দেড় মাসেও উদঘাটন হয়নি নিখিল হত্যার রহস্য: পরিবার বাড়ি ছাড়া

nikhil

অন্তু দাস হৃদয়, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি: টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দর্জি নিখিলচন্দ্র জোয়ার্দার হত্যার রহস্য দেড় মাসেও উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। মামলার উল্লেখযোগ্য কোন অগ্রগতিও নেই। নতুন কোন আসামিও গ্রেফতার করতে পারেনি।

এ ঘটনার পর থেকেই দর্জি নিখিলের স্ত্রী আরতি রাণী জোয়ার্দার সহ তিন ভাই ভোলানাথ জোয়ার্দার, অখিল জোয়ার্দার ও গোপাল জোয়ার্দারের পরিবার অতঙ্কে বাড়ি থেকে পালিয়ে রয়েছেন। আজ (২৫ জুন) শনিবার দর্জি নিখিলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় সুনশান নীরবতা। বাড়িতে মোট ৪টি থাকার ঘরে ঝুলছে তালা। ওই বাড়ি সহ আশপাশ দিয়ে লোকজনের চলাচল নেই বললেই চলে। ডুবাইল বাজার এলাকায় জঙ্গি আতঙ্কে অনেক ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ করে দিয়েছে।

উল্লেখ, গত ৩০ এপ্রিল আজ শনিবার দুপুরে টাঙ্গাইলের গোপালপুর শহরের ডুবাইল বাজারে নিজের দোকানে কাজ করছিলেন দর্জি নিখিলচন্দ্র জোয়ার্দার। তখন মোটর সাইকেলে এসে তিন দুর্বৃত্ত তাকে ডেকে দোকানের সামনে প্রকাশ্যে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে দ্রুত পালিয়ে যায়। তিন জনের মধ্যে একজনের মাথায় হেলমেট ছিল। বাকিরা খালি মাথায় থাকলেও তাদের কাউকে আশপাশের কেউ চিনতে পারেনি। হত্যাকান্ডের পর জঙ্গি সংগঠন আই এস এই হত্যার দায় স্বীকার করে।

ঘটনার পরের দিন দর্জি নিখিলের স্ত্রী আরতি রাণী জোয়ার্দার বাদী হয়ে অজ্ঞাত তিনজনকে আসামি করে গোপালপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। বিস্ফোরক দ্রব্য বহন ও প্রয়োগ সংক্রান্ত আরেকটি মামলা দায়ের করে গোপালপুর থানার এস আই মোকছেদুল আলম। দুটি মামলাই তদন্ত করছে টাঙ্গাইল গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

এ হত্যাকান্ডের পর সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয় আলমনগর মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম, গোপালপুর উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি রফিকুল ইসলাম বাদশা ও বীরনহরা গ্রামের বিএনপি কর্মী ঝন্টু মিয়াকে। তাঁদের দুটি মামলায় তিনদিন করে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী খলিল মিয়া বলেন, নিখিলে হত্যাকারী ধরা পরলে আমাদের মনে স্বস্তি ফিরে আসবে। স্থানীয় বাসিন্দা মহিদুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনার পর থেকেই বাজারে লোকজন সমাগম কমে গেছে। আইএস দায় স্বীকার করায় এ আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে।

পুলিশ জানায়, হত্যাকান্ডের স্থান থেকে কিছু দূর থেকে একটি রক্তাক্ত শার্ট উদ্ধার করে পুলিশ। এ ছাড়া ডুবাইল বাজার থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিম দিকে গোপালপুর উপজেলার সুতী কালিবাড়ী অটো রাইচমিলের পাশের একটি ঝোঁপ থেকে উদ্ধার করা হয় রক্তমাখা একটি চাপাতি। পুলিশের ধারণা, নিখিল হত্যাকান্ডের সময় তার রক্ত খুনির শার্টে লেগেছিল এবং যে চাপাতি দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে সেই চাপাতি ‘খুনিরা’ ফেলে গেছে। রক্তমাখা চাপাতি ও রক্তাক্ত শার্ট ডিএনএ পরীক্ষার জন্য গত ৯ মে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

এ দিকে নিখিল হত্যা মামলার অগ্রগতি না হওয়ায় বিচার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে তার পরিবার। একই সঙ্গে পরিবারের লোকজন পড়েছে চরম নিরাপত্তাহীনতায়। নিখিল জোয়ার্দারের মেয়ে লিপি রাণী চন্দ জানান, তার বাবা হত্যার পর তাদের বাড়িতে কিছুদিন পুলিশ পাহারা ছিল। এখন তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

দর্জি নিখিলের স্ত্রী আরতি রাণী জোয়ার্দার এখন প্রাণ ভয়ে ঘাটাইল উপজেলার টিএন্ডটি রোডে তার বোনের বাসায় রয়েছেন। তিনি বলেন, কি হতে কি হয়ে গেল কিছুই বুঝতে পারলাম না। একটা অজানা আতঙ্ক আমাকে সব সময় তাড়া করে ফিরে। কখন যেন জঙ্গিরা আমাদের ওপর হামলা চালায়। বাড়ির যেতে মন কাঁদে তবুও যেতে পারছি না।

এ ব্যাপারে টাঙ্গাইল গোয়েন্দা (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মাহফিজুর রহমান সময়ের কন্ঠস্বর’কে জানান, নিখিল হত্যা রহস্য এখনো উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। তদন্ত কাজ চলছে। নিখিল চন্দ্র হত্যাকান্ডের পর উদ্ধার করা রক্তাক্ত শার্ট ও চাপাতি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। সে রিপোর্ট এখনো হাতে আসেনি। রিপোর্ট পেলে পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হবে। হত্যার নেপথ্যে কি কি কারণ থাকতে পারে তার সবই খতিয়ে দেখে জোর তদন্ত চলছে। হত্যাকান্ডের সঙ্গে জেএমবির সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট টাঙ্গাইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অলোক কুমার দাস ও সহ-প্রচার সম্পাদক অন্তু দাস হৃদয় বলেন, সরকার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই এমন ঘটনা সারাদেশে পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। একটি ঘটনারও সঠিক বিচার হলে এমন ঘটনা বন্ধ হবে।