বরগুনায় শতাধিক জঙ্গি জামিনে, মামলা থেকেও অনেকে পেয়েছেন অব্যহতি

এম এ সাইদ খোকন, বরগুনা প্রতিনিধি- বরগুনার নিভৃত পল্লী থেকে প্রশিক্ষনরত অবস্থায় বিভিন্ন সময় আটক শতাধিক জঙ্গি জামিনের রয়েছে। আবার এদের মধ্যে অনেকে এসব মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়ে প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছেন। এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সচেতন মহল।aa7aa97ab17968d1176f70ceeff4a54a-57820dcfd80edতারা বলছেন, এসব জঙ্গিরা জামিনে মুক্ত থেকে তাদের জঙ্গি তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের এমন অবাদে চলাফেরা দেখে তরুনরাও উদ্বুদ্ধ হচ্ছে জঙ্গি সংগঠনে যোগ দিতে। তাই আটক জঙ্গিদের জামিনের ব্যাপারে সরকারকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়ে জঙ্গি দমনে এখন প্রচলিত আইন প্রয়োগ না করে নতুন আইন করা জরুরী বলেও মনে করেন তারা। সেই সাথে বরগুনায় গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধিরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৭ সালের ৩ ফেব্রয়ারি বরগুনার সদর উপজেলার ধুপতী গ্রামের আরাবীয়া এমদাদুল উলুম হাফিজিয়া কওমী মাদ্রাসা থেকে ৩ জন তালেবান প্রশিক্ষককে গ্রেফতার করে পুলিশ। যেখানে প্রায় ৫০ জন ছাত্র ও অন্যান্য জঙ্গী প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল।

এরপর ২০০৪ সালে বরগুনার সদর উপজেলার নিভৃত পল্লী নলটোনা ইউনিয়নের শিয়ালীয়া মাদ্রাসায় জঙ্গী প্রশিক্ষনের সময় ৩৩ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এসব জঙ্গীদের অনেকেই ২০০৫ সালে দেশ ব্যাপী সিরিজ বোমা হামলায় জড়িত ছিল বলে প্রতিবেদন আছে। গ্রেপ্তার হওয়া এসব জঙ্গিদের অধিকাংশই মামলা থেকে অব্যহতি পেয়েছেন। আর অল্প কয়েকজন পরবর্তীতে স্বল্প মেয়াদের শাস্তি ভোগ করেন।

এরপর ২০১৩ সালের ১২ আগষ্ট বরগুনায় তৃতীয় বারের মত শহরের উপকন্ঠ খেজুরতলা থেকে বৈঠকরত অবস্থায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসীম আনসারীসহ ৩১ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আটক হওয়া এই ৩১ জনের মধ্যে মুফতি জসীম আনসারী ছাড়া বাকি সবাই জামিনে রয়েছেন।

ভৌগলিক কারণে বরগুনা এখনো যোগাযোগ ব্যাবস্থা খারাপ। বিগত দিন গুলোতে বরগুনায় প্রকাশ্যে জঙ্গিদের তৎপরতা লক্ষ্য করা না গেলেও বিভিন্ন সময় ট্রেনিং সেন্টারের আবিস্কার হওয়ায় সাধারণ মানুষ ও বরগুনার সচেতন মানুষদের ভাবিয়ে তুলেছে। এছাড়াও বরগুনার সচেতন মহল মনে করছেন, সরকারের উদাসিনতার ফলে অতীতে গ্রেপ্তার কৃত জঙ্গিরা মুক্তি পেয়ে গেছে। তাছাড়া ঝালকাঠিতে জেএমবির বোমা হামলায় নিহত সহকারী জজ জগন্নাত পাড়ে হত্যার মামলার অন্যতম আসামীর বাড়ি এবং আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসীম আনসারী বাড়ি বরগুনায় হওয়ায় জঙ্গিদের তৎপরতা নিয়েও উদ্বিগ্ন সচেতন মহল।

এ বিষয়ে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) বরগুনার এর সভাপতি মোঃ আবদুর বর ফকির বলেন, বরগুনায় জঙ্গিরা আস্তানা গেড়ে এখান থেকেই দেশব্যাপী জঙ্গি তৎপরতা শুরু করে। এর বিভিন্ন নমুনাও আমরা দেখতে পেয়েছি। বরগুনায় বিভিন্ন সময়ে যারা জঙ্গি প্রশিক্ষনে অংশ নিয়ে হাতেনাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন, তারা আইনের বিভিন্ন ফাঁকফোকড় দিয়ে জামিনে বেড়িয়ে প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছেন। এ বিষয়গুলোকে যদি আমরা হালকা ভাবে দেখি, তাহলে আমাদরে জন্য সুফল বয়ে আনবে না। আমাদেরকে আরো সজাগ থাকতে হবে, সচেতন থাকতে হবে।

এ বিষয়ে বরগুনার সমাজ সেবক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা শুখরঞ্জন শীল বলেন, ২০০৫ সালে দেশ ব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার আগ থেকেই বরগুনাকে জঙ্গিরা তাদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। বরগুনাকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করার কারনে জঙ্গিরা বিভিন্ন সময় বরগুনায় নিভৃত পল্লীগুলোতে নতুন নতুন জঙ্গিদের প্রশিক্ষন দিলেও এখানে কোন হত্যাযজ্ঞ বা ধ্বংসাতœক কার্যক্রম পরিচালনা করেনি।

তিনি আরো বলেন, বরগুনায় বিভিন্ন সময় যেসব জঙ্গি প্রেপ্তার হয়েছে তাদের দ্রুত শাস্ত্রির ব্যবস্থা করা উচিত। তা না হলে, অনেক মানুষ তাদের দেখে জঙ্গি কর্মকান্ডে উদ্বুদ্ধ হবে।

আটক জঙ্গিদের জামিনে বের হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে বরগুনার অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মোঃ আখতারুজ্জামান বাহাদুর বলেন, আটক জঙ্গিরা যাতে বিচারিক আদালত থেকে জামিনে বের হতে না পারে, সেজন্য আমরা যথেষ্ট চেষ্টা করি । কিন্তু তারা যখন বিচারিক আদালত থেকে জামিনে বের হতে না পারে তখন তারা উচ্চ আদালতের স্বরনাপন্ন হয়ে জামিন নিয়ে আসেন। এ ক্ষেত্রে আমাদের করার তেমন কিছু থাকেনা।

তিনি আরো বলেন, মামলার অভিযোগপত্রে তথ্যউপাত্ত বেশি থাকলে আসামীদের জামিনে বের হওয়া একটু কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু আটক জঙ্গিদের অভিযোগ পত্রে তথ্যউপাত্তের পরিমান বেশি নয়। যার ফলে উচ্চ আদালতে আইজীবীরা আসমীদের জামিনের ব্যাপারে মামলার অভিযোগ পত্রের ফাঁকফোকরগুলো আদালতের নজরে নিয়ে আসে। এর ফলে আদালত জঙ্গিদের জামিন দিয়ে দেয়।

এ বিষয়ে বরগুনার পুলিশ সুপার বিজয় বসাক পিপিএম বলেন, বরগুনা জেলাটি বাংলাদেশের একটি উপকূলীয় জেলা। এ জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার দূরাবস্থার কারনে বিভিন্ন সময় জঙ্গিরা এখানে আশ্রয় নিয়ে থাকে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাগুলোর পরে জঙ্গিদের নির্মূল করতে পুরো জেলায় গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি, গোয়েন্দা কমিউনিটি পুলিশ এবং সাধারণ মানুষে মাধ্যমে বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে তা যাচাই করা হচ্ছে।

জঙ্গিদের অবস্থান এবং জঙ্গি তৎপরতার কোন ধরনের তথ্য কারো কাছে থাকলে, তাৎক্ষনিক তা তাকে জানানোর অনুরোধ করেছেন পুলিশ সুপার বিজয় বসাক পিপিএম। এ ধরনের তথ্যদাতার পরিচয় সম্পূর্ন গোপন রাখা হবে বলেও সকলকে অবহিত করেন তিনি।

এসময় ঘর ভাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে ভাড়াটিয়াদের সম্পর্কে সকল তথ্য যাচাই-বাছাই করে ঘর মালিকদের ঘর ভাড়া দেয়ার অনুরোধ করেন পুলিশ সুপার বিজয় বসাক পিপিএম। এছাড়াও ছেলে-মেয়েদের প্রতি বিশেষ ভাবে খেয়াল রাখারও জন্য অভিভবকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।