দুনিয়াজোড়া ভয়ংকর সব মানুষখেকোদের যত অদ্ভুত রহস্যকথা !

জানা-অজানা ডেস্ক,সময়ের কণ্ঠস্বর-

মানুষখেকো প্রাণী নিয়ে মানুষের আগ্রহের সীমা নেই। যারা শিকার কাহিনী পড়েছেন তাদের এ রোমাঞ্চের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার কিছু নেই। যারা পড়েননি, তাদের আগ্রহও কিন্তু নিছক কম নয়। অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম একটা শিকার কাহিনী লিখবো। লেখা হয়ে উঠছিলো না। ভাবলাম আগে শিকার কাহিনীর সঙ্গে পাঠকের পরিচয় করানো যাক, পরে না হয় আমার বানানো গপ্পো ফেঁদে বসবো। বুকে হাত দিয়ে বসুন, কারণ আমি আপনাকে এখন দুনিয়াজোড়া কুখ্যাতি পাওয়া মানুষখেকো প্রাণীগুলোর গল্প শোনাতে যাচ্ছি। যার এক বিন্দুও বানানো নয়।

মানুষের মগজখেকো আদিবাসী (পাপুয়া নিউগিনির দক্ষিণ ফোর এলাকা )

গরুর একটি ভয়ানক রোগ ‘ম্যাড কাউ’। রোগটি গরুর হলেও মানব দেহে সংক্রমিত হয়ে এটি ধ্বংস করে দিতে পারে মানব সমাজকেও। এখন পর্যন্ত এ রোগের তেমন কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। তবে চিকিৎসকদের ধারণা, এ রোগের চিকিৎসায় কাজে আসতে পারে মানুষের মস্তিষ্কখেকো একটি উপজাতি সম্প্রদায়।

মানুষ মানুষের মাংস খাচ্ছে এরকম বিবরণ পাওয়া যায় অনেক দেশের অনেক উপকথায়ই। প্রশ্ন হচ্ছে আসলেই কি মানুষ মানুষকে খায়, না কি এসবই লেখকদের বানানো কল্পনা। মানুষ খাওয়ার সত্যিকার প্রমাণ আছে কি না? আর খেলে কারা খায়? কেনইবা খায়?

গল্প কাহিনীতে যেমনই লাগুক পাপুয়া নিউগিনির দক্ষিণ ফোর এলাকার লোকেরা পঞ্চশের দশকেও মানুষের মগজ খেতো। অস্ট্রেলিয়ার সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণার আগ পর্যন্ত ওরা ওদের মৃত আত্মীয়দের মগজ খেতো। অনেক সময় আশপাশের গোষ্ঠির সাথে যুদ্ধে শত্রুপক্ষের যারা মারা যেত বা বন্দী হতো তাদেরকে খাওয়ার প্রথা ছিল।

ষাটের দশকে পাপুয়া নিউগিনির এসব লোকদের মধ্যে ‘কুরু’ (laughing sickness) নামের একটি রোগ ভীষণভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে। এ রোগ হলে আক্রান্তদের প্রথমে নড়াচড়া ও কথা বলায় সমস্যা হতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা হাঁটা চলার সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলে এবং শেষে মারা যায়।

রোগটার কারণ ঠিক পরিষ্কার ছিল না। তবে বোঝা যাচ্ছিল, যেসব এলাকায় মানুষখেকো প্রথা আছে সেসব এলাকায় রোগের প্রকোপ বেশি। আর তাই সত্তরের দশকে এক পর্যায়ে অস্ট্রেলীয় সরকার মানুষ খাওয়া নিষিদ্ধ করে দেয়। এর পরপরই রোগের প্রকোপ বন্ধ হয়ে যায়।

এবারও বিজ্ঞানীদের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে একই তথ্য। ম্যাড কাউ রোগের বিস্তার নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজের গবেষক ডা. সিমন খুঁজে পেয়েছেন, ম্যাড কাউ এবং নিউগিনির কুরু রোগের লক্ষণ এবং পরিণতিতে মিল আছে। তার গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, ম্যাড কাউ রোগাক্রান্ত গরুর মস্তিষ্ক খেলেই ছড়ায় রোগটি।

রোগটির চিকিৎসাও খুঁজে পেয়েছেন তিনি। পাপুয়া নিউগিনিতে যখন মানুষখেকো প্রথা ছিল তখন যারা কুরু রোগে আক্রান্ত মানুষ খাওয়ার পরও আক্রান্ত হয় নি এবং এখনো বেঁচে আছে, তাদের জিন পরীক্ষা করে দেখা গেছে এদের জিনের মধ্যে ম্যাড কাউ রোগের প্রতিষেধক আছে। মানুষ খাওয়ার কারণেই তাদের মধ্যে এই জিনটি তৈরি হয়েছে।

নজোম্বের সিংহের দলঃ

তালিকার শুরু করা যাক সবচেয়ে বেশী মানুষ মারা সিংহের দলকে দিয়ে। ১৯৩২ সালের ঘটনা। তানজানিয়ার নজোম্বে গাঁয়ের একদল সিংহ এই হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। কোন এক রহস্যময় কারণে এই সিংহগুলোর মানুষের মাংসে আগ্রহ জন্মে গিয়েছিলো।

man hunter animal by somoyerkonthosorএ সম্পর্কে একটা গল্প খুব চালু আছে। গুজব বলে মনে হলেও ওটা বিশ্বাস করে এমন লোকের সংখ্যাও কম নয়। মাতামুলা মঙ্গেরা নামের এক ওঝা নাকি নিয়ন্ত্রন করতো সিংহের পাল কে। গাঁয়ের ওঝা ছিলো সে। নজোম্বের গোত্রপ্রধান তাকে গাঁ থেকে তাড়িয়ে দিলে প্রতিশোধের নেশায় পাগল হয়ে ওঠে মঙ্গেরা। জঙ্গলে আত্নগোপন করে থাকতো সে, বের হতো ভৌতিক চাঁদের রাতে। রক্তহীম করা কন্ঠে মন্ত্রপাঠ করতো। হাতের বাঁকা লাঠিটা নজোম্বের দিকে তাক করে অভিশাপ দিতো গাঁয়ের মানুষদের। তারপর পেছন ফিরে মিলিয়ে যেতো জঙ্গলে। এরপরেই শুরু হতো হত্যাযজ্ঞ। একপাল সিংহ ঝাঁপিয়ে পড়তো নিরীহ গ্রামবাসীদের ওপরে। রক্ষা পেতে অনেকেই গাঁ ছেড়ে পালাতে চাইতো, কিন্তু পালাতে গিয়েও সিংহের হাতে মারা পড়েছিলো অনেকে। গাঁয়ের লোকে বিশ্বাস করতো পালাতে গেলে মারা পড়তে হবে। কারণ, গাঁয়ের চারপাশে পাহাড়া দিচ্ছে মানুষখেকো সিংহের দল। অবস্থা এতটাই সঙ্গীন হয়ে দাঁড়িয়েছিলো যে কেউ দিন বা রাতে কোনসময়েই সিংহের নামটা উচ্চারণ পর্যন্ত করতো না পাছে যদি সিংহ তাকেও পরবর্তী টার্গেট হিসেবে বেছে নেয়। গাঁয়ের এ দূরবস্থায় গ্রামবাসীরা গোত্রপ্রধানকে অনুরোধ করলো মঙ্গেরাকে ওঝার পদে পুনর্বহাল করবার জন্যে। গোত্রপ্রধান রাজী ছিলোনা, কারণ মঙ্গেরাকে সে হুমকি বলে মনে করতো। সে জানতো এর ফলে মঙ্গেরা একসময় নিজেই গোত্রপ্রধান বা মোড়ল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইবে। এভাবেই সিংহের আক্রমন চললো কিছুদিন। প্রায় ১৫০০ (মতান্তরে ২০০০) লোক মারা গিয়েছিলো এই আক্রমনে যা সর্বোচ্চ রেকর্ড।

নজোম্বের এই ক্রান্তিকালে জর্জ রাশবি নামের এক বিখ্যাত শিকারী এগিয়ে এলেন। প্রায় ১৫টা মানুষখেকোকে কব্জা করেন তিনি। বাকীগুলো পালিয়ে যায়। দুঃস্বপ্নের সমাপ্তি ঘটে নজোম্বের নিরীহ মানুষদের। স্থানীয়দের অনেকেরই অবশ্য বিশ্বাস ছিলো গোত্রবাঁচাতে বাধ্য হয়েই মঙ্গেরাকে ওঝার পদে নিয়োগ দিয়েছিলো গোত্রপ্রধান। তার ফলেই বন্ধ হয়েছিলো এই গনহত্যা। আসল ঘটনা যাই ঘটুক, রহস্যের বেড়াজালে পড়ে কাহিনীটি যে একটি নাটকীয় রূপ পেয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

man hunter animal by somoyerkonthosor 2

দু’পেয়ে টমঃ

দু’পেয়ে টমের কাহিনী বাকীসব মানুষখেকোদের চেয়ে কিছুটা অস্পষ্ট। হাল আমলে বলা মুস্কিল ওঁর ঘটনার কতটুকু সত্যি আর কতটুকুই বা “মিথ”। অতিকায় এই অ্যালিগেটরটি এক দুর্ঘটনায় পড়ে (খুব সম্ভবত লোহার তৈরী কোন মানুষ মারা ফাঁদে পড়ে) তার পেছনের দু’টো পা-ই হারায়। স্বাভাবিক শিকারে অক্ষম হওয়ায় সহজ টার্গেট হিসেবে মানুষকেই বেছে নিয়েছিলো সে। নরম কাঁদায় টমের পায়ের ছাপ স্পষ্ট বোঝা যেত। বিশের দশকের পুরোটা জুড়েই অ্যালাবামা আর ফ্লোরিডার জলাভূমিতে দেখা গেছে টম কে।

প্রায় পনেরো ফুট লম্বা অতিকায় এই দানবটিকে বলা হত নরকের অভিশাপ। গাধা কিংবা গরু কোনটাতেই অরুচি ছিলোনা টমের। তবে প্রথম পছন্দের তালিকায় ছিলো অবশ্যই মানুষ। বিশেষতঃ কাপড় কাঁচতে জলার ধারে যেসব মেয়েরা যেতো তারাই হতো টমের শিকার। বুলেট আক্ষরিক অর্থেই এই দানবটির ওপর কোন প্রতিক্রিয়া রাখতে পারেনি। তার পুরু চামড়া ভেদ করে কোন বুলেটই ঢুকতে পারতো না। আকারে বিশাল হলেও টম ছিলো অসম্ভব ক্ষিপ্র। তার এই ক্ষিপ্রতার জন্যেই কেউ বেশীক্ষণ তাকে দেখতে পেতো না।

এবার আসি এক হতভাগ্য কৃষকের গল্পে। টানা কুড়ি বছর টমের পেছনে লেগে ছিলো বেচারা। বিভিন্ন উপায়ে টমকে মারার চেষ্টা করেছিলো সে। তার কোনটিই কাজে আসেনি। শেষচেষ্টা হিসেবে টমের আনুমানিক বাসস্থান হিসেবে লক্ষ্য করে অনেকগুলো (প্রায় পনেরোটা) ঝুড়ি ডিনামাইট ভর্তি করে ছুঁড়ে দিয়েছিলো কৃষকটি। কোন জলজ প্রানীরই এমন বিস্ফোরনে বেঁচে থাকবার কথা নয়। বাঁচেও নি। যারা ছিলো তাদের সবাই মারা পড়েছিলো। দুর্ভাগ্যক্রমে টম তাদের মধ্যে ছিলো না। বিস্ফোরনের কিছুক্ষণ পরেই ভয়ার্ত চিৎকার শোনা গেল কাছাকাছি কোন এক জায়গা থেকে। শব্দের উৎস লক্ষ্য করে ছুটলো কৃষক এবং তার ছেলে। শেষ মূহুর্তে পৌঁছে শুধু দেখা গেলো টমের হিংস্র চোখ। ডুব দিচ্ছে অতিকায় সরীসৃপটি। ভয়ার্ত গলায় কে চেঁচিয়ে উঠেছিলো সবাই জানলো পরেরদিন। কৃষকের মেয়ের আধ-খাওয়া শরীর জলে ভেসে উঠলে ভয়ে কারো চোখ থেকে পানি পর্যন্ত পড়েনি। পনেরো ফুট লম্বা দানবটির পেটে ওরকম তিনটে মেয়েও খেয়ে ফেলবার জায়গা আছে, কিন্তু কৃষকের মেয়েটিকে মাত্র অর্ধেক খাওয়া হয়েছে। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে এটা নিছকই প্রতিশোধমূলক ঘটনা। এত বছর বাদে সত্যিই বলা কঠিন কোন ঘটনা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা। টমকে পরের কয়েক দশক বীরদর্পে জলাভূমিতে ঘুরতে দেখা গেছে। কাঁদার ওপরে ওর পায়ের ছাপ দেখলে যে কেউই চিনতে পারতো। বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন লোকজন তিন/চার মাস পরপর টমকে দেখেছে বলে জানাতো। কেউ দেখতো পায়ের ছাপ। কেউ বলতো অতিকায় এক কুমিরকে সাঁতার কাটতে দেখেছে। কেউ জানাতো ক্রুদ্ধ গর্জন শুনেছে। সবচেয়ে মজার ঘটনা হলো টমের রহস্য বিশ দশকের দিকে হলেও আশি দশকের দিকেও এসেও টমকে অনেকেই জীবিত দেখেছে। সেই এক রকমই বিশাল। দুটো পা। তবে বয়সের ভারে খানিকটা ধীর গতির। বহু সার্চ পার্টি আর শিকারী দল টমের পেছনে লেগে ছিলো। পাঁচ কিংবা দশ বছর নয়, অর্ধ শতাব্দীরও বেশী সময়। কিন্তু টমকে আর কখনোই ধরা সম্ভব হয়নি। আজও রহস্যে ঢেকে আছে টমের অন্তর্ধান।

কেসাগাকেঃ

সাংকেবেতসু, হোক্কাইডো, জাপান। ১৯১৫ সালের এক শরৎ। সাংকেবেতসু তখন হোক্কাইডোর নামকরা বর্ধিষ্ণু গ্রাম হিসেবে পরিচিত। গাঁয়ের জনসংখ্যা যদিও কম, তবুও এখানকার উর্বর জমিতে ফসল উৎপন্ন হতো খুব তাড়াতাড়ি। তাছাড়াও আশেপাশে বিস্তীর্ণ জঙ্গল হওয়ায় বাঁশ-কাঠ সহজলভ্য ছিলো। সে কারণেও সাংকেবেতসুর আলাদা নামডাক ছিলো, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরবর্তীতে সাংকেবেতসু পরিচিতি পায় কুখ্যাত এক মানুষখেকোর জন্যে।

man hunter animal by somoyerkonthosor 3

জঙ্গল কাছেই হওয়ায় প্রায়ই বুনো জন্তু-জানোয়ারের দল ফসল ক্ষেতে হামলা চালাতো। মানুষের সাড়া পেলে অধিকাংশ জানোয়ারই পালিয়ে যেত, কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলো অতিকায় এক বাদামী ভালুক। একদিন বেপরোয়া হয়ে উঠলে ওর ওপর গুলি চালায় দুই কৃষক। আহত হয়ে পাহাড়ের দিকে পালিয়ে গেলো ভালুকটি। গ্রামবাসীদের ধারণা ছিলো জন্মের শিক্ষা হয়েছে “কেসাগাকে”-র (ভালুকটাকে পরবর্তীতে এ নামেই ডাকতো সবাই), এদিককার পথ আর মাড়াবে না ও। কিন্তু শীগগিরই সবার ধারণা ভুল প্রমানিত হয়েছিলো।

সে বছর ডিসেম্বরেই আবার ফিরে এলো ভালুকটি। “ওটা” পরিবারে হামলা করলো। সে সময় “ওটা” পরিবারের সব পুরুষেরা শহরে গিয়েছিলো ফসল বিক্রীর জন্যে। বাসায় ছিলো কৃষকের স্ত্রী আর সদ্যোজাত এক বাচ্চা। কেসাগাকে প্রথমেই হামলা করলো বাচ্চাটার ওপরে। এক থাবাতেই মেরে ফেললো তাকে, তারপরে এগিয়ে গেলো কৃষকের স্ত্রীর দিকে। কৃষকের স্ত্রীর পালাবার জায়গা ছিলো না। ক্রমাগত সাহায্যের আশাতে চেঁচিয়ে যাচ্ছিলো বেচারী, কিন্তু “ওটা” পরিবারের খামারবাড়ীর আশেপাশে খুব একটা ঘনবসতী ছিলো না। গাঁয়ের পুরুষেরাও সব চলে গিয়েছিলো শহরে। কৃষকের স্ত্রীর সাহায্যে এগিয়ে আসবার মতন ছিলো না কেউই। “ওটা” পরিবারের পুরুষেরা শূন্য বাড়িতে ফিরে এলে মুখোমুখি হলো ভয়াবহ এক দৃশ্যের। বাড়ির দেয়ালময় রক্ত আর মাংসের ছড়াছড়ি। বাচ্চাকে বাঁচাবার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলো কৃষকের স্ত্রী। জ্বলন্ত চেলাকাঠ ছুঁড়ে মারা হয়েছিলো ভালুকটির দিকে। কাজ হয়নি মোটেও বরঞ্চ ক্ষেপে গিয়ে কৃষক স্ত্রীকে টেনে হিঁচড়ে জঙ্গলে নিয়ে গিয়েছে দানবটি। “ওটা” পরিবারের সাহায্যার্থে খুব দ্রুতই জনা ত্রিশেক লোক জড়ো হয়ে বেরিয়ে পড়লো জঙ্গলে। সৌভাগ্যবশতঃ কেসাগাকের দেখা মিললো খুব কাছেই। গুলি করা হলেও নিমেষেই অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো জানোয়ারটি। হতভাগ্য মহিলার দেহাবশেষ উদ্ধার করে সৎকারের ব্যবস্থা করা হলো।

কিছুদিনের মধ্যেই কেসাগাকে আবার “ওটা” খামারবাড়ীতে ফিরে এলো। এবার নতুন কোন শিকারের আগেই ওর পেছনে পাঠানো হলো সশস্ত্র নিরাপত্তা রক্ষীদের। কিন্তু এতে করে অরক্ষিত রয়ে গেলো গাঁয়ের আরো কিছু পরিবার। ঠিক এ সুযোগটির জন্যেই অপেক্ষা করছিলো চতুর মানুষখেকোটি। এবার তার হামলার শিকার হলো “মিয়োকে” পরিবার। তর্জন গর্জন করে বাড়ির সবাইকে তটস্থ রাখলো কিছুক্ষণ, একসময় বাড়ির দরজা ভেঙ্গে ঢুকে পড়লো। কেউ কেউ পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও দুটো বাচ্চা আর একজন গর্ভবতী মহিলা কেসাগাকের শিকারে পরিণত হলো। হামলায় বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী গর্ভবতী মহিলাটি তার অনাগত সন্তানটির প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে কাঁদছিলো। বলা বাহুল্য, মানুষখেকোটির মনে দয়ার উদ্রেক হয়নি। এদিকে নিরাপত্তা রক্ষীরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে দ্রুতই ফিরে এসেছিলো, কিন্তু যা হবার তা ততক্ষণে হয়েই গেছে। রক্তাক্ত দুটো বাচ্চার লাশ সহ মহিলার লাশে কসাইখানার মতন হয়ে গেছে “মিয়োকে” হাউজ। এ ঘটনার পরে গাঁয়ে থাকা নিরাপদ মনে করলো না অনেকেই। নিরাপত্তা রক্ষীরাও নিজেদের পাহাড়ার পোস্ট ছেড়ে দিলো পালালো।

ইয়ামামোটো নামের বিখ্যাত এক ভালুক শিকারীকে শীগগিরই তলব করা হলো। নিজের বন্দুক বন্ধক রেখে মদ খাবার পয়সা যোগাড় করেছিলো সে, কাজেই গ্রামবাসীকে সাহায্য করতে অপারগতা প্রকাশ করা ছাড়া গত্যান্তর ছিলো না তার। কেসাগাকের আক্রমণ কিন্তু থেমে থাকলো না। কিছুদিনের মধ্যেই হতভাগ্য এক কৃষক, যে ভালুক আক্রমনের নেতৃত্বে ছিলো, কেসাগাকের হামলায় আহত হয়ে জীবন বাঁচাতে নদীতে ডুবে মারা গেলো। এ ঘটনার পরে দলে দলে লোকজন গ্রাম ছেড়ে পালাতে লাগলো। বস্তুতঃ সাংকেবেতসু আক্ষরিক অর্থেই একটি ভৌতিক গ্রাম হয়ে পড়লো। এর মধ্যেই অতি সাহসী কিছু যুবক সিদ্ধান্ত নিলো এর শেষ দেখে ছাড়বে। ডিসেম্বরের ১৪ তারিখে তাদের সাথে সেই বিখ্যাত শিকারী ইয়ামামোটো যোগ দিলে তাদের সাহস আরও বেড়ে যায়। অবশেষে ইয়ামামোটোর হাতেই পরাস্ত হয় কেসাগাকে। প্রায় ১০ ফুট লম্বা ৩৮০ কেজি ওজনের এই দানবটির কথা চিন্তা করেই আজও শিউরে ওঠেন জাপানী মানুষ। জাপানের ইতিহাসের ভয়ংকরতম ভালুক আক্রমন হিসেবে ধরা হয় এটাকে।

সম্পাদনা ও তথ্যসংগ্রহ- নীলপথিক

(তথ্যসূত্রঃ লিস্টভার্স এবং উইকি)।