কিশোরগঞ্জে ১০ হাজার টাকায় বদলে গেছে রাবেয়ার জীবন কাহিনী

ছাইদুর রহমান নাঈম, কটিয়াদী প্রতিনিধি: বাড়িতে নতুন ঘর উঠেছে। হয়েছেন জমির মালিকও। সরকারেরর একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প সমিতির একজন সাধারণ সদস্য হিসেবে ১০ হাজার টাকা ঋণ নেন রাবেয়া। শুরু করেন মুরগির বাচ্চা পালন। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। মুরগি পালনের আয় থেকে পরিশোধ হয়েছে ঋণের টাকা। বাড়িতে নতুন ঘর উঠেছে। হয়েছেন জমির মালিকও।

rabeyar-saffolo

বর্তমানে তিনি একজন সুখি মানুষ। রাবেয়া খাতুনের বয়স চল্লিশের কোটায়। মুখের ছোট্ট হাসিই বলে দিচ্ছে, তিনি একজন সুখি মানুষ। হাতের পেশি আর কৌতূহলী চাহনি বলে দেয়, রাবেয়া অনেক পরিশ্রমী এবং বুদ্ধিমতি। তিন ছেলে ও এক মেয়ের সংসারে এখন আর দুঃখ-কষ্ট নেই। নিজের চেষ্টা আর পরিশ্রমে পরিবারের অনটন দূর করে সচ্ছলতার পথে পা বাড়াতে পেরেছেন রাবেয়া। সমিতি থেকে নেয়া মাত্র ১০ হাজার টাকা বদলে দিয়েছে তার জীবন কাহিনী। রাবেয়ার মতো এমন সফলতা এখন চোখে পড়বে কিশোরগঞ্জের পল্লীর পরতে পরতে।

সরকারের একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের মাধ্যমে সচ্ছল হচ্ছেন গ্রামের দরিদ্র মানুষ। এতে এক দিকে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হচ্ছে, অপরদিকে সামাজিক কর্মকাণ্ডে বাড়ছে গ্রামের স্বল্প আয়ের নারীদের নেতৃত্ব। কিশোরগঞ্জের ১৩টি উপজেলায় পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পে বিভিন্ন গ্রাম উন্নয়ন সমিতিতে প্রশিক্ষণ নিয়ে নানা উন্নয়নমুখী খামার পরিচালনা করছেন প্রায় ৬০ হাজার সদস্য।

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মহিনন্দন ভাস্করখিলা ও খাসুয়ারচর এলাকায় নিভৃত পল্লীতে গিয়ে দেখা গেছে বদলে যাওয়া দরিদ্রদের জয়ের দৃশ্য। ভাস্করখিলা গ্রামের রেজিয়ার এক সময় কিছুই ছিল না। এ প্রকল্পের সদস্য হিসেবে ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তিনি গরু মোটাতাজাকরণ শুরু করেন। এখন তিনি তিনটি গাভীর মালিক। এক ছেলে ঢাকায় রঙ মিস্ত্রির কাজ করে।

একই গামের রওশন আরা ঋণ নিয়ে ২০ হাজার টাকায় একটি ষাঁড় কেনেন। এটি বিক্রি হয় ৬৪ হাজার টাকায়। লাভের টাকায় ঋণ পরিশোধ করেও ৩৩ হাজার টাকা দিয়ে আরো একটি ষাঁড় কিনেছেন। সামনের বৈশাখে এটি বিক্রি করবেন। একইভাবে খাসুয়ারচর গ্রামের শাহজাহান ও আলমগীর সবজি চাষ করে সংসারে সচ্ছলতা এনেছেন। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির সভাপতি ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মাসুদ আল মামুন খান বলেন, সমবায়ের মাধ্যমে সমিতি গঠন করে পরিচালিত এ প্রকল্প গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

এ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা সদর উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা এএসএস আনোয়ার হোসেন জানান, ২০০২ সালে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে এখানে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। বর্তমানে প্রতিটি ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে এবং প্রতি উপজেলায় মোট ৯৯টি সমিতি আছে। প্রতিটি সমিতিতে ৬০ জন সদস্য রয়েছেন। তার মধ্যে ৪০ জনই নারী।

সমিতির সদস্যরা সপ্তাহে ৫০ টাকা এবং মাসে ২০০ টাকা করে জমা করেন। এভাবে ২ বছরে ২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা জমা হয়। সরকার সমপরিমাণ টাকা অনুদান এবং ৩ লাখ ২ হাজার টাকা ঋণ অনুদান দেয়। সব মিলে প্রতিটি সমিতির মূলধন দাঁড়ায় ৯ লাখ টাকা। আর সদস্যরা শতকরা ৮ টাকা সুদে সমিতি থেকে ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে মোটা অংকের ঋণ সুবিধা পান। পরিশোধ করতে পারেন প্রকল্পের আয় থেকে। আর সব লেনদেন পরিচালিত হয় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের অনলাইন কার্যক্রমের মাধ্যমে।

বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার উপ-পরিচালক ভবেশ রঞ্জন চৌধুরী সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, বর্তমানে এ প্রকল্পে জেলায় ৯৭২টি সমবায় সমিতি রয়েছে। এখন পর্যন্ত সদস্যদের মাঝে ২৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। সদস্যদের ২০ কোটি টাকা সঞ্চয় এবং সরকারের প্রায় ১৮ কোটি টাকার অনুদান সহ একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পে বর্তমানে ৬১ কোটি ৮৭ লাখ ৩৯ হাজার টাকার তহবিল আছে।

তিনি জানান, প্রতিটি উপজেলায় উপজেলা সমবায় অফিসারের নেতৃত্বে প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে মাঠ সহকারী এবং প্রতি উপজেলায় দুই জন করে ফিল্ড সুপারভাইজার কাজ করছেন। প্রকল্পের অধীনে সমিতির সদস্যরা ক্ষুদ্র ব্যবসা, গবাদি পশু পালন, মাছ চাষ, সবজি চাষ, হাঁস-মুরগি পালন সহ ৮৮টি ক্যাটাগারিতে প্রশিক্ষণ নিয়ে ছোট ছোট খামার পরিচালনা করছেন।