রামপাল বিদ্যুতকেন্দ্র নিয়ে তীরন্দাজের নাটক বাতিল করলো শিল্পকলা কর্তৃপক্ষ

 সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক –   তীরন্দাজ নাট্যদল তাদের নতুন প্রতিবাদী নাটক ‘কন্ঠনালীতে সূর্য’ নাটকটির প্রদর্শনীর পুর্বে সুন্দরবন ধ্বংসকারী দেশ বিরোধী সরকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একটি বাহাসের আয়োজন করেছিল গতকাল (২০ জুলাই, ২০১৬) শিল্পকলা একাডেমীতে। বাহাসে বিভিন্ন অতিথির সাথে সুন্দরবনে বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ উপস্থিত থাকার কথা ছিল এবং তিনি এসেছিলেন।

নাটক প্রদর্শনীর পূর্বে দর্শকরা নাটক দেখতে এসে জানতে পারেন শিল্পকলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ তীরন্দাজ এর নাটক প্রদর্শনী ও সুন্দরবন নিয়ে বাহাস অনুষ্ঠান বাতিল করেছেন। এ বিষয়ে সাংস্কৃতিক কর্মী ব্রাত্য আমিন এর ফেসবুক স্ট্যাটাসটি এখানে কোড করা হল:

আজ এক ভয়ঙ্কর সত্যের মুখোমুখি হলাম বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে গিয়ে। আমি গিয়েছিলাম তীরন্দাজ নাটকের দল আয়োজিত ‘কন্ঠনালীতে সূর্য’ নাটক এবং নাটকের পূর্বে সুন্দরবন বিষয়ে আনু মুহম্মদের সঙ্গে বাহাস অনুষ্ঠানটি দেখা, সুন্দরবনের পাশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পক্ষে-বিপক্ষের যুক্তিগুলো পরিষ্কার করে শোনা ও বোঝার জন্য। কিন্তু একি! আমাকে শিল্পকলার ভেতরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না! কারন? কারন এখানে একটা নাটকের দল সুন্দরবন বিষয়ে আলোচনার আয়োজন করেছে যা কর্তৃপক্ষ নাকি আগে থেকে জানতো না! কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবলাম, আমি ২০০১ সাল থেকে থিয়েটারের সাথে যুক্ত, এই প্রথম আমি শিল্পকলার ভেতরে ঢুকতে পারছি না কারন একটি নাটকের দল সরকারের গৃহীত একটি সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে! মানে আমরা সংস্কৃতিকর্মীরা সরকারের কোনো কার্যকলাপ বা সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে এখন থেকে আলোচনা পর্যন্ত করতে পারবো না!!! করলে সেটা সরকার বিরোধী আখ্যা দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হবে!!! এ আচরন ভয়ানক। এই ভয়ানক আচরনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সকল সংস্কৃতিকর্মী, শিল্পীগোষ্ঠী, গণমাধ্যমকর্মী, থিয়েটার ফেডারেশন, সাংস্কৃতিক জোট, এমনকি গণমাধ্যম কি ভুমিকা নেয় তা দেখার অপেক্ষায় থাকলাম। প্লিজ নিজের অবস্থান পরিষ্কার করুন। আপনি কি জনস্বার্থবিরোধী সুন্দররবন সংলগ্ন কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পক্ষে নাকি বিপক্ষে?? এই প্রসঙ্গে আপনি চুপ থাকার মানে খুবই পরিষ্কার – হয় আপনি সরকারী দলের খাস চাটুকার, অথবা ভয়ঙ্কর স্বার্থপর, ভন্ড, নিজের বর্তমানের বাইরে এক বিন্দুও ভাবতে নারাজ। এই ধরণের মানুষদের প্রতি ঘৃণা, করুণা।

 পুর্বের নির্ধারিত নাটক ও বাহাস দেখার জন্য দর্শকরা শিল্পকলা একাডেমীতে এসে সরকারের এমন সিদ্ধান্তে হতবাক হয়ে গেছেন অনেকে। দর্শক হিসাবে নাটকটি দেখতে না পেরে অনলাইন এক্টিভিস্ট বাকি বিল্লাহ ফেসবুকে তার অভিমত ব্যক্ত করেছেন। নীচে কোড করা হলঃ

প্রথম ছবিটা শিল্পকলা একাডেমীর মূল মিলনায়তনে ওঠার সিড়ির ঠিক সামনে। পেছনে যে একটা কাঠের ফ্রেম দেখা যাচ্ছে ওটা অস্থায়ী। ব্যারিকেডের মত করে ওটাকে ফেলে দিয়ে সিড়িকে অবরুদ্ধ করা হয়েছে যাতে করে কেউ মিলনায়তনের দিকে না যেতে পারে। এটা রাখা হয়েছে বিকেল থেকে। তখনো তীরন্দাজ নাট্যদলের আজকের মিলনায়তন বুকিং বাতিল করা হয়েছে এরকম কোনো খবর তাদেরকে দেয়া হয়নি।
.
সাম্প্রতিক সময়ে তীরন্দাজ বাংলাদেশের নাট্যজগতে এক বিশেষ নাম। তীরন্দাজ, বটতলার মত নাটকের দলগুলো সমসাময়িক সময়কে ধারালো ছুরির ফলার মত প্রতিফলিত করছে মঞ্চে। তীরন্দাজের নতুন নাটক ‘কন্ঠনালীতে সূর্য’এর প্রদর্শনী ছিল আজ সন্ধ্যা ছয়টায়, শিল্পকলার মূল মিলনায়তনে। নাটকের আগে সুন্দরবনের বুকে রামপাল কয়লাবিদ্যুত প্রকল্প প্রসংগে বিতর্ক আহ্বান করেছিল তারা- কন্ঠনালীতে সূর্য নাটকের বিষয়বস্তুও এই প্রসংগ। বিতর্কে রামপাল প্রকল্পের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদকে ডেকেছিল তীরন্দাজ, প্রকল্পের পক্ষে কথা বলার জন্য অন্যদেরও আহবান জানিয়েছিল তারা। আর এ বিষয়ে বিতর্কের দূ:সাহস করার খেসারত দিতে হলো তাদের।
.
বিকেল পৌনে ছ’টার দিকে শিল্পকলা গিয়ে দেখি সাজ সাজ রব। প্রচুর পুলিশ,মূল ফটক বন্ধ করে রাখা হয়েছে। নাটকের টিকিট দেখে দেখে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে। আমি কাউন্টারে তীরন্দাজের শো’এর টিকিটি কাটতে গিয়ে দেখি ওখানে কেউ নেই। আরো দুটি নাটকের শো ছিল,ওগুলির টিকিট বিক্রি হচ্ছে। দীপক সুমনকে ফোন দিয়ে শুনতে পেলাম- তাদের বুকিং বাতিল করে দেয়া হয়েছে। এই বোধবুদ্ধি নিয়ে শিল্পকলা চালান কর্তাব্যক্তিরা। সরকার বিব্রত হবেন বলে নাটকের শো বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে- এর নাম শিল্প সংস্কৃতি চর্চা? কোথায় গিয়ে দাড়াচ্ছি আমরা? কথা বলতে দিতে এত ভয়?
তীরন্দাজের বন্ধুরা ছেড়ে কথা বলেননি। তাদের প্রতিবাদী স্পিরিটকে অভিনন্দন। কিন্তু অন্যরা কোথায় ছিলেন? অন্যান্য নাটকের দলগুলির কাছে প্রত্যাশা- আপনারা এই অন্যাায্য সিদ্ধান্তের প্রতিবদ করুন। তীরন্দাজের পাশে দাঁড়ান। অন্যথায় এইসব শিল্পচর্চা আর ভেড়া চরানোর মধ্যে পার্থক্য থাকে না।

সরকারের এই হীন সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে আরেক অনলাইন এক্টিভিস্ট সাইয়েদ ফয়েজ আহমেদ বলেন,

শিল্পকলা একাডেমীতে নাটক শুরু হবার আগে ভাষনে রামপাল নিয়ে কথা বলায় শো বন্ধ এবং আনু মোহাম্মদকে হেন্সথা। অবশ্য আনু মোহাম্মদ এর বক্তব্য এখন এমনিতেই মেইন্সট্রিম মিডিয়াতে আসে না।এই কাহিনীও আসবে না, হয়তো।
.
অনেক টাকা পয়সা খরচ করে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাড়াতে বৃটিশ কোম্পানী ভাড়া করা হয়েছে কিন্তু তাতে তো লাভ হয়ইনাই উলটা জার্মানিতে ডিরেক্ট কার্গো শিপমেন্ট বন্ধ। জার্মানি আমাদের জন্য অন্যতম বৃহত্তম বাজার। সেইখানে ডিরেক্ট শিপমেন্ট বন্ধ হইলে প্রভাব বেশ খারাপ হবে। এরপর হয়তো প্যাসেঞ্জার শিপমেন্ট ও বন্ধ করে দিবে কিনা কে জানে। এই কাহিনীও মিডিয়াতে আসবে না, হয়তো।
.
ফেসবুকে এইগুলা লেইখাও লাভ নাই, কিছুই হবে না, জাহান্নামের চৌরাস্তায় দাড়ায়ে আইয়ুব খান কানতে কানতে বলতেসে, তাবেদারী মিডিয়া আর ফেসবুক এই দুইটা জিনিস আমার আমলে থাকলে আমি মরার আগপর্যন্ত এই দেশের মানুষরে শাসন কইরা যাইতাম। এগো স্বাধীনতার তো প্রশ্নই আসে না, আমার শাসন থিকাও ছাড়া পাইতো না।


নাটক প্রদর্শনী ও বাহাসে আমন্ত্রিত অতিথি আনু মুহাম্মদ সংবাদ মাধ্যমকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে