যে কয়েকটি কারণ আপনার স্মৃতি শক্তি কমানোর জন্য দায়ী

লাইফ স্টাইল ডেস্কঃ মানুষের মস্তিষ্কটাকে কম্পিউটার প্রসেসরের মতই ধরা হয়ে থাকে। এর একটি নির্দিষ্ট প্রসেসিং পাওয়ার রয়েছে আর রয়েছে বুদ্ধিমত্তাও। এই বুদ্ধিমত্তা আমরা কে কতখনি ব্যবহার করব তা নির্ভর করছে আমাদের ওপর। কোন কাজ শেষ করতে, সমস্যার সমাধান করতে, মনোযোগ দিতে, সৃজনশীল কাজে প্রয়োজন এই বুদ্ধিমত্তার। কিন্তু কিছু কিছু চিন্তার ভুল, মানসিক দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে কমিয়ে দেয় বুদ্ধি বা আইকিউ। বয়স বাড়ার সাথে সাথে কমতে থাকে মানুষের কোনো কিছু মনে রাখার ক্ষমতাও। বয়সের কারনে এ সময় মানুষের মস্তিস্কও খুব কম কাজ করে। এছাড়াও মানুষের আরও অনেক সমস্যা দেখা যায়। অনেক সময় আবার ছোট বাচ্চাদের স্মৃতি সমস্যা দেখা যায়। আর স্মৃতি শাক্তি মানুষের জন্য কতোটা প্রয়োজন এটা নিয়ে মনে হয় নতুন করে আর কিছু বলার নেই। অনেকে কোন কিছু একবার দেখলেই অনেকদিন পর্যন্ত স্মৃতিতে ধরে রাখেতে পারে। আপনি হয়তো ওই ব্যক্তির মতো কোন কিছুর দিকে বারবার তাকাচ্ছেন কিন্তু জিনিসটি মনে রাখতে পারছেন না। তবে কি আপনার মেধা অবশ্যই কম? আসলে সবাই একভাবে মনে রাখতে পারে না। কারণ, সবার মস্তিষ্কের গঠন একরকম নয়। তবে অনেকগুলো কৌশলের মধ্যে কয়েকটি সহজ কৌশলে আপনি বাড়িয়ে নিতে পারেন স্মৃতি শক্তি

যে কোন জটিল কাজ করার সময় আমাদের যদি অতিরিক্ত বুদ্ধি খরচের প্রয়োজন পড়ে তাহলে তার বিরূপ প্রভাব পড়ে আমাদের মনোযোগ দেয়ার ক্ষমতা এবং ফোকাসের ওপর। সাময়িকভাবে আমাদের আইকিউ কমে যায়।

যেমন, আমরা যদি হাঁটতে হাঁটতে ১০০০ থেকে পেছনের দিকে ৭ বাদ দিয়ে গুণতে শুরু করি অর্থাৎ ১০০০, ৯৯৩, ৯৮৬ এভাবে এগিয়ে যেতে থাকি তাহলে একসময় হাঁটা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ব। কারণ মস্তিষ্ক একই সঙ্গে দুই দিকে মনোযোগ দিতে পারবে না। কিন্তু কাজটি যদি এত জটিল না হত তাহলে একইসঙ্গে করা যেত। যেমন, আমরা গান শুনতে শুনতে অংক করতে পারি। খেতে খেতে বই পড়তে পারি।

আমাদের মানসিক কিছু অভ্যাস আছে যা আমাদের একই সঙ্গে দুই দিকে মনোযোগ দিতে দেয় না। আমরা যদি এগুলো সম্পর্কে সচেতন হই তাহলে নিজেদের যোগ্যতাকে আরও বাড়াতে পারব, আরও জটিল সমস্যা সমাধানে পারদর্শী হতে পারব। আসুন জেনে নিই এই মানসিক অভ্যাসগুলোর কথা।

১। গভীর চিন্তা

একজন মানুষ যদি সর্বোক্ষণ হতাশা এবং বিষন্নতায় ভোগে এবং নেতিবাচক চিন্তা করতে থাকে তাহলে এর বিরূপ প্রভাব মস্তিষ্কে পড়ে। আমরা যখন স্ট্রেসড থাকি তখন অনেক স্বাভাবিক বিষয়ও ভুলে যেতে থাকি। ছোট-খাট অনেক ভুল করতে থাকি যা করার কথা নয়। কারণ গভীর মানসিক চাপ আমাদের মনোযোগ ব্যাহত করে। শুধু মানসিক নয়, এর অনেক শারীরিক কুপ্রভাবও আছে।

২। সমাধান না হওয়া আত্মগ্লানি

আমাদের জীবনে বিভিন্ন রকম ভুল আমরা করি। সেগুলো আমাদের মধ্যে এক ধরণের আত্মগ্লানি তৈরি করে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলোর কোন সমাধান নেই। এমনকি এমনও অনেক সময় হয় যে, আমাদের দোষ না থাকা স্বত্ত্বেও আমরা নিজেদের দোষী মনে করি। এতে আমাদের মন ভারাক্রান্ত থাকে। নিজেকে দোষী মনে করে সারাক্ষণ কষ্টে থাকা ধীরে ধীরে নিজেকে শেষ করে দেয়ার সামিল। এই সমস্যার সবচেয়ে ভাল সমাধান হল, ক্ষমা চাওয়া এবং নিজেকে আত্মগ্লানি থেকে মুক্তি দেয়া।

৩। অকারণ অভিযোগ

কিছু ক্ষেত্রে রাগ প্রকাশের কোন মানে নেই। এমন অনেক ঘটনার সম্মুখীন আমাদের হতে হয়, যেগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু আমরা সেগুলোতে রাগ প্রকাশ করবোই, এটা যেন নির্ধারিত সত্য। শুধু তাই নয়, একই ঘটনা আমরা যতবার বর্ণনা করি ততবার আমরা রেগে যাই। এতে অনেক শক্তি খরচ হয়। যেসব অভিযোগের কোন সমাধান নেই সেসব অভিযোগ আমাদের দুর্বল বোধ করায়, আত্মবিশ্বাস কমায়। এতে মনোযোগ দেয়া, বুদ্ধি প্রয়োগের ক্ষমতাও হ্রাস পায়। তাই যত আমরা স্বাভাবিকভাবে পরিস্থিতিকে গ্রহণ করব তত আমাদের সুযোগ তৈরি হবে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার। মাথা ঠাণ্ডা রেখে প্রতিকূল অবস্থা বুদ্ধি খাটিয়ে নিজের আয়ত্বে নিয়ে আসতে পারব।

iq৪। দুশ্চিন্তা করা

আমাদের মধ্যে বেশীরভাগ মানুষই চিন্তা করাকে ক্ষতিকারক মনে করেন না। অথচ অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা এক প্রকারের ব্যাধি। দুশ্চিন্তা আমাদের বুদ্ধি প্রয়োগের ক্ষমতাকে হ্রাস করে। ক্রমাগত দুশ্চিন্তা করা একটি অভ্যাসে পরিণত হয়। এমন অনেক মানুষ আছেন যারা অল্প সমস্যাতেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে আর কোন সমাধান তো পানই না, অন্যদেরকেও সমস্যায় ফেলে দেন। অনেকে কোন কারণ ছাড়াই দুশ্চিন্তা করে রাতে ঘুমাতে পারেন না। এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই মানসিক রোগের চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হওয়া উচিৎ।

৫। অগ্রহণযোগ্যতা

আমরা কোথাও নিজেদের অগ্রহণযোগ্যতা মেনে নিতে পারি না। আশানুরূপ প্রবেশাধিকার না থাকলে আমরা হতাশা বোধ করি। এই অভ্যাস আছে সব মানুষেরই। নিজেদের জন্য ‘না’ শব্দটি আমরা চাই না। যুক্তির বদলে আমরা আবেগ দিয়ে বিচার করি তখন। কখনো কখনো নিজের সমালোচনা করি। কখনো বা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠি। ফলাফল নেই এমন প্রতিটি আচরণ আমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্থ করে, বুদ্ধি কমায়।

সবকিছুর সহজ সমাধান হল, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী। জীবন সম্পর্কে বাস্তব বোধ আমাদেরকে অনেক দূর এগিয়ে নিতে পারে।

পূর্বে ধারণা করা হতো, কোন ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তা পারিবারিক ইতিহাসের উপর নির্ভর করে। তবে সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে বিভিন্ন চর্চা ও খাদ্যতালিকার পরিবর্তনের ফলে মানুষ নিজেই তার বুদ্ধিমত্তার স্তর খুব সহজে বাড়িয়ে নিতে পারে। চলুন জেনে আসি যে  কয়েক উপায়ে বাড়িয়ে নিতে পারেন আপনার আইকিউ লেভেল

১) প্রচুর পড়তে হবেঃ

পড়ালেখা শুধু নিজের বিভাগ অনুযায়ী করলে হবে না। যেমন আপনি যদি বিজ্ঞানের ছাত্র হন শুধু বিজ্ঞানের বই পড়লে চলবে না। আপনাকে পড়তে হবে সব ধরণের বই। পড়তে হবে পত্রিকা, ম্যাগাজিন, জোকস, উপন্যাস, কবিতা, গল্প সব কিছু। এতে আপনার মস্তিষ্ক বিভিন্ন দিকে চিন্তা করার ক্ষমতা পাবে।

২) পাজল মিলানঃ

বিভিন্ন পত্রিকায় শব্দজট, পাজল, বুদ্ধির প্রশ্নগুলোর উত্তর দিন। খেলুন রুবিক্স কিউব। প্রথম প্রথম এসব সমাধান করতে সময় বেশি লাগলেও ধীরে ধীরে আপনি অভ্যস্ত হয়ে পড়বেন। এসব মিলাতে যত সময় কম লাগবে বুঝবেন আপনার আইকিউ লেভেল বেড়ে চলছে।

৩) মেডিটেশন করুনঃ

বিশেষজ্ঞদের মতে, মেডিটেশন বুদ্ধিমত্তা বাড়ানোর কার্যকর এক অস্ত্র। এটি মস্তিষ্কের রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে তোলে, ধৈর্য ধরতে শেখায়, মনোযোগ বাড়িয়ে তোলে। রাতে ঘুমানোর আগে প্রতিদিন ৩০ মিনিট মেডিটেশন করার চেষ্টা করুন।

৪) ব্যায়াম করুনঃ

বিখ্যাত সৃজনশীল লেখক Win Wenger এর মতে, হালকা ব্যায়াম আপনার বুদ্ধিমত্তা বাড়িয়ে তোলে। দিনের কিছু সময় বের করুন ব্যায়ামের জন্যে। ব্যায়াম করার পরপরই মেডিটেশন করতে পারেন। এতে আপনার শরীরের পাশাপাশি প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়বে মনেও।

৫)পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চত করুন:
একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের দৈনিক আট ঘন্টা ঘুমানো প্রয়োজন। একটা চমৎকার ঘুম আপনার মস্তিষ্ককে অধিক কার্যকরী করে তোলে। ঘুমের সময় সাম্প্রতিক সময়ের তথ্যগুলোকে মস্তিষ্কসংরক্ষণ করতে থাকে। আর ঘুমকে বলা হয় মেমোরি চার্জার। ঘুমের সময় আপনার মেমোরি পরবর্তী স্মৃতি ধরার জন্য প্রস্তুত হয়। তাই নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুমের মাধ্যমে স্মৃতিশক্তি বাড়াতে পারেন।

৬) খাদ্যতালিকা সাজিয়ে তুলুনঃ

আনন্দের কথা হচ্ছে এমন কিছু খাবার ও ফল আছে যা খেয়েও আমরা আমাদের স্মৃতি শক্তি বাড়াতে পারি। চলুন জেনে নেই সে সকল খাবার সম্পর্কে।

জাম:
প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় রাখতে পারেন জাম,লিচু,স্ট্রবেরি,কালোজাম বা আঙ্গুরের মত ফল। ফলগুলোতে রয়েছে এন্টি-অক্সিডেন্ট যা ব্রেইনের কোষের অক্সিডেশন এবং ক্রমাগত ক্ষয়ে যাওয়া রোধ করে। অর্থাৎ ব্রেইনের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। ব্লু বেরীকে ব্রেইনের জন্য সবচেয়ে কার্যকর খাবার বলে ধরা হয়, কেননা তা আলঝেইমার রোগ প্রতিরোধে সহযোগিতা করে ও শেখার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।

পাতা কপি ও পালং শাক:
পালং শাক ও পাতা কপিতে উচ্চ মাত্রায় ভিটামিন কে এবং বিটা ক্যারোটিন থাকে। যা পেশী শক্তি ও স্মৃতি শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে যারা নিয়োমিত পাতা কপি বা পালং শাক খান তাদের স্মৃতি শক্তি যারা খায় না তাদের চেয়ে অনেক বেশি।

সামুদ্রিক মাছ:
সামুদ্রিক মাছে প্রচুর পুষ্টি উপাদান থাকে যা মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়াতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। মস্তিষ্কে থাকা ফ্যাটি এসিডের ৪০% হচ্ছে ডি এইচ এ, যা সামুদ্রিক মাছের তেলে পাওয়া যায় ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড হিসেবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ব্রেনের বিভিন্ন কোষের মধ্যে সংবেদন আদান-প্রদান বাড়িয়ে দেয়।

বাদাম এবং বীজ দানা:
বাদাম এবং বীজ দানা জাতীয় খাবারে রয়েছে ভিটামিন ই, ও একটি এন্টি-অক্সিডেন্ট এর উৎস। বাদাম এবং বীজ দানার এ উপাদান সমূহ স্মৃতি শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়া আমন্ড বাদামও ব্রেনের কার্যক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।

কফি:
প্রতিদিন সকালে এক কফি পান করুণ। কারণ দীর্ঘদিন কফি পান করেন এমন ১৪০০ লোকের উপর চালানো গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যারা দিনে তিন থেকে পাঁচ কাপ কফি পান করেন তাঁদের স্মৃতি ভ্রংশের রোগ অনেকটাই কম হয়। এদের তুলনায় যারা দিনে দুই কাপ কফি পান করেন তাদের ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সে আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত হবার আশঙ্কা বেশি। ধারণা করা হয়,কফিতে থাকা ক্যাফেইন ও এন্টি-অক্সিডেন্ট ব্রেইনের কোষগুলোকে সুরক্ষিত করে।

বিট এবং ব্রোকলি:
বিট এবং ব্রোকলিও হতে পারে আপনার স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধির আরেকটি হাতিয়ার। কারণ এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ‘ভিটামিন কে’, যা মেধা ও স্মৃতি বর্ধক।

এইসব কাজ করে নিজের বুদ্ধিমত্তার স্তর বাড়ানোর আছে প্রচুর উদাহরণ। এবার নিজেকেও যোগ করে নিন সেই তালিকায়।