টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ী বাঙ্গালী রমনীর প্রথম পছন্দ

tat-kapor

অন্তু দাস হৃদয়, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি: কথায় আছে নদী-চর, খাল-বিল, গজারীর বন’ টাঙ্গাইল শাড়ী তার গর্বের ধন! “টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ী, বাঙ্গালী রমনীর প্রথম পছন্দ” আর মাত্র ১৪ দিন পর ঈদ। জমে উঠেছে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শাড়ির বাজার। সময়ের সাথে সাথে টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়িতে এসেছে বৈচিত্র আর নতুনত্ব। বেড়েছে টাঙ্গাইল তাঁত শাড়ির কদর ও ব্যবহার।

এবার ঈদেও বাহারি নতুন ডিজাইন আর নতুনত্ব নিয়ে বাজারে এসেছে টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ি। ঈদকে সামনে রেখে টাঙ্গাইলের সাথে সাথে বিশ্বের সব মহিলাদের মন জয় করতে এসব শাড়ি ছড়িয়ে পড়ছে দেশ বিদেশের বাজারে। টাঙ্গাইলের তাঁত পল্লী হিসেবে খ্যাত দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইলের পুরো গ্রাম মুখরিত হয়ে উঠেছে তাঁতের খট খট শব্দে। ভোর থেকে রাত অবধি কর্মব্যস্ত দিন কাটাচ্ছে তাঁত শ্রমিকরা। তারা নিঁপুণ ভাবে তৈরী করছে ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ী। আর তাদের তৈরী শাড়ী দেশের সীমানা পেড়িয়ে চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। মন জয় করে নিচ্ছে দেশ বিদেশের হাজার হাজার রমণীর। এল সির মাধ্যেমে ভারতের মার্কেটেও যাচ্ছে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি।

টাঙ্গাইল জেলার প্রায় ৭০-৮০ হাজার তাঁতে ৫ লাখের অধিক তাঁত শ্রমিক দিন রাত পরিশ্রম করছে ঈদ মার্কেটের শাড়ীর চাহিদা মেটাতে। এ জন্য তাদের অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হচ্ছে। অতিরিক্ত পরিশ্রম করলেও তারা অতিরিক্ত পারিশ্রমিক পাচ্ছে না। এর ফলে হস্ত চালিত তাঁতের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। টাঙ্গাইল শাড়ীর ঢাকা, রাজধানী হিসেবে খ্যাত পাথরাইল, চন্ডি, বেলতা ও পুটিয়াজানি, বাজিতপুর এবং কালিহাতি উপজেলার বল্ল­া-রামপুর, সিঙ্গাইর, বেহালাবাড়ী, মোমিননগর, দড়িখষিলা, কাজী বাড়ীর তাঁত প্রধান এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে তাঁত শ্রমিকরা প্রচন্ড ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে।

তাঁত শ্রমিকরা কেউ চরকায় সূতা কাটছে, কেউ সূতা টানা দিচ্ছে, কেউ কেউ শানায় সুতা ভরছে, কেউ বও ভরছে, কেউ মাকু টেনে শাড়ী বুনাচ্ছে। সব মিলিয়ে তাঁত পল্লীগুলোতে রাত-দিন কাজ চলছে। বাড়ীর আবাল-বৃদ্ধবনিতা দিন রাত কাজ করার পরেও চাহিদা অনুযায়ী শাড়ী সরবরাহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁতীদের। বাড়ীর সবচেয়ে ছোট সদস্যটিও নলিতে সুতা ভরে কাজে সহযোগিতা করে।

tat-shilpo

আগে টাঙ্গাইলের তাঁতে শুধু সাধারণ মানের শাড়ী তৈরি হতো। কিন্তু সময়ের আবর্তে শুধু সাধারণ মানের নয় বাহারী ডিজাইনের শাড়ী তৈরি হচ্ছে টাঙ্গাইলে। ঈদের মার্কেটে এবার সফ্ট সিল্ক, জামদানী, সূতি, ধান সিঁড়ি, আনারকলি, গ্যাস সিল্ক, একতারি, দোতারি ও রেশম শাড়ীর চাহিদা বেশি। থরে থরে সাজানো এই শাড়ী দুই শত পঞ্চাশ টাকা থেকে ৮০ হাজার টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। এখন টাঙ্গাইল শাড়ী নিম্নবিত্তের সীমানা ডিঙ্গিয়ে উচ্চবিত্ত এবং ফ্যাশন সচেতন নারীদের মন জয় করেছে। দেশের পাশাপাশি ভারত সহ অন্যান্য দেশেও দ্রুত টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ী জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইল শাড়ীর ডিজাইনে বৈচিত্র থাকার কারণে ভারতে এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানান, ভারত থেকে আসা ব্যবসায়ী স্বর্ণালী বসাক সময়ের কন্ঠস্বর’কে বলেন, বলিউডের বিখ্যাত “দেবদাস” ছবির অন্যতম চরিত্র পার্বতীর চরিত্রে অভিনিত নায়িকা ঐশ্বরিয়ার প্রায় সব কয়টি শাড়িই টাঙ্গাইল তাঁত শাড়ি।

ঢাকা থেকে শাড়ী কিনতে আসা এক গৃহিনী জানান, তাঁত শাড়ী আমার সব সময়ই পছন্দের। আমি অন্যান্য শাড়ীর চাইতে টাঙ্গাইল তাঁত শাড়ী পরিধান করে বেশী আরাম পাই। ঈদ মার্কেটের ভীড় এড়িয়ে নিরিবিলিতে স্বাচ্ছন্দে নিজের জন্য এবং প্রিয় জনকে উপহার দেয়ার জন্য পছন্দের শাড়ি কিনতে এখানে এসেছি। তিনি আরো জানান, বড়-বড় বিপনী বিতান, মার্কেট ও শোরুমের চেয়ে অনেক কম দামে বাহারী ডিজাইনের শাড়ি এখানে পাওয়া যায়। তাই প্রতি বছর ঈদের শাড়ী কিনতে এখানে চলে আসি। তবে অন্যান্য বছরের থেকে এবার শাড়ীর দাম কিছুটা বেশি মনে হচ্ছে।

টাঙ্গাইলের কুমুদিনী সরকারি মহিলা কলেজ ও মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষিকা তাঁত শাড়ী কিনতে এসে বলেন, টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ির কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। তাঁতের শাড়ীর এই উন্নত বাহারী ডিজাইন ও নতুনত্ব আনার ক্ষেত্রে তথা তাঁত শাড়ির এই উন্নতির মূলে টাঙ্গাইলের তাঁতী সম্প্রদায়ের অবদান অনস্বীকার্য। তারা আরও বলেন, যদি সরকার এই শিল্পে তাঁতীদের স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান, রং ও সুতা সহ সকল তাঁত উপকরনের উপর ভর্তূকী প্রদান করে তবে এই শিল্পের মাধ্যমে অনেক বেশী বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

তাঁত পল্লী পাথরাইলের শাড়ী ব্যবসায়ী ও শাড়ী ডিজাইনার নিমাই বসাক জানান, প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদকে সামনে রেখে আমরা বাহারী ডিজাইনের শাড়ী এনেছি। ক্রেতার চাহিদা আর যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ডিজাইনে অনেক নতুনত্বও এসেছে। সারা বাংলাদেশে টাঙ্গাইলের তাঁত শাড়ীর যে সুনাম রয়েছে আমরা সেই সুনাম ধরে রাখতে বদ্ধ পরিকর। টাঙ্গাইল তাঁত মালিক সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাক সময়ের কন্ঠস্বর’কে বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে আমাদের নিয়মিত ক্রেতারা আসছে। এবার শাড়ীর মূল্য প্রতি বছরের তুলনায় স্বাভাবিক। আমরা সাধারণ মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের আয়ের কথা চিন্তা করে যতটা সম্ভব মূল্য কম রাখার চেষ্টা করছি।

তিনি আরো বলেন, আমরা শ্রম ঘাম ঝরিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা এনে দিচ্ছি। গত বছর দুই লাখ পিচ শাড়ী ভারতে বিক্রি হলেও এবার আশা করি ৬ লাখ পিচেরও বেশী শাড়ি বিদেশে রপ্তানী হবে। সব কিছু ঠিক ঠাক থাকলে ঈদের বাজারে অতীতের মতই টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ি তার নিজস্ব স্বকীয়তায় ক্রেতাদের মন জয় করবে এমনটাই আশা করছি।