ক্লাউড সিডিং; কৃত্রিমভাবে বৃষ্টিপাত ঘটানোর এক অদ্ভুত উপায়!

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফিচার, সময়ের কণ্ঠস্বর-

সম্পাদনা, রাফিদুল হাসান

বায়ুমন্ডলের ট্রপোস্ফিয়ার এলাকাকে মেঘের দেশ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তুলার মত সাদা হালকা মেঘগুলো এই অঞ্চলেই উড়ে বেড়ায়। এই মেঘগুলো যতই ঠান্ডা হোক না কেনো, বৃষ্টিপাতের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ভারী না হওয়া পর্যন্ত বা ঘনীভূত না হওয়া পর্যন্ত তা বৃষ্টি হিসেবে ঝড়ে পরে না। বৃষ্টিপাতের ব্যাপারটি সম্পুর্ণই প্রাকৃতিক। প্রকৃতির খেয়াল খুশি মতই বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণেই অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টির মত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বর্তমান এই দুনিয়ায় প্রাকৃতিক এই ব্যাপারটিও কৃত্রিম ভাবে ঘটানো সম্ভব। একেই কৃত্রিম বৃষ্টিপাত বলা হয়ে থাকে। কৃত্রিম বৃষ্টিপাতের দ্বারা যেমন খরা কিংবা অনাবৃষ্টি থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব তেমনি অতিবৃষ্টির হাত থেকেও পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। রসিকতার সুরে বলা যায় যে, আকাশে ভেসে থাকা বৃষ্টির অনুপোযোগী মেঘগুলোকে জোরপূর্বক বৃষ্টি হিসেবে মাটিতে নামিয়ে আনাই হলো কৃত্রিম বৃষ্টিপাত।

মেঘগুলোকে বৃষ্টিতে পরিণত হওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রক্রিয়া সেটি হলো ঘনীভবন। আকাশে ভেসে থাকা মেঘগুলো যতক্ষন পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ার মাঝ দিয়ে না যাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তা বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে পরবে না। এমনকি তা যদি ঠান্ডা হতে হতে সম্পৃক্ত হয়ে যায় তবুও। আর এই ঘনীভবন সংঘটিত হতে সাহায্য করে পৃথিবীর বায়ুমন্ডল। বায়ুমন্ডলে থাকা ধুলিকণা, লবণ এবং অন্যান্য ‘ডাস্ট’ জাতীয় উপাদান গুলো। এগুলোর সংস্পর্শে এসে মেঘের জলীয় বাষ্পের কণা গুলো যখন ভারী হয়ে ওঠে তখনই তা বৃষ্টি হিসেবে ঝরে পরে।ঘনীভবনের ব্যাপারটি সম্পূর্ণই প্রাকৃতিক বলে তা যেমন স্বল্প সময়েও ঘটতে পারে তেমনি আবার অনেকদিন পর পরও ঘটতে পারে। ঘনীভবনের এই প্রক্রিয়া কৃত্রিম ভাবে ঘটিয়েই কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানো হয়। কৃত্রিমভাবে বৃষ্টিপাত ঘটানোর এই প্রক্রিয়াটিকেই ক্লাউড সীডিং বলে।

এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, কৃত্রিম ভাবে কিভাবে ঘনীভবন ঘটানো সম্ভব। ভূমি থেকে কামানের মাধ্যমে কিংবা বিমান দিয়ে ট্রপোস্ফিয়ারে মেঘের স্তরের উপরে উঠে কৃত্রিম ঘনীভবন সৃষ্টির জন্য ড্রাই আইস বা সলভার আয়োডাইড ছড়িয়ে দেয়া হয়। তবে ড্রাই আইস ও সিলভার আয়োডাইডের কার্যপ্রক্রিয়া কিছুটা ভিন্ন। মাইনাস ৭৮ ডিগ্রী তাপমাত্রায় থাকা ড্রাই আইস আশেপাশের পানির অনুগুলোকে কেলাসে পরিণত করে। আর অন্যদিকে দারুণ পানিপ্রেমী বা হাইগ্রোস্কোপিক পদার্থ হিসেবে খ্যাত সিলভার আয়োডাইড নিজেই কেলাসে পরিণত হয়। তবে এ প্রক্রিয়াদুটি অসম্ভব ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে বিজ্ঞানীরা বর্তমানে গবেষণা করছেন স্বল্প ব্যায়ে লেজার প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি ঘটানোর জন্য।

somoyerkonthosor science
কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ও মেঘের বীজবপন !

সর্বপ্রথম ১৯৪৬ সালের ১৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানো হয়। কৃত্রিম বৃষ্টির এই নীতি ভিনসেন্ট শেইফারই প্রথমে আবিষ্কার করেন। কৃত্রিম বৃষতিপাতের ব্যাবহারিক প্রয়োগ বিভিন্ন বড় বড় ইভেন্টের ক্ষেত্রে দেখা যায়। নির্বিঘ্নে ইভেন্ট পরিচালনার জন্য ইভেন্টের আগেই আকাশে ভেসে থাকা মেঘগুলোকে বৃষ্টিতে পরিণত করা হয়। ক্লাউড সীডিং পদ্ধতিটির সফল ব্যাবহার সংঘটিত হয় বেইজিং অলিম্পিক এ। ১৯৬৭ সালে ভিয়েতনাম-আমেরিকা যুদ্ধে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত করা হয়েছিলো যুদ্ধে সুবিধা পেতে ও ভিয়েতনাম বাহিনীর দুর্ভোগ সৃষ্টি করতে। চাষাবাদ এর জন্যও কৃত্রিম বৃষ্টিপাত অনেক সুফল বয়ে নিয়ে আসে। সম্প্রতি দুবাই

ঘোষণ দিয়ে কৃত্রিম ‘বৃষ্টির পাহাড়’ তৈরি করার। এতে করে দুবাইতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে বলে গবেষকেরা আশাবাদী।

সব কিছুরই উপকারী দিকের পাশাপাশি অপকারী দিকও থাকে। এক অঞ্চলে জোরপূর্বক কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানো হলে অন্য অঞ্চলে বৃষ্টির সংকট দেখা দিতে পারে। সৃষ্টি হতে পারে খরার মত পরিস্থিতি। এখন দেখার বিষয় এটাই যে ব্যায়বহুল এই প্রযুক্তি না আবার বিশ্বমোড়লদের কুক্ষিগতই রয়ে যায়ে। যাতে শোষিত হবে অন্যান্য সাধারণ দেশ।

তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া ও বিজ্ঞান ব্লগ।