স্বামীকে খুনের পর শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ রান্না করা এক ভয়ংকর নারীর গল্প !

ইসতিয়াক আহমেদ, লাইফস্টাইল কন্ট্রিবিউটার, সময়ের কণ্ঠস্বর।

অবাক পৃথিবী ফিচার-

ক্যাথরিন মেরি নাইট। জন্ম ২৪ অক্টোবর ১৯৫৫, অস্ট্রেলিয়ার টেন্টারফিল্ড, নিউ সাউথ ওয়েলস। তিনিই প্রথম অস্ট্রেলীয় নারী যাকে প্যারেল ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।

ক্যাথরিন নাইটের মায়ের নাম বারবারা রিগ্যান আর বাবার নাম ছিল কেন নাইট। বারবারার প্রথম স্বামী জ্যাক রিগ্যানের সহকর্মী ছিলেন এই কেন নাইট। কেন নাইটের সাথে পরিচয় হওয়ার পর জ্যাক এবং তার চার সন্তানকে ছেড়ে আসেন বারবারা রিগ্যান।

ক্যাথরিনের ছোটবেলা মোটেই সুখকর ছিল না। তার বাবা কেন নাইট ছিলেন পাড় মাতাল। তিনি দিনে দশবার করে ধর্ষণ করতেন বারবারাকে। ক্যাথরিন খুবই অন্তর্মুখী আর চাপা স্বভাবের ছিলেন। জানা যায় ছোটবেলায় পরিবারের কোন সদস্যের কাছেই যৌন নিগ্রহের স্বীকার হন ক্যাথরিন। সব মিলিয়ে চরম অসুস্থ এক পরিবেশ। ক্যাথরিনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ছিলেন তার চাচা অস্কার নাইট(পেশায় ঘোড়দৌড়বিদ)। ১৯৬৯ সালে অস্কার আত্মহত্যা করেন। ক্যাথরিন বিশ্বাস করতেন, তার চাচার আত্মা তার কাছে আসতো। ক্যাথরিন পেশায় ছিলেন একজন কসাইখানার কর্মচারী।

জানা যায় লেখা পড়ায় মনোযোগী না হলেও স্কুলে আদর্শ ছাত্রী ছিলেন। ভাল আচরণের জন্য স্কুল থেকে বেশ কয়েকবার মেডেলও পেয়েছেন তিনি। মাত্র ১৫ বছর বয়সে লেখা পড়া না শিখেই স্কুল ছাড়েন ক্যাথরিন।
১৯৭৪ সালে ক্যাথরিন তার সহকর্মী ডেভিড ক্যালেটকে বিয়ে করেন।
বিয়ের রাতেই ক্যালেটকে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা চালান ক্যাথরিন। পরে ক্যাথরিন ব্যাখ্যা করেন ঘুমের মধ্যে তিনি এটি করে ফেলেছেন। তার ব্যাখ্যায় ব্যাপারটা তখন সমাধান হয়েও যায়। কিন্ত ক্যাথরিনের হিংস্র মানসিকতা আবার প্রকাশ পায় যখন তিনি অন্তঃসত্ত্বা। একদিন ক্যাথরিন তার স্বামী ক্যালেটের সব জামা কাপড় আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন এবং ফ্রাইংপ্যান নিয়ে ক্যালেটের ওপর চড়াও হন। কোনমতে প্রতিবেশীর বাড়িতে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন ক্যালেট।

প্যানের আঘাতে তার স্কালে ফ্রাকচার হয়। ১৯৭৬ এ ক্যাথরিনের প্রথম সন্তান ম্যালিসা এনের জন্ম হয়। তার কিছুদিন পরই ক্যালেট ক্যাথরিনকে ছেড়ে কুইন্সল্যান্ডে চলে যান অন্য এক মহিলার সাথে। পরদিন সকালে ক্যাথরিনকে পাওয়া যায় শহরের প্রধান রাস্তায় মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায়।

তিনি তার কন্যা মেলিসাকে বেবি সিটিং ট্রলিতে বসিয়ে এলোপাথাড়ি ছুড়ছিলেন। পুলিশ এসে ম্যালিসাকে উদ্ধার করে এবং ক্যাথরিনকে সেইন্ট এলমো মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করে। কয়েক সপ্তাহ পর মানসিক অবস্থার উন্নতি হলে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু হাসপাতাল থেকে মুক্তির পরদিনই ক্যাথরিন তার মেয়ে ম্যালিসাকে রেখে আসেন রেললাইনের উপর এবং শহরের রাস্তায় এসে একটা কুঠার নিয়ে মানুষদের খুন করার হুমকি দিতে থাকেন।

somoyerkonthosor story
ক্যাথরিন মেরি নাইট

এক বৃদ্ধ ম্যালিসাকে উদ্ধার করেন ট্রেন আসার মাত্র মিনিটখানেক আগে। আর পুলিশ ক্যাথরিনকে আটক করে আবার সেইন্ট এলমো হসপিটালে ভর্তি করে। কিছুদিন পর আবার মুক্তি পান ক্যাথরিন। এবার তিনি আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠেন। এক মহিলা গাড়িচালকের মুখে ছুরিকাঘাত করে তাকে জিম্মি করে গাড়ি নিয়ে কুইন্সল্যান্ডে ক্যালেটকে খুজতে যেতে বলেন। পথে এক সার্ভিস স্টেশনে পৌছালে আহত গাড়িচালক মহিলাকে উদ্ধার করে পুলিশ। এসময় ক্যাথরিন এক মোটর মেকানিককে খুন করার হুমকি দিতে থাকেন।

পুলিশ কৌশলে ক্যাথরিনকে নিরস্ত্র করে এবং আবার মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করে। হাসপাতালের এক নার্সকে ক্যাথরিন বলেছিলেন, তিনি ঐ মোটর মেকানিককে খুন করতে চান কারণ সে ক্যালেটের গাড়ি মেরামত করেছিল।খবর পেয়ে তার স্বামী ক্যালেট ফিরে আসেন।
৯ আগস্ট ১৯৭৬ হাসপাতাল ছাড়েন ক্যাথরিন এবং ক্যালেটের সাথে ব্রিসবেনে এক ছাদের নিচে থাকতে শুরু করেন ক্যাথরিন। ৬ মার্চ ১৯৮০ জন্ম হয় ক্যাথরিন-ক্যালেট দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান নাতাশা ম্যারির। ১৯৮৪ সালে ক্যাথরিন-ক্যালেট আবার আলাদা হয়ে যান। ক্যাথরিন তার বাবার বাড়ি ফিরে এসে আবার কসাইখানার কাজে যোগ দেন। কিছুদিন পর শারিরীক সমস্যার জন্য কসাইখানার চাকরী থেকে অবসর নেন। এসময় তিনি অবসর ভাতা এবং অস্ট্রেলিয়া সরকারের কাছ থেকে গৃহ ভর্তুকি পেতেন। ১৯৮৬ সালে ক্যাথরিনের বয়স যখন ৩৮ তখন পরিচয় হয় ডেভিড সন্ডার্সের সাথে। তারা একসাথে থাকতে শুরু করেন। কিছুদিন পরই ক্যাথরিন সন্ডার্সকে সন্দেহ করতে শুরু করেন। স্কোনে সন্ডার্সের নিজের একটি এপার্টমেন্ট ছিল। ওখানে সন্ডার্স প্রায়ই থাকতেন। এসময় ক্যাথরিন অনুরোধ করতেন তার কাছে ফিরে আসার জন্য। ১৯৮৭ সালে মে মাসের কোন এক দিনে ক্যাথরিন সন্ডার্সের সামনেই তাদের পোষা ডিঙ্গো পাপকে (কুকুর জাতীয় প্রাণী) গলা কেটে হত্যা করেন এবং হুশিয়ার করেন যদি কোন নারীর সাথে সম্পর্ক হয় তাহলে সন্ডার্সেরও একই পরিণতি হবে। ১৯৮৮ এর জুনে ক্যাথরিনের তৃতীয় মেয়ে সারা নাইটের জন্ম হয়।

এর পরের বছর আবার প্রকাশ পায় তার বিকৃত মানসিকতা। একদিন তিনি ঘর সাজান বন্য পশুর চামড়া হাড় খুলি ইত্যাদি দিয়ে। এমনকি ঘরের সিলিংও ঢেকে দেন এইসব মরা পশুর চামড়া দিয়ে। এসময়ই সন্ডার্সের সাথে ঝগড়ার এক পর্যায়ে লোহা দিয়ে সন্ডার্সের মুখে আঘাত করেন এবং পেটে ছুড়িকাঘাত করেন। সন্ডার্স কোনমতে সেদিন পালিয়ে আসেন এবং বাড়ি ছেড়ে স্কোনে এসে থাকতে শুরু করেন। কয়েকমাস পর বাড়ি ফিরলে শুনতে পান পুলিশের কাছে ক্যাথরিন সন্ডার্সের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন।

১৯৯০ সালে ক্যাথরিন জন শিলিংউড নামের এক কসাইখানার কর্মচারীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। ৪৩ বছর বয়সে ক্যাথরিনের চতুর্থ সন্তান এরিকের (ছেলে) জন্ম হয়। ৩ বছর পর শিলিংউডের সাথে ছাড়াছাড়ি হয় ক্যাথরিনের। কারণ ততদিনে ক্যাথরিন জন প্রাইস নামের বিপত্মিক এক পুরুষের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। প্রাইস ভালভাবেই জানতেন ক্যাথরিনের অতীতের হিংস্র মনোভাব সম্পর্কে। প্রাইসের আগের পক্ষের তিন সন্তান ছিল। ১৯৯৫ সালে ক্যাথরিন পাকাপাকিভাবে প্রাইসের বাড়িতে উঠে আসেন। প্রাইসের আগের ছেলেমেয়েরাও ক্যাথরিনকে পছন্দ করে ফেলে। প্রাইসের আয়টাও ভাল হচ্ছিল। সব মিলিয়ে জীবনটা সুন্দরই যাচ্ছিল। কিন্তু সমস্যা বাধে ১৯৯৮ সালে যখন প্রাইস ক্যাথরিনকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান। ক্যাথরিন ক্ষিপ্ত হয়ে অদ্ভুত এক কাজ করে বসলেন।
প্রাইস প্রায়ই তার অফিস থেকে পুরোনো জিনিসপত্র বাড়িতে নিয়ে আসতেন। ক্যাথরিন ঐসব জিনিসের ভিডিও করে পাঠিয়ে দেন সন্ডার্সের অফিসের বসের কাছে। ফলে ১৭ বছর ধরে করে আসা চাকরিটা হারান সন্ডার্স। ঐদিনই ক্যাথরিনকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন সন্ডার্স। ক্যাথরিন ফিরে আসেন তার বাবার বাড়িতে। কয়েকমাস পর প্রাইস আবার ক্যাথরিনের সাথে সম্পর্কটা শুরু করেন। তাদের বন্ধু বান্ধবেরা ভেবেছিল সব কিছু ঠিক আছে।

ফেব্রুয়ারি ২০০০। প্রাইস-ক্যাথরিনের মাঝে কথা কাটাকাটি হয়। অবস্থা চরমে পৌছালে ক্যাথরিন প্রাইসের উপর ছুরি নিয়ে চড়াও হন। দিন দিন ক্যাথরিনের হিংস্রতা বেড়েই চলেছিল। বিরক্ত এবং ক্ষিপ্ত প্রাইস ২৯ ফেব্রুয়ারি অফিস যাওয়ার পথে কোর্টে প্রতিরক্ষা আদেশের আবেদন করেন যেখানে লেখা ছিল ক্যাথরিনের কাছ থেকে তার সন্তানদের দূরে রাখার কথা। সেদিন অফিসে প্রাইস তার সহকর্মীদের জানান যে পরদিন তিনি যদি কাজে না আসেন তাহলে বুঝতে হবে ক্যাথরিন তাকে খুন করেছে। বিকালে বাড়িতে ফিরে তিনি তার বাচ্চাদের বন্ধুদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।
সেদিন সন্ধ্যায় অনেকটা সময় প্রাইস তার প্রতিবেশীদের বাড়িতে আড্ডা দেন। সেখানেও তিনি খুন হতে পারেন এমন সন্দেহের কথা বলেন। প্রতিবেশীরা প্রাইসকে বাড়ি যেতে নিষেধ করলে প্রাইস বলেন, তাকে না পেলে ক্যাথরিন বাচ্চাদের ক্ষতি করতে পারে। বাড়ি ফেরেন রাত ১১ টায়। এর কিছুক্ষণ পর ক্যাথরিন আসেন। তারা রাতে একসাথে শারিরীকভাবে মিলিতও হন। এরপর প্রাইস ঘুমিয়ে পড়েন।

পরদিন সকালে দেখা গেল নির্ধারিত সময়ের অনেক পরেও প্রাইস কাজে আসেননি। অফিস থেকে লোক পাঠানো হল তার বাড়িতে কি অবস্থা দেখার জন্য। দেখা গেল বাড়ির প্রধান দরজার সামনে রক্ত। ততক্ষণে প্রতিবেশীরাও লক্ষ করেছে ব্যাপারটা। তাড়াতাড়ি পুলিশে খবর দেয়া হয়। পুলিশ বাড়ির পেছন দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। প্রাইসের মৃতদেহ পাওয়া যায় লিভিং রুমের দরজার ফ্রেমে হুক দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায়। শরীর থেকে চামড়া ছিলে নিয়েছিলেন ক্যাথরিন। আর দেহটাকে ঝুলিয়ে রেখেছেন যেরকমটা কসাইরা গরু বা ছাগলের মাংসের বড় টুকরা ঝুলিয়ে রাখে। এখানেই শেষ নয়। প্রাইসের মাথা পাওয়া যায় সবজির পাত্রে যেটাকে সেদ্ধ করা হচ্ছিল। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ কেটে রান্না করে টেবি্লে সাজিয়ে রেখেছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল বাচ্চারা স্কুল থেকে ফিরলে তাদের এই মাংস খাওয়াবেন। কিন্ত তার আগেই সেখানে পুলিশ পৌছে যায়।

ময়নাতদন্তে পাওয়া যায়, রাতে ঘুমিয়ে পড়ার পর মাংস কাটার ছুরি নিয়ে প্রাইসের ওপর চড়াও হন ক্যাথরিন। বিকৃত দেহে কমপক্ষে ৩৭ টি কোপের চিহ্ন ছিল। বাড়ির সামনের দরজায় রক্তের চিহ্ন প্রমাণ করে খুন করার সময় প্রাইস দরজা খুলে বাইরে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। দরজা পর্যন্ত খুলতেও পেরেছিলেন। কিন্তু ধারালো অস্ত্রের উপর্যুপরি আঘাত আর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান প্রাইস। তারপর প্রাইসের মৃতদেহ টেনে ভিতরে নিয়ে আসেন ক্যাথরিন।

আদালতে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। বিচারক তার রায়ে এও বলেন যে, ক্যাথরিন সমাজে তার আশেপাশের মানুষের জন্য বিপদজনক। তাই তাকে প্যারেলেও মুক্তি দেয়া হয় না। এখনো তিনি কারাবন্দী আছেন।