কালীগঞ্জে বেপরোয়া হয়ে উঠছে হলুদ সাংবাদিকতা: যার দাপটে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃত সাংবাদিকরা

রেজাউল সরকার(আঁধার), গাজীপুর প্রতিনিধি : পত্রিকার কোন খবর নেই,শিক্ষা-দীক্ষার দরকার নেই। আন্ডারগ্রাউন্ড কোন পত্রিকার আইডি কার্ড নিয়ে তারা এখন পুরোদমে মফস্বল সাংবাদিক। তাও আবার প্রফেশনালী সাংবাদিক। এমনই পরিচয় দিয়ে ঘুড়ে বেড়ান গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার অজ্ঞাতনামা কিছু হলুদ সাংবাদিকরা। আর তাদের ভয়ে স্বয়ং প্রশাসনও জবুথবু অবস্থা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার তিনটি সংবাদিক সংগঠন আছে। এদের মধ্যে ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কালীগঞ্জ উপজেলা প্রেসকাব। নামে মাত্র প্রেসকাব থাকায় ও সাংবাদিক সদস্যগণ অন্য পেশায় যোগদানের কারণে এক বছরের মধ্যে তা বিলুপ্ত হয়ে যায়। দীর্ঘদিন কালীগঞ্জে কোন প্রেসকাব না থাকায় স্থানীয় সাংবাদিকগণ ১৯৯৫ সালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হযরত আলীর কার্যালয়ে বসে কালীগঞ্জ প্রেসকাব প্রতিষ্ঠা করেন। তখন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সাবেক কালীগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মরহুম মো. আব্দুল হেকিম আকন্দের সহযোগীতায় কালীগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের একটি টিন সেড কক্ষে প্রেসকাবের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরে ২০০৪ সালে কালীগঞ্জ উপজেলা প্রেসকাব পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেন।
আর দুইটি প্রেসকাব থেকে নানা অপর্কমের দায়ে বহিষ্কৃত ও সংগঠন থেকে বের হয়ে যাওয়া কিছু সাংবাদিক মিলে চলতি বছরের মে মাসে প্রতিষ্ঠিত করেন কালীগঞ্জ রিপোটার্স ইউনিটি।
fake-journalists-pনাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বনাম ধন্য এক পত্রিকার কালীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, উপজেলায় হলুদ সাংবাদিকতা ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বেড়েছে তাদের নানা অপকর্মের দৌরাত্বও। উপজেলা প্রশাসন, থানা প্রশাসন, স্থানীয় মিল-কারখানায় নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তাদের নামের তালিকা দিয়ে বেরাচ্ছেন। অথচ দুই-একজনের পত্রিকা থাকলেও অন্যদের পত্রিকার কোন খবর নেই। এ কারণে ওইসব হলুদ সাংবাদিকদের কারণে উপজেলার বহু সাংবাদিকরা সাধারণের কাছে হাঁসি-ঠাট্টার খোরাক হয়ে যাচ্ছে। আর এ কারণে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিতে লজ্জা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি অনলাই নিউজ পোর্টালের সহকারী সম্পাদক বলেন, বর্তমানে কালীগঞ্জ উপজেলায় মাদক ব্যবসায়ীর এজেন্টরা আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার কার্ড নিয়ে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে দেদারসে ইয়াবা ও মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। হলুদ সাংবাদিকদের কেউ কেউ আবার সঙ্গবদ্ধ হয়ে বিভিন্ন স্পটে মাদক সেবন করেও বেড়াচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কালীগঞ্জ থানার নতুন এক উপ-পরিদর্শক (এস.আই) জানান, অতি সম্প্রতি কালীগঞ্জ পৌরসভার বালীগাঁও গ্রামের দিগন্তের মাঠ এলাকা থেকে মাদক সেবন অবস্থায় গাঁজাসহ এক সাংবাদিককে আটক করে পুলিশ। পরে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয়ে মুচলেকা দিয়ে রেহাই পান।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, ওইসব হলুদ সাংবাদিকদের মাঝে স্বনামধন্য পত্রিকার সাংবাদিকরা নিজের সাংবাদিক পরিচয় দেননা। এমনকি ওই হলুদ সাংবাদিকদের দৌড়াত্বের কারণে আসল সাংবাদিকরা উপজেলার বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান থেকে নিজেদের মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ওই হলুদ সাংবাদিকদের সাথে মিলে বর্তমানে কিছু বহিরাগত ও ভূয়া সাংবাদিক উপজেলায় মাথাচারা দিয়ে উঠেছে। চলতি মাসের ৮ তারিখে নরসিংদী এলাকার এমনই তিন ভূয়া সাংবাদিক আটক করেছে কালীগঞ্জ থানা পুলিশ। অন্যদিকে একই মাসের ১২ তারিখে উপজেলার মোক্তারপুর ইউনিয়নের মৈশাইর বাজার এলাকায় এক ডাক্তার দুই সহযোগীসহ স্বল্পমূল্যে স্থানীয়দের চিকিৎসা সেবা দিতে শুরু করেন। কিন্তু পত্রিকাবীহিন স্থানীয় এক লোক নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ওই চিকিৎসকের কাছে মোটা অংকের টাকা চাঁদা দাবি করেন। তিনি তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে একটি কুচক্রি মহলের মাধ্যমে ওই ভূয়া ডাক্তারকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। এ বিষয়ে কালীগঞ্জ থানায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুধি সমাজের একজন প্রতিবেদককে জানান, আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে একটি সাংবাদিক সংগঠন উপজেলার বিভিন্ন মিল-কারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সরকারী বেসরকারী অফিসগুলোতে নামের তালিকা দিয়ে বেড়াচ্ছে ঈদ বকসিসের জন্য। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে আরো বলেন, ওইসব হলুদ সাংবাদিকদের জন্য আজ উপজেলার প্রকৃত সাংবাদিকরা নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় থেকে বিব্রত বোধ করছেন। তবে ওইসব হলুদ সাংবাদিকদের ব্যাপারে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলেও তিনি আশা ব্যক্ত করেন।