ইইউ ছেড়ে বৃটেনের বেরিয়ে যাওয়ার পেছনে কে এই মুল নায়ক ?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক –    প্রায় ২৫ বছর ধরে ইইউ ছেড়ে বৃটেনের বেরিয়ে যাওয়ার প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন তিনি। তার এক জীবনের সাধনা অবশেষে পূর্ণতা পেল। বৃটেন গণভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার ইচ্ছে তাদের নেই। এই প্রচারণা চালিয়েছিলেন ইউনাইটেড কিংডম ইন্ডিপেন্ডেন্স পার্টির (ইউকিপ) নেতা নাইজেল ফ্যারাজ। গণভোটের ফল পরিষ্কার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃটেনের ‘নতুন ঊষা’ উদযাপন করেছেন তিনি। কারণ, তার অসম্ভব স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। ভোটের পর দৃশ্যত উচ্ছ্বসিতই ছিলেন এ নেতা।

কিন্তু ব্রেক্সিটের পক্ষে প্রচারণা চালানোর আগেই তিনি জানতেন একটু এদিক-ওদিক হলেই তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ইতি ঘটতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব হারানোর পাশাপাশি ওয়েস্টমিনিস্টার আসনও ত্যাগ করতে হতো তার। কিন্তু বাজিতে বড়দানে জিতে গেছেন তিনি। ব্রেক্সিট উল্টো তার জন্য বয়ে এনেছে সৌভাগ্য। ব্রেক্সিটের পক্ষে-বিপক্ষে দীর্ঘ প্রচারণা চলাকালে লন্ডনের সাবেক মেয়র বরিস জনসনের পর যে ব্যক্তিটি ছিলেন সবচেয়ে বেশি পাদপ্রদীপের আলোয়, তিনি নাইজেল ফ্যারেজ।

তার প্রভাব কতখানি বেড়েছে তা সহজে অনুমেয়। ভোটাভুটির পর তিনি বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে বলেছিলেন। কেননা, ক্যামেরন বৃটেনকে ইইউর অভ্যন্তরে রাখার পক্ষপাতি ছিলেন। হয়তো শুধু তার দাবির কারণে নয়, তবুও ক্যামেরন খুব দ্রুতই পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।

ফ্যারাজের মতে, ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর বৃটেনের জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ হবে একজন ‘প্রো-ব্রেক্সিট’ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করা। পরবর্তী নির্বাচনে অবশেষে হাউজ অব কমন্সে জিততে পারেন তিনি।

গতকাল সকালে ফলাফল নিশ্চিত হওয়ার পর, উল্লসিত ফ্যারাজ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আজ এক স্বাধীন বৃটেনের আকাশে নতুন সূর্যোদয় হয়েছে। দেখুন। এমনকি আবহাওয়াটাও আজ ভালো।’

বিবিসি রেডিও ফোরের টুডে প্রোগ্রামে তিনি বলেন, পরবর্তী পদক্ষেপ হবে একজন সঠিক নেতা বেছে নেয়া। তার ইঙ্গিত, ২৩শে জুনকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা হোক! তার মতে, এটিই স্বাধীনতা দিবস!

তবে গতকাল রাতে তার মনের ভেতর যে তুমুল ঝড় চলছিল, তা অনুমেয়ই ছিল। বুথফেরত ভোটারদের তথ্যমতে পূর্বাভাস আসছিল, ‘রিমেইন’ বা ইইউতে রয়ে যাওয়ারা এগিয়ে আছে। ফ্যারাজের মুখ তখন বিষণ্নতায় অন্ধকার। তবে রাত সাড়ে ১২টার দিকেই মুখে আবার হাসি আসতে শুরু করে তার। কেননা, তখন স্যান্ডারল্যান্ডে ‘লিভ’ ক্যাম্পেইন বিপুল বিজয় পেয়েছে। স্যন্ডারল্যান্ডের ভোট কোনদিকে যায়, তার ওপরই মূল ফলাফল অনেকখানি নির্ভর করবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন অনেক বিশেষজ্ঞ। সাড়ে চারটার দিকে তিনি বিজয় ঘোষণা করেন। তীব্র উল্লাসে লাফিয়ে ওঠেন নাইজেল।

তবে শুধু ইইউ ছেড়ে বৃটেনের প্রস্থানেই সন্তুষ্ট নন তিনি। তার আশা, এর মাধ্যমে বেজে উঠবে ইইউর ভাঙনের সুর। তিনি বলেন, ‘নেদারল্যান্ডের একটি মতামত জরিপে বলা হয়েছে, সেখানকার বেশিরভাগ মানুষও এখন ইইউ ছাড়তে চায়। তাই সেখানেও হতে পারে ব্রেক্সিটের আদলে ‘নেক্সিট’। ডেনমার্কেও বেশিরভাগ মানুষ ইইউ ছাড়ার পক্ষে, সেখানে হবে ডেক্সিট। আমাকে বলা হয়েছে সুইডেন, অস্ট্রিয়া, এমনকি ইতালিতেও এমনটা হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘ইইউ ব্যর্থ। ইইউ মারা যাচ্ছে। আমার আশা, আমরা ওয়াল থেকে প্রথম ইট খসাতে পেরেছি।’

১৯৯২ সালে কনজারভেটিভ দল ছাড়েন তিনি। এরপর অন্যদের নিয়ে গঠন করেন ইউকিপ দল। তখন থেকেই তিনি ইউরো ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বিপক্ষে প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। ১৯৯৯ সালে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। সেখানে ইউরো ও ব্রাসেলসে ইইউর কাজ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন বেশ কয়েকবার। কিন্তু পরিবর্তনের জন্য তিনি কাজ করে যান। ২০০৬ সালে হয়ে যান ইউকিপ দলের নেতা। কিন্তু বহুবার নির্বাচন করেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারেননি একবারও। ২০১০ সালের নির্বাচনেও হেরে যান তিনি। তবে পরেরবার কনজারভেটিভ দলের নেতা ও প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন নির্বাচনী ইশতিহারে ইইউ নিয়ে গণভোটের ঘোষণা দেন। কেননা, ইইউ নিয়ে বৃটেনে সংশয় দানা বেঁধেছে ততদিনে। ফ্যারাজের দাবি, এ কৃতিত্ব তার ও তার দল ইউকিপের। অবশেষে বৃটেনের বিচ্ছেদ প্রায় চূড়ান্ত। এত বছর ধরে যে দাবির জন্য ফ্যারাজ লড়াই করেছিলেন, তা সত্যি হয়েছে। এতটুকু কৃতিত্ব তো নিতেই পারেন তিনি। সামনের দিনগুলোতে ভালো কিছু যে অপেক্ষা করছে তার জন্য, তা হলফ করে বলে দেয়া যায়।

উৎসঃ   মানব জমিন