কপর্দকশূন্য রেজাউল যেভাবে হলে দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চল আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদার

Rezaul-Pathan-Picture

আরাফাতুজ্জামান, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: কোটচাঁদপুর পৌরসভার কাউন্সিলর রেজাউলকে দুই সঙ্গীসহ আটক করে র‌্যাব। এ সময় তাদের কাছ থেকে অস্ত্র, গুলি, মাদক উদ্ধার করা হয় বলে জানায় র‌্যাব। কিন্তু কে এই রেজাউল? কিভাবেই তিনি হলেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদার। কোটচাঁদপুর শহরের আদর্শপাড়ার মৃত মমিন পাঠানের ছেলে রেজাউল পাঠান। ছিলেন ভবঘুরে। অভাব অনটনের সংসার। টাকা রোজগারের জন্য তার মাকে চলে যেতে হয় দেশের বাইরে। সেখান থেকে মা যৎসামান্য যা পাঠাতেন, তাই নিয়ে কষ্টের মধ্যে চলতো তার দিন।

কোটচাঁদপুর শহরের বাসিন্দাদের ভাষ্য মতে, মাঝে-মধ্যেই দেখা যেত গ্রামাঞ্চলে থানার কোনো অফিসার মামলার তদন্ত সংক্রান্ত কাজে গেলে রেজাউল পাঠান তার ৭০ সিসির মোটরসাইকেলে তাদের বহন করতেন। বিনিময়ে কিছু পয়সা পেতেন। পুলিশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠার এক পর্যায়ে তিনি ‘সোর্স’ হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। চোরাচালানিদের আনা ভারতীয় মাদক, চিনি, লবণ, শাড়ি-কাপড় থেকে শুরু করে আসামি ধরিয়ে দেওয়ার কাজে নেমে পড়েন তিনি। বছর দুয়েকের মধ্যে তিনি পুলিশের আস্থাভাজন সোর্স হিসেবে নিজেরেূপ্রতিষ্ঠিত করেন। এলাকায় রেজাউল পাঠান থেকে পরিচিতি পান ‘রেজাউল দালাল’ হিসেবে।

পুলিশের আস্থাভাজন হওয়ার সুযোগে সুচতুর রেজাউল, সোর্সের কাজের পাশাপাশি নিজেই মাদক ব্যবসার সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। পাশাপাশি পুলিশের অন্য সোর্সদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করতে থাকেন। ফলে রেজাউল দালালের ভয়ে পুলিশের সোর্সের কাজ করতে অন্য কেউ সাহস পেত না। পরে ওই সোর্সরা জামিনে মুক্তি পেলে বা রেজাউল নিজ ব্যবস্থাপনায় তাদের জামিন করে এনে নিজের পক্ষে ভেড়াতেন। ফলে এ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সোর্স হিসেবে রেজাউলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তার প্রকাশ্য উপস্থিতি রেজাউলের ক্ষমতার জানান দেয়। হয়ে ওঠেন বেপরোয়া।

অভিযোগ রয়েছে, রেজাউলের নেতৃত্বে রাতের বেলায় অপরিচিত লোককে পুলিশের পোশাক পরিয়ে কোটচাঁদপুর-জীবননগর মহাসড়কসহ বিভিন্ন সড়কের নির্জন স্থানে গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি করা হতো। এই গুরুতর অপরাধ প্রচার হয়ে পড়ায় র‌্যাব-পুলিশ তাকে গ্রেফতারের জন্য বেশ কয়েকবার অভিযান চালায়। কিন্তু তাকে ধরা সম্ভব হয়নি। পরে আবারো কিছু মাদক ধরিয়ে দিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আস্থাভাজন হওয়ার চেষ্টা করেন রেজাউল। এমনকী গত বছর তিনি বেশ কয়েকটি সোনার চালান ধরিয়ে দেন। এর মাধ্যমে তার আর্থিক অবস্থা রাতারাতি পাল্টে যায়।

একাধিক সূত্র জানায়, সোনার চালান বার বার ধরা পড়ায় চোরাচালানিরা হতাশ হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে তারা রেজাউল দালালের শরণাপন্ন হয়। একপর্যায়ে একযোগে সোনা পাচারের কাজ শুরু করে। এর পর থেকে সোনার চালান আর ধরা পড়েনি।

সোনা চোরাচালানসহ নানাবিধ অপরাধমূলক কাজে সফল হওয়ায় রেজাউল স্বল্প সময়ের মধ্যে দুই তলা বাড়ি বানিয়েছেন। বাড়িটিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সিসি টিভি ক্যামেরাসহ আধুনিক বিলাস-ব্যসনের কমতি নেই। এছাড়া নিজ এলাকা ও শ্বশুরবাড়ির এলাকায় ১০-১২ বিঘা জমিরও মালিক হয়েছেন রেজাউল। এর বাইরেও নামে-বেনামে অনেক টাকা ও সম্পদের মালিক তিনি।

একদার কপর্দকশূন্য রেজাউল অর্থ-বিত্তের মালিক হওয়ার পর স্বপ্ন দেখেন জনপ্রতিনিধি হওয়ার। গত পৌর নির্বাচনে তিনি কোটচাঁদপুর পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে দাঁড়ান। নিজ এলাকা ও বাইরের সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে নির্বাচিতও হয়ে যান। এই ভোটে তার ৩৫-৪০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে বলে জনশ্র“তি রয়েছে।

কাউন্সিলর হওয়ার পর তার দৌরাত্ম্য আরো বেড়ে যায়। এলাকাবাসী বলছেন, বিচারের নামে বাড়িতে আটকে রেখে বহু লোকের কাছ থেকে টাকা হাতিয়েছেন রেজাউল। এছাড়া সন্ত্রাসী তৎপরতা, সোনা ও অস্ত্র চোরাচালানও অব্যাহত ছিল আগের মতোই। হয়ে পড়েন আন্ডারওয়ার্ল্ডের ‘গডফাদার’।

অবশেষে রোববার দিবাগত মধ্যরাতে র‌্যাব তাকে আটক করে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তাদের আশা, যথার্থ বিচার হবে রেজাউল দালালের।