামেচি আর মারধর। সারাদিন ওই মেয়ে যা দুষ্টুমি করে বা স্কুল থেকে যা নালিশ আসে তার জন্য মারে। টিফিন না খেলে মারে। এমন অনেক ঘটনা। তার কিছুক্ষণ পর দেখা যায় দুজনে আইসস্ক্রিম খেতে যাচ্ছে বা খেলা করছে। কিন্তু এতে তো কোন লাভ নেই। সারাদিন মাকে কাছে না পাওয়া মেয়েটা তো চায় মা এসে তাকে আদর করুক। তাকে ভাল করে একটু খাইয়ে দিক। যখন এগুলোর কোনটা না হয়ে প্রথমে শুরু হয় শাসন পর্ব তখন কিন্তু ওই মেয়েটার মনে শুরু হয় ভয়। সে রোজ ভাবতে থাকে মা অফিস থেকে এলে কিভাবে মিথ্যে বলে তাকে বোঝাবো। কিভাবে মার চোখের আড়ালে দুষ্টুমি করবো। এতে সে দিন দিন মিথ্যেবাদী তৈরি হচ্ছে।

কিন্তু উনি যদি প্রথমে এসে শাসণ না করে আদর করতেন তবে এমনটা হতো না। কখনো হতো না। অধিকাংশ বাবা-মা তার সন্তানকে শাসনের নামে ভয় দেখাচ্ছে। হয়তো নিজের অজান্তে করছে তবুও করছে। তাদের সাথে বন্ধুর মতো আচরণ করুন যাতে তারা আপনাকে ভয় না পায়। তারা আপনাকে নিজেদের সব সমস্যার কথা বলতে পারে। উচ্চ স্বরে না নম্র ভাবে কথা বলুন বাচ্চার সাথে।

আদেশের থেকে অনুরোধ বেশি পছন্দ করে বাচ্চারা। তাদেরকে বড়দের মতো আচারণ করতে বাধ্য না করে নিজের সন্তানের ভালোর জন্য আপনি একটু বাচ্চা সুলভ আচরণ করে দেখুন না ফল পান কি না? আপনার ভয়ে নিজের করা অপরাধের কথা লুকিয়ে যেনো বড় কোন অপরাধী না হয়ে উঠে। মনে রাখবেন ‘মিথ্যে’ বলা আপরাধের সব থেকে বড় আভাস। আপনার সন্তানের আচারণ কোন অপরাধকে নির্দেশ করছে না তো? খেয়াল রাখার দায়িত্ব আপনার, সমাধানও কিন্তু আপনারই কাছে।