ঝিনাইদহে ৭ মাসে ৩৪ খুনের ঘটনা

১১:০০ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, আগস্ট ৯, ২০১৬ খুলনা

আরাফাতুজ্জামান, ঝিনাইদহ প্রতিনিধিঃ

২০১৬ সালের গত ৭ মাসে ঝিনাইদহ জেলায় ৩৪টি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। ব্যক্তিগত কোন্দলের কারণেই এসব খুনের ঘটনা ঘটছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, জেলায় ৭ মাসের হত্যাকান্ডের মধ্যে আছে- তিন শিশুকে পুড়িয়ে হত্যা, সেবায়েত, পুরোহিত, হোমিও চিকিৎসককে কুপিয়ে হত্যা, ৭ জন বন্ধুকযুদ্ধে নিহত, ভাগ্নের হাতে মামা, ভাতিজার হাতে চাচা, নির্বাচনী সহিসংতা আওয়ামী লীগ সমর্থক নিহত, ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে যুবক নিহত, গণপিটুনিতে নিহত, সন্ত্রাসীকে জবাই করে ও নারীদের শ্বাসরোধে হত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে।

পুলিশ সুপার অফিস তথ্যমতে, সদর উপজেলায় এক নারী ও এক যুবকসহ ১১ জন, শৈলকুপা উপজেলা তিন শিশু দুই নারীসহ ৯ জন, কালীগঞ্জ উপজেলায় এক যুবকসহ ৪ জন, হরিণাকুন্ডু উপজেলায় এক নারীসহ ৬ জন ও মহেশপুর উপজেলায় এক যুবকসহ ৪ জন।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ জুলাই ঝিনাইদহ সদর উপজেলার আড়–য়াকান্দি গ্রামে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে শৈলকুপা উপজেলার পুটিমারি গ্রামের লুৎফর রহমানে ছেলে সাইফুল ইসলাম মামুন (২৫) নামে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র নিহত।
৪ জুলাই শৈলকুপা উপজেলায় আব্দুল হান্নান নামে এক যুবকের গলাকাটা মরদেহ ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া সীমান্ত থেকে উদ্ধার করে পুলিশ।
২ জুলাই সদর উপজেলার মধুপুর কবরস্থানে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ইবনুল ইসলাম পারভেজ (২৯) নামে এক শিবির নেতা নিহত হয়। ১৬ জুন রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির ৯ নম্বর রোডের ১১ নম্বর বাসার ৬ তলা থেকে সাদা পোশাকের লোকজন তুলে নিয়ে যায় পারভেজকে এবং পুলিশ তাকে গুলি করে হত্যা করেছে বলে পরিবার জানান।

khun১ জুলাই সদর উপজেলার উত্তর কাস্টসাগরা গ্রামে স্থানীয় শ্রী শ্রী রাধামদন গোপাল মঠের সেবায়েত শ্যামানন্দ দাস ওরফে বাবাজিকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। একই দিনে সদর উপজেলার তেতুলবাড়িয়া গ্রামের মাঠে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে শহীদ আল মাহমুদ ও আনিচুর রহমান নামে দুই শিবির কর্মী নিহত হয়। ১৩ জুন সদর উপজেলার নিজ বাড়ি বদনপুর থেকে পুলিশ পরিচয়ে সাদা পোশাকের লোকজন শহীদ আল মাহমুদ তুলে নিয়ে যায় বলে পরিবারের দাবি।
২২ জুন শৈলকুপার বড়দা গ্রামে রোজিনা আক্তার তমা নামে এক গৃহবধূকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ ও নির্যাতন করে হত্যা করে একটি প্রভাবশালী মহল।
৬ জুন হরিণাকুন্ডু উপজেলাার কাপাসহাটিয়া ইউনিয়নের দাড়িয়াপুর গ্রামে আলফাজ উদ্দীন মন্ডলকে কুপিয়ে হত্যা করে ভাগ্নে ও ভাতিজারা।
৭ জুন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার করাতিপাড়া গ্রামের পুরোহিত আনন্দ গোপাল গাঙ্গুলীকে কুপিয়ে ও জবাই করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।
৫ মে হরিণাকুন্ডু উপজেলার ফলসী ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ দুই প্রার্থীর সংঘর্ষে ফলসী গ্রামে দিদারুল ইসলাম মন্ডলের মৃত্যু হয়।
১০ মে ঝিনাইদহের মহেশপুরের বজরাপুর গ্রামে জমির বিরোধ নিয়ে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ছোট ভাই মোহন বড় ভাই মজিবর রহমান খোকনকে পিটিয়ে হত্যা করে।
১২ মে নির্বাচনী সহিংসতায় হরিণাকুন্ডু উপজেলার ফলসী গ্রামে আওয়ামী লীগের দু’গ্র“পের সংঘর্ষে আহত মুলায়েম হোসেন ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।
গত ২৫ এপ্রিল শৈলকুপা উপজেলার ধাওড়া গ্রামে যৌতুক না দেওয়ায় গৃহবধূ যমুনা বেগমকে পাশবিক নির্যাতন করে হত্যা করে তার স্বামী নাজের আলী ।
২৩ এপ্রিল হরিণাকুন্ডু উপজেলা পরিষদ এলাকায় নিপা খাতুন নামে এক গৃহবধূকে শ্বাসরোধে হত্যা করে স্বামী ঠান্ডু আলী।
২২ এপ্রিল শৈলকুপা উপজেলার চাঁদপুর গ্রামে জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে ভাইয়ের হাতে ভাই শামিম মন্ডল খুন হয়।
১৯ এপ্রিল মহেশপুর উপজেলার গৌরীনাথপুর গ্রামে গরু চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে নুর ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে হত্যা করে এলাকাবাসী।
১৩ এপ্রিল দুই শিবির নেতা যশোর এমএম কলেজের অনার্স বাংলা ৩য় বর্ষের ছাত্র আবুজার গিফারি ও ঝিনাইদহ সরকারি কেসি কলেজের অনার্স ব্যবস্থাপনা দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র শামীম হোসেনের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
৮ এপ্রিল সদর উপজেলার ছয়াইল গ্রামে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আওয়ামী লীগের দুই গ্র“পের মধ্যে সংঘর্ষে আকামীর হোসেন নামে আওয়ামী লীগ সমর্থক ঘটনাস্থলেই মারা যায়।
৩ এপ্রিল ঝিনাইদহ পৌর এলাকার বড় কামারকুন্ডু থেকে সীমা খাতুন নামে এক গৃহবধূকে হত্যা করে তার স্বামী রয়েল হোসেন।
১৪ মার্চ কালীগঞ্জে আব্দুর রাজ্জাক নামে এক হোমিও চিকিৎসককে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।
৪ মার্চ হরিণাকুন্ডু উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের হিঙ্গারপাড়া গ্রামের শোষপাড়া মাঠ থেকে জসিম উদ্দিন নামে এক শিবির সভাপতির গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
২৫ ফেব্র“য়ারি শহরের আদর্শপাড়ায় ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে নয়ন হোসেন নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষরা।
২৪ ফেব্র“য়ারি কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার ফুলবাড়ি গেট এলাকা থেকে অজ্ঞাত যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
২৩ ফেব্র“য়ারি মহেশপুর উপজেলার হলিদাপাড়ায় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে চন্তু হোসেন (২৮) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়।
১৮ ফেব্র“য়ারি নিখোঁজের চার দিন পর মহেশপুর উপজেলার সেজিয়া গ্রামের গম ক্ষেত থেকে হাকিমুল ইসলাম পেনু নামে এক সেলুন কর্মীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
৪ ফেব্র“য়ারি হরিণাকুন্ডু উপজেলার ঘোড়াগাছা গ্রামের মাঠে আনোয়ার হোসেন আনু নামে এক সন্ত্রাসীকে জবাই করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
৩১ জানুয়ারি শৈলকুপা উপজেলার বিজুলীয়া গ্রাম থেকে লিটন বিশ্বাস নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
১৫ জানুয়ারি শৈলকুপা উপজেলার হাবিবপুর গ্রামের শাহিন শেখ নামে এক যুবকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
৭ জানুয়ারি সদর উপজেলার বেলেখাল বাজারে ছমির উদ্দিন খাজা নামে এক হোমিও চিকিৎসককে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
৫ জানুয়ারি সদর উপজেলার রাধানগর গ্রামে নাসির উদ্দীন বিশ্বাস নামে এক ভাইয়ের হাতে আরেক ভাই খুন হয়।

এবং ২ জানুয়ারি শৈলকুপা শহরের কবিরপুর নতুন ব্রীজপাড়া এলাকায় আগুনে দুই ভাগ্নে সহোদর মোস্তফা সাফিন ও মোস্তফা আমীন এবং ভাতিজাকে মাহীনকে পুড়িয়ে হত্যা করে ঘাতক ইকবাল হোসেন।

ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজবাহার আলী শেখ জানান, বিশেষ কয়েকটি হত্যাকান্ড ছাড়া বাকি সবই ব্যক্তিগত বিরোধের জের ধরে ঘটেছে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া ২০১৬ সালের ৭ মাসে যেসব হত্যাকান্ড ঘটেছে তার জন্য সামাজিক ও পারিবারিক দ্বন্দ্বই দায়ী।
প্রায় সবকটি হত্যাকান্ডে খুনিদের আটক করা হয়েছে। বাকীদের ধরতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলে তিনি জানান।

Loading...