জঙ্গি হামলার আতঙ্কে অভিজাত এলাকায় রেস্তোরাঁ ব্যবসায় ধস

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক –  গুলশানের জঙ্গি হামলার পর রেস্তোরাঁ ব্যবসায় যে ধস নেমেছে রাজধানীর প্রগতি সরণির কফি শপ নর্থ অ্যান্ড কফি রোস্টার। ২০ দিন আগেও সারাক্ষণ জমজমাট থাকত। তবে গতকাল এখানে চেনা চেহারা পাওয়া গেল না। এক কোনায় বসে কফি পান করছিলেন তরুণ বয়সী শাহরিয়ার আহম্মেদ ও হৃদি রেজা। ঢাকার বারিধারার বাসিন্দা তারা। জানালেন, গুলশান হামলার পর তারা বাইরে বের হওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। ‘সবাই আসলে খুব ভয়ে আছি। অভিভাবকরাও টেনশনে থাকেন। আমাদের বন্ধুরাও কেউ খুব একটা বাইরে যায় না। কফি শপ বা রেস্তোরাঁয় বসা একদমই কমিয়ে দিয়েছি।’

dhos

 রেস্তোরাঁগুলোর ক্রেতাদের বড় অংশ তরুণরা। জঙ্গি হামলার আতঙ্কে অভিভাবকরা আর তাদের সন্তানদের সহজে বাইরে বের হতে দিচ্ছেন না। এছাড়া অভিজাত এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা তল্লাশির নামে আছে হয়রানি হওয়ার বিড়ম্বনা। তাই অনেক তরুণ বিড়ম্বনা এড়ানোর জন্যও আর বাইরে বের হচ্ছেন না। এসব কারণে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসা।

নর্থ অ্যান্ড কফির শিফট ইনচার্জ আতাউর রহমান বলেন, আগের মতো ক্রেতাদের ভিড় নেই। এখন বিদেশিরা তো আসেনই না, স্থানীয়রাও আসতে ভয় পান। বনানীর ১১ নম্বর সড়কের ক্যাফে দ্রুমে সন্ধ্যার পর লোকজনের ভিড় লেগেই থাকত। তবে সে চিত্র পাল্টে গেছে বলে জানালেন ক্যাফের ব্যবস্থাপক আবু বকর সিদ্দিক। তিনি বলেন, গুলশান-বনানী ছাড়াও রাজধানীর অন্য এলাকা থেকে অতিথিরা আমাদের এখানে আসেন। এখন এদিকে আসতে হলে কয়েক দফা পুলিশের তল্লাশির মুখে পড়তে হয়। ঝামেলা এড়াতে অনেকেই আসেন না। পর পর দুটি জঙ্গি হামলার পর সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক বিরাজ করছে গুলশান, বনানী, বারিধারাসহ অভিজাত এলাকায় অবস্থিত হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে। এসব এলাকায় কমেছে লোকজনের আনাগোনা।

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কয়েকটি অনুষ্ঠান বাতিল হওয়ায় আবাসিক হোটেল ও সম্মেলন কেন্দ্রে কমেছে অতিথির সংখ্যা। সরকারের পাশাপাশি নিজ নিজ উদ্যোগে নিরাপত্তা বাড়িয়েও ব্যবসায়িক লোকসান কাটাতে পারছে না রাজধানীর পাঁচতারকা হোটেল ও অভিজাত রেস্তোরাঁগুলো। নিরাপত্তাজনিত কারণে বিদেশিদের বাংলাদেশ সফরে অনীহার পাশাপাশি অগ্রিম বুকিং অর্ডার বাতিল করেছেন সম্ভাব্য অতিথিরা। একই সাথে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সভা-সেমিনারসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনেও ভাটা পড়েছে। সার্বিকভাবে অভিজাত এসব হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোর পরিচালনা ব্যয় বহন করতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্তৃপক্ষ। দেশের শীর্ষ ফাস্টফুড চেইন কেএফসি ও পিৎজা হাটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আক্কু চৌধুরী বলেন, গুলশানের জঙ্গি হামলার পর থেকে ব্যবসা খারাপ যাচ্ছে। বিশেষ করে গুলশান-বনানী এলাকায়। এখনো সবাই আতঙ্কিত। পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে। আশা করছি শিগগিরই এ অবস্থার উন্নতি হবে।

গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের উপদেষ্টা এবং ১২৩ নম্বর সড়কের ৫৫ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা রাফেজ আলম চৌধুরী বলেন, স্থানীয় লোকজনের আতঙ্ক এখনো কাটেনি। খুব প্রয়োজন না হলে বাইরের লোক আর গুলশানমুখো হচ্ছেন না। গুলশানের রেস্তোরাঁ ও শপিং মলগুলোয় অন্য এলাকার লোকজন আসছে না আতঙ্কের কারণে। আমরা যারা গুলশানের বাসিন্দা তাদের তো কাজের প্রয়োজনে বাইরে বেরুতে হয়। আমরাও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছি। গুলশান দক্ষিণ এভিনিউয়ের ভিলেজ রেস্তোরাঁ দেশি-বিদেশি অতিথিদের ভিড়ে জমজমাট থাকত সব সময়। গতকাল দুপুরে সেখানে দেখা যায় সুনসান নীরবতা। রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক মেহেদী হাসান জানান, সম্প্রতি জঙ্গি হামলার ঘটনার পর হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোর লাভ অনেক পিছিয়ে গেছে। প্রায় ৬০ শতাংশ অতিথি বিদেশি ছিল। তাদের বেশি পদচারণাই ছিল হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে। এখন বিদেশি অতিথিরা পারতপক্ষে আসেন না। মেহেদি হাসান জানান, ৩০০ জনের ধারণক্ষমতার এই রেস্তোরাঁর মোটামুটি ৭০ শতাংশ পূর্ণ হতো প্রতিদিন। গুলশান হামলার পর আসনের ২০ শতাংশও পূর্ণ হয় না। ব্যবসা নিয়ে এখন পথে বসার অবস্থা। অ্যাবাকাস রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থাপক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক কড়া করা আছে। সিসি ক্যামেরা রয়েছে। চেক করে ঢোকানো হচ্ছে। তারপরও মানুষ আতঙ্কের মধ্যে আছে। সরকার যেভাবে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে, আমরা আশাবাদী অতি শিগগিরই একটা ভালো কিছু দেখতে পারব। এ রেস্তোরাঁয় আসা বনানীর ২ নম্বর সড়কের এক বাসিন্দা বললেন, তিনি ঘরে বসে থাকতে রাজি নন। নিজের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে ঢাকায় একটি দূতাবাসের এই কর্মকর্তা জানান, একটা আতঙ্ক আছে, তারপরও হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে তো হবে না। বের হতে হবে। অবশ্য বনানীর ৬ নম্বর সড়কের টেক আউট রেস্তোরাঁয় ক্রেতাদের ভিড় দেখা গেছে। আতঙ্ক না ছাড়লেও ১৫ নম্বর সড়কের বাসিন্দা আবদুর রহমান পরিবার নিয়ে খেতে গিয়েছিলেন সেখানে। আমরা সবাই খুব ভয়ে আছি। কখন কী হয় বলা তো যায় না। এদিকে অতিথিদের নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে হোটেল কর্তৃপক্ষের নেয়া পদক্ষেপ অনেকটা চোখে পড়ার মতো। কিন্তু কেউ আসতে সাহস পাচ্ছে না। অতিথিরা না আসায় অনেক রেস্তোরাঁ বাধ্য হয়ে বুফে লাঞ্চ বন্ধ করে দিয়েছে। পার্টি রিজার্ভেশনও নিচ্ছে না। একই অবস্থা গুলশানের কফি শপগুলোর।

গুলশান হামলার পর রাজধানীর বিভিন্ন কনভেনশন হলে পূর্বনির্ধারিত অনেক অনুষ্ঠানও বাতিল হয়েছে। স্পেকট্রা কনভেনশন সেন্টারের ব্যবস্থাপক মো. আরিফ শিকদার জানান, ঈদের পর ১৮ জুলাই পর্যন্ত ১৬টি অনুষ্ঠান সেখানে হয়েছে। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে নয়টি অনুষ্ঠান বাতিল করে দিয়েছেন আয়োজকরা। তিনি জানান, লন্ডনে বসবাসকারী ছেলের বিয়ের জন্য স্পেকট্রায় হল ভাড়া করেছিলেন ঢাকার একজন ব্যবসায়ী। কিন্তু ভিসা জটিলতায় অনুষ্ঠানও আটকে গেছে। একই সঙ্গে আমরা পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়েছি। সিসি ক্যামেরা বসিয়েছি, প্রত্যেককে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে পরীক্ষা করে হলে ঢোকানো হয়। তবে লোকজনের আস্থা না ফিরলে পরিস্থিতি পাল্টাবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি। ঢাকা রিজেন্সি হোটেলের একজন কর্মকর্তা জানান, ঈদের পর মানি লন্ডারিং ও টেলিযোগাযোগ বিষয়ে সম্মেলন এবং আমেরিকান দূতাবাসের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। এসব সম্মেলনের অতিথিদের জন্য ঢাকার বড় হোটেলগুলোতে ১২০০ কক্ষের রিজার্ভেশনও নেওয়া হয়েছিল। গুলশানের ঘটনার কারণে নিরাপত্তাজনিত কারণে সম্মেলন বাতিল হওয়ায় রিজার্ভেশনও বাতিল হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে রিজেন্সির ওই কর্মকর্তা জানান, তাদের হোটেলে ঈদের পর নির্ধারিত ১০টি অনুষ্ঠানের মধ্যে আটটির তারিখ পেছানো হয়েছে, দুটি বাতিল করা হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের মতে, অভিজাত হোটেলগুলোয় বেশিরভাগ অনুষ্ঠান হয় বিদেশিদের জন্য। তারা না আসতে পারলে অনুষ্ঠান হবে কী করে? যদিও অধিকাংশ ব্যবসায়ীর প্রত্যাশা সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মোশতাক আহমেদ বলছেন, নাগরিকদের আস্থা ফেরাতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ‘প্রয়োজনীয় সবকিছুই’ করছে। অভিজাত এলাকায় শিগগিরই আবার প্রাণচাঞ্চল্য ফেরার আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমরা নজরদারি বাড়িয়েছি। দিনে-রাতে টহল দেওয়া হচ্ছে। আমরা হোটেল, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লোকজনের সঙ্গে পরামর্শ করছি। এরপরও বিদেশিরা বাড়তি নিরাপত্তা চাইলে তা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।