টাকার অভাবে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েও কলেজে ভর্তি হতে পারছেনা পাবনার আট শিক্ষার্থী

takar-ovabe

সময়ের কণ্ঠস্বর –   দারিদ্রতা যেখানে নির্মম টাকার অভাবে  ভর্তি চিন্তা তো দূরের কথা সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে তাদের।  গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েও কলেজে ভর্তি হতে পারছেনা পাবনার আট শিক্ষার্থী । 

ওই আট শিক্ষার্থী হলো মেরাজুল হক, ফারজানা আক্তার, আসাদুল ইসলাম শেখ, পুষ্প ইসলাম, আরিফুল ইসলাম আরিফ, মৌসুমী খাতুন, জান্নাতুল জুঁই ও এরেঞ্জ মাহমুদ শান্ত।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই আট শিক্ষার্থীর বর্তমান বাস্তবতা।

মেরাজুল হক : পাবনার সুজানগর উপজেলার বজলুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে মেরাজুল। উপজেলার দুলাই ইউনিয়নের চরদুলাই গ্রামের প্রয়াত হাবিবুর রহমানের ছেলে মেরাজুল এখন কলেজে ভর্তি হওয়ার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছে না।

বাবার মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরতে হয়েছে তাকে। সেই সঙ্গে একমাত্র ছোট বোনের পড়ালেখার খরচ চালাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছে। তারপরও থেমে থাকেনি পিতৃহারা মেরাজুল। পরীক্ষার ফলাফল শুনে দু-একদিন মনে বেশ আনন্দ থাকলেও এখন তার চোখে-মুখে হতাশার ছায়া। মেরাজুলের ইচ্ছে, পড়ালেখার সুযোগ পেলে চিকিৎসক হয়ে দরিদ্র মানুষকে সেবা করবে সে।

ফারজানা আক্তার : দারিদ্র্যকে জয় করে পাবনার সুজানগর উপজেলার বজলুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে ফারজানা। উপজেলার চরদুলাই গ্রামের ভূমিহীন কৃষক আবদুর রাজ্জাক বাবলুর মেয়ে ফারজানার দুই ভাই, দুই বোন রয়েছে। মা-বাবা মিলে ছয়জনের অভাব-অনটনের সংসারে অনেক কষ্টেই পড়ালেখা চালিয়ে গেছে সে। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ফারজানার কলেজে ভর্তি হতে দারিদ্র্যই এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফারজানার বাবার পক্ষে আর মেয়ের পড়ার খরচ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাঁর পড়ালেখা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে পরিবার। সহযোগিতা পেলে চিকিৎসক হয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায় ফারজানা।

আসাদুল ইসলাম শেখ : সুজানগর উপজেলার দুলাই উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে এ প্লাস পেয়েছে আসাদুল ইসলাম শেখ। উপজেলার আহাম্মদপুর ইউনিয়নের চরগোবিন্দপুর গ্রামের ভূমিহীন দিনমজুর ছায়েন উদ্দিন শেখের ছেলে আসাদুল জিপিএ ৫ পেলেও কলেজে ভর্তি হওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে। তার পরিবারের পক্ষে লেখাপড়া চালানো সম্ভব হচ্ছে না। অথচ প্রকৌশলী হয়ে দেশ গড়ার স্বপ্ন তার মনে।

পুষ্প ইসলাম : সুজানগর উপজেলার বজলুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এ প্লাস পেয়েছে পুষ্প ইসলাম। উপজেলার চরদুলাই গ্রামের ভূমিহীন বাবা নজরুল ইসলাম স্বল্প বেতনে উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় চাকরি করেন। তাঁর স্বল্প আয়েই চলে পাঁচ সদস্যের পরিবার। অভাব অনটনের সংসারে অনেক কষ্টেই পড়ালেখা চালিয়ে গেছে পুষ্প। দারিদ্র্যকে জয় করে ভালো ফলাফল করেও উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছে পুষ্প ও তার বাবা-মা। সুযোগ পেলে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে শিক্ষকতা পেশায় আত্মনিয়োগ করতে চায় সে।

আরিফুল ইসলাম আরিফ : দুলাই উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এ প্লাস পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয় আরিফুল। দুলাই গ্রামের হতদরিদ্র ভূমিহীন মো. ইব্রাহিমের ছেলে সে। এত ভালো ফল করেও এখন কলেজে ভর্তি হওয়ার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছে না। তার বাবা ইব্রাহিম দুলাই বাজারে পাটখড়ি বিক্রি করে যা পান, তাই দিয়ে সংসার চলে। এই সংসারে আরিফুলের অর্ধাহারে-অনাহারে কেটেছে অনেক রাত। এরপরও শারীরিক প্রতিবন্ধী আরিফুল থেমে থাকেনি। অন্যের বই পড়ে না খেয়ে স্কুলে গেছে। সহযোগিতা পেলে সে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে চায়।

মৌসুমী খাতুন : কোনো বাধাই দমিয়ে রাখতে পারেনি দুলাই উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এ প্লাস পাওয়া মৌসুমীকে। উপজেলার বদনপুর গ্রামের ভূমিহীন কৃষক আনোয়ার হোসেনের মেয়ে মৌসুমীরা তিন ভাইবোন। মা-বাবা মিলে পাঁচজনের অভাব-অনটনের সংসারে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে তাকে। এখন ভালো ফলাফল করেও কলেজে ভর্তি হওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে মৌসুমীর। সহযোগিতা পেলে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে চিকিৎসক হয়ে অসহায় মানুষের সেবা করতে চায় সে।

জান্নাতুল জুঁই : বজলুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেন এ প্লাসপেয়েছে জান্নাতুল জুঁই। উপজেলার চরদুলাই গ্রামের ভূমিহীন বাবা ইমরুল কায়েস পেশায় একজন মেকানিক। পাঁচ সদস্যের অভাবের সংসারে কষ্টেই পড়ালেখা চালিয়ে গেছে জুঁই। ভালো ফলাফল করেও কলেজে ভর্তি নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছে সে ও তার পরিবার। জুঁইয়ের ইচ্ছে, পড়ালেখার সুযোগ পেলে চিকিৎসক হয়ে সমাজের অসহায় মানুষের সেবা করবে সে।

এরেঞ্জ মাহমুদ শান্ত : দুলাই উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে এরেঞ্জ মাহমুদ শান্ত। তার বাবা উপজেলার দুলাই গ্রামের দরিদ্র ভূমিহীন চঞ্চল হোসেন। তিনি দুলাই বাজারে ছোট মুদির দোকানের মাধ্যমে সংসার চালান। এ অনটনের সংসারে ভালো ফল করেও শান্ত কলেজে ভর্তি হওয়া আর পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে। তার বাবার পক্ষে আর পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সহযোগিতা পেলে শান্ত পড়ালেখা করে চিকিৎসক হয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায়।

সুত্র –  দৈনিক  শিক্ষা