কক্সবাজার মহেশখালী থেকে ৯১ কি.মি. এলএনজি গ্যাস সরবরাহে পাইপলাইন নির্মান

moheskhali-gash-line

জামাল জাহেদ, কক্সবাজার: কক্সবাজারের মহেশখালীতে দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতাসম্পন্ন দেশের প্রথম ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে পেট্রোবাংলা ও ‘এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেড’-এর মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। এলএনজি টার্মিনাল থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহের জন্য ৯১ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণের কাজ আগামী জুলাই মাসে শেষ হবে।

সব ঠিক থাকলে ২০১৮ সালের শুরুর দিকেই জাহাজে করে আমদানি করা গ্যাস এই টার্মিনাল হয়ে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে সরকার। দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে বছরে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ১৫৬ কোটি ডলার।এর মধ্যে কর, ভ্যাট, বীমা ও অগ্রিম আয়কর ব্যতীত পেট্রোবাংলাকে বছরে পরিশোধ করতে হবে ৯ কোটি ডলার।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, এলএনজি টার্মিনাল থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহের জন্য ৯১ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। গত ২৬ জানুয়ারি মহেশখালী থেকে চট্টগ্রামের আনোয়ারা পর্যন্ত গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) এটি বাস্তবায়ন করছে। আগামী মাসের (জুলাইয়ে) মধ্যেই এ কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইনটি নির্মাণ করছে পাঁচটি কোম্পানি। এগুলো হলো- দীপন গ্রুপ, টেকনিক গ্রুপ, পিইএল, ম্যাকসুয়েল ও গ্যাসমিন।

এই ব্যাপারে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ইশতিয়াক আহমেদ জানান, ২০১৮ এর প্রথম প্রান্তিকেই টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ করা যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে দেশের প্রথম ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে পেট্রোবাংলা এবং সিঙ্গাপুরভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জি লিমিটেডের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়েছে। মূলত জাহাজে করে আমদানি করা গ্যাস এই টার্মিনালে পরিশোধন করে সরবরাহ করা হবে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক অ্যাস্ট্রা ওয়েল অ্যান্ড এক্সিলারেট এনার্জি কনসোর্টিয়াম বাংলাদেশে এ প্রকল্পে কাজ করবে ‘এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ’ হিসেবে। এর আগে ২০১৪ সালের ২৬ জুন তাদের সঙ্গে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ চুক্তিতে অনুস্বাক্ষর করে পেট্রোবাংলা।

প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ঘন মিটার এলএনজি ধারণের এই টার্মিনাল থেকে দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যাবে। টার্মিনাল নির্মাণ ও অন্যান্য খরচ হিসেবে এক্সিলারেট এনার্জিকে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের জন্য ৪৯ সেন্ট করে দিতে হবে পেট্রোবাংলাকে। তবে অন্যান্য খরচ যোগ হয়ে এটি ৫৯ সেন্টের মতো দাঁড়াবে। টার্মিনালটি নির্মাণে বিদেশি এ কোম্পানি প্রায় ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। বুধবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু।

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বৈঠকে মহেশখালীতে দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতা সম্পন্ন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (ফ্লটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিট) স্থাপনের জন্য পেট্রোবাংলা ও এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেড-এর মধ্যে সম্পাদিত খসড়া ‘টার্মিনাল ইউজ এগ্রিমেন্ট’, ‘ইমপ্লিমেন্টেশন এগ্রিমেন্ট’ ও ‘সাইড লেটার এগ্রিমেন্ট’ চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ‘টার্মিনাল ইউজ এগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষরের পর ‘পারফরমেন্স বন্ড’ হিসেবে টার্মিনাল কোম্পানি ২ কোটি ডলার জমা দেবে।

অন্যদিকে টার্মিনাল কোম্পানির সার্ভিস গ্রহণের জন্য পেট্রোবাংলাকে ফিক্সড কম্পোনেন্ট ফিস হিসেবে দৈনিক ১ লাখ ৫৯ হাজার হাজার ১৮৬ ডলার, অপারেটিং কম্পোনেন্ট ফিস হিসেবে দৈনিক ৪৫ হাজার ৮১৪ ডলার এবং পোর্ট সার্ভিস কম্পোনেন্ট ফিস হিসেবে দৈনিক ৩২ হাজার ডলার (অর্থাৎ দৈনিক মোট ২ লাখ ৩৭ হাজার ডলার) পরিশোধ করতে হবে।

গ্যাসের মূল্য পুনঃনির্ধারণের মাধ্যমে পেট্রোবাংলা এ অর্থের সংস্থান করবে। এছাড়া শিডিউলড কমিশনিং তারিখের ৩০ দিন আগে পেট্রোবাংলাকে সোনালী ব্যাংক বা বাংলদেশের যে কোন ব্যাংক থেকে ১৫ বছর ৬ মাস মেয়াদে দেড় কোটি ডলারের এলসি খুলতে হবে। টার্মিনাল কোম্পানি ১৫ বছর মেয়াদ শেষে কোন বিনিময় মূল্য ছাড়াই টার্মিনালটি পেট্রোবাংলার কাছে হস্তান্তর করবে। টার্মিনালটি নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু রাখার স্বার্থে পেট্রোবাংলা চাইলে পোর্ট সার্ভিস এগ্রিমেন্টটি বিদ্যমান শর্তে অন্তত ৫ বছরের জন্য চালু রাখতে পারবে।

উল্লেখ্য ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় কক্সবাজারের মহেশখালীতে লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল তৈরির উদ্যোগ নেয়। কিন্তু নানা জটিলতায় ওই মেয়াদের পাঁচ বছরেও তার বাস্তবায়ন শুরু করা যায়নি। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর মধ্যে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণও অন্তর্ভুক্ত