সংবাদ শিরোনাম
নরসিংদীতে প্রথমবারের মতো সর্বাধুনিক কার ওয়াশ ও সার্ভিসিং সেন্টার উদ্বোধন | রাজধানীতে ছিনতাইয়ের প্রস্তুতিকালে ‘ফইন্নি গ্রুপের’ ৬ সদস্য আটক | এবার চমেক চিকিৎসকদের জন্য ‘নোবেল’ চাইলেন মেয়র নাছির | তানোরে অবৈধ এসটিসি ব্যাংক সিলগালা | ফাঁড়িতে আসামির মৃত্যু: পুলিশ-এলাকাবাসীর সংঘর্ষে আহত ৩৩, পাঁচ পুলিশ প্রত্যাহার | লালমনিরহাটে সহকারী পরিচালকের বেত্রাঘাতে স্কুলছাত্রী অজ্ঞান | সাগরে মৎস আহরণে নিষেধাজ্ঞা, ফিশারিঘাট হারিয়েছে চিরাচরিত রুপ | ‘আবরার পানি খাইতে চাইলে পানি দেওয়া হয় নাই’ | নান্দাইলে নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ রাখায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা | মাগরিবের আজানের ২০ মিনিটের মধ্যে ছাত্রীদের হলে ঢোকার নির্দেশ! |
  • আজ ২রা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ঈদকে সামনে রেখে চলনবিলাঞ্চলে মোটাতাজাকরণ করা হচ্ছে কোরবানির গরু

২:২৫ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, আগস্ট ৯, ২০১৬ দেশের খবর, রাজশাহী

আশরাফুল ইসলাম রনি, তাড়াশ প্রতিনিধি: ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে চলনবিলাঞ্চলের সিরাজগঞ্জ ও পাবনার কয়েকটি উপজেলায় মোটা তাজাকরণ করা হচ্ছে কোরবানির গরু। এ অঞ্চলের খামাারী ও চাষিরা প্রতিযোগীতা মূলকভাবে প্রাকৃতিক উপায়ে দেড় থেকে দুই লাখ গরু মোটাতাজা করছেন। ভারত থেকে গরু আমদানি কমে যাওয়া এ অঞ্চলের গো-খামারীরা এ বছর বেশি লাভের আশা করছেন। তবে ভারত ও নেপাল থেকে গরু আমদানি হলে দেশি গরুর দামে কমে যাবে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

goru

প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব মতে দেশে বর্তমানে দুই কোটি ৩৬ লাখ গরু আছে। এর মধ্যে প্রায় ২৫ লাখ জবাই করার উপযোগী। কোরবানির ঈদে ৩৬ লাখ গরুর চাহিদা তৈরি হতে পারে। সেই হিসেবে ১০ লাখ গরুর ঘাটতি হতে পারে। প্রতি বছর ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে আসা গরু এই ঘাটতি পুরণ করে থাকে। দীর্ঘদিন ভারত থেকে গরু আমদানি বন্ধ থাকায় চাহিদা মতো গরু পাওয়া নিয়ে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে ঈদে কোরবানির পশুর সঙ্কট দেখা দেবে বলে মনে করছেন গরু ব্যবসায়ীরা।

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাণী সম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, বাঘাবাড়ী মিল্কভিটাকে কেন্দ্র করে ১২ সহস্রাতাধিক গোখামার গড়ে উঠেছে। গ্রামগুলোর প্রায় প্রতিটি বাড়ীতে গবাদিপশু পালন কার হয়। এ অঞ্চলে গোখামারের পাশাপাশি ১০ সহস্রাতাধিক ব্যবসায়ী ও কৃষকের গোয়ালে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার দেড় থেকে দুই লাখ গরু প্রাকৃতিক উপায়ে মোটাতাজা করা হচ্ছে।

কোরবানির ঈদ বাজারে পাবনা, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, মুন্সিগঞ্জ থেকে বেশি গরু আমদানি হয়। চলনবিলের সিরাজগঞ্জের সদর, শাহাজাদপুর, উল্লাপাড়া, তাড়াশ, বেলকুচি, চৌহালী, রায়গঞ্জ ও পাবনার সদর, বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর, সুজানগর, ঈশ্বরদী, চাটমোহর, আটঘড়িয়া, ভাঙ্গুড়াসহ এ অঞ্চলের খামারীরা জানান, বাজারে প্রকৃতিক নিয়মে মোটাতাজা গরুর মধ্যে পাবনা ব্রিড, অষ্ট্রেলিয়ান-ফ্রিজিয়ান ব্রিড, ইন্ডিয়ান হরিয়ান ব্রিড, পাকিস্তানি সাহিয়াল ব্রিড। তবে এর পাশাপাশি রয়েছে স্থানীয় ব্রিডিং পদ্ধতি যা লোকাল ক্রস ব্রিড নামে পরিচিত। এসব ব্রান্ডের সব গরুই মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়া বড় করে বাজারে তোলা হয়। গরু মোটাতাজাকরণ একটি নিয়মিত ও প্রচলিত পদ্ধতি। বিশেষ পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত ইউরিয়া, লালিগুড় ও খড়ের একটি বিশেষ মিকচার আট দিন কোন পাত্রে বন্ধ করে রেখে তা রোদে শুকিয়ে গরুকে খাওয়াতে হয়। তিন মাস এটা খাওয়ালে গরু খুব দ্রুত মোটাতাজা হয়ে ওঠে। এই গরুর মাংস মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়।

খামারী মালিকরা জানান, সাধারণত গরুকে প্রাকৃতিক পন্থায় মোটাতাজা ও সুস্থ রাখতে খড়, লালি গুর, ভাতের মার, তাজা ঘাস, খৈল, গম, ছোলা, খোসারী, মাসকালাই, মটরের ভূসি সহ বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার দেয়া হয়। গরুর জন্য এটা বিজ্ঞানসম্মত। এ নিয়মে গরু মোটাতাজা করা হলে ক্রেতা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন না। এ ধরনের গরুর মাংস খেয়ে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। প্রাকৃতিক উপায়ে মোটাতাজা গরুর চাহিদা ও দাম ভাল পাওযা যায়।

খামারী মালিক আব্দুল করিমসহ অনেকইে জানান, ঈদুল আজহা সামনে রেখে এ অঞ্চলের কিছু কিছু অসাধু মওসুমি ব্যবসায়ী গরুকে মোটাতাজা করতে ব্যবহার করছে নানা ঔষুধ। তারা রোগাক্রান্ত গরু অল্প টাকায় কিনে মোটাতাজা করে বেশি লাভে বিক্রি করে। অধিক লাভের আশায় গরু মোটাতাজা করতে ব্যবহার করা হচ্ছে চোরাপথে আসা ভারতীয় ডেক্সামেথাথন, ষ্টেরয়েড, হরমোন, উচ্চমাত্রার রাসায়নিক। এসব ঔষুধ বিভিন্ন ফার্মেসি গবাদিপশু চিকিৎসালয়ে পাওয়া যায়। ফার্মেসি ব্যসায়ীরা সহজেই এসব ঔষুধ গরু ব্যসায়ীদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। এসব ঔষুধ গরুকে খাওয়ালে কয়েক মাসের মধ্যে গরুর শরীর ফুলে মোটা হয়ে যায়। এই গরু দেখতে সুন্দর হয়। এ বছর কৃত্রিম পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজাকরণের হার অনেক কমে গেছে।

তবে বিশেষজ্ঞের মতে, পাম, ডেক্সামেথাথন ও ষ্টেরয়েড ট্যাবরেট খাওয়ানোর পর গরুর চামরার ভেতরে বাড়তি পানির স্তর জমে গরুকে বেশি মোটাতাজা ও সবল দেখায়। এতে কমে যায় গরুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। পাম বড়িতে ক্ষতিকর ষ্টেরয়েড থাকে। ষ্টেরয়েড গরুর দেহে মারাত্মক বিষ ছড়িয়ে দেয়। এতে গরুর লিভার নষ্ট হয়ে যায়। ষ্টেরয়েড মিশ্রিত গরুর মাংস মানব শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এটি এমন পদার্থ যা মাত্রাতিরিক্ত তাপেও ধ্বংস হয় না।

এ ছাড়া শাহজাদপুরের কয়েকজন খামারী জানান, ইনজেকশন বা ঔষুধ দিয়ে দ্রুত মোটাতাজা করা গরুর গায়ে শক্তি থাকে না, মাদকাসক্ত মানুষের মতো ঝিমায়। অনেক সময় মানুষের মতো ষ্ট্রোক করে মারা যায় এসব গরু। বিগত দুই বছর এ অঞ্চলের খামারী ও চাষিরা কৃত্রিম পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজা করে বাজারে বিক্রি করতে না পেরে লোকসান দিয়েছেন। ফলে এ বছর সিরাজগঞ্জ ও পাবনার শতকরা ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ খামারী ও চাষি প্রাকৃতিক নিয়মে গরু মোটাতাজা করছেন বলে তারা জানিয়েছেন।

খামারিরা আরো বলেন, স্টেরয়েড খাওয়ানো গরু চেনার উপায় হলো যেসব গরু নীরব থাকে, ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারে না। এসব গরুর পেছনের দিকের উরুর পেশিবহুল জায়গায় আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিলে তা দেবে যাবে। কারন বাইরে থেকে গোশত মনে হলেও গোশতের সাথে প্রচুর পরিমান পানি থাকে। কৃত্রিমভাবে মোটা করা এসব গরুকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জবাই না করলে মারা যায়।

তাড়াশ উপজেলার নওগা হাটের গরু ব্যবসায়ী সাবেদ আলী বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর রাজশাহী ও চাপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু মহিষ আসছে। যারা বৈধ ব্যবসায়ী তারা সরকারকে রাজস্ব দিয়ে করিডোরের মাধ্যমে পশু আমদানি করছেন। প্রতিদিনই বাড়ছে ভারতীয় গরু মহিষের আমদানি। ঈদকে ঘিরে নেপাল ও ভুটান থেকেও বৈধ পথে গরু আসবে। ফলে দেশে কোরবানির পশু সঙ্কটের কোন আশঙ্কা নেই বলে তিনি জানিয়েছেন।

শাহাজাদপুর উপজেলার আঙ্গারু গ্রামের খামারী আব্দুল মান্নান জানান, তিনি গত বছর প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে ২০টি গরু মোটাতাজা করে ঈদের আগে বিক্রি আড়াই লাখ টাকা লাভ করেন। এবারও তিনি প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে ৩৫টি গরু মোটাতাজা করছেন। তবে কিছু কিছু অসাধু মওসুমি ব্যবসায়ী কৃত্রিম উপায়ে গরু মোটাতাজা করছে এতে খামারী ও চাষিদের বদনাম হচ্ছে। এদিকে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ভারতীয় গরু মহিষ আমদানি হওয়ায় দেশের গোখামারী ও চাষিরা লোকসানের মুখে পড়তে পারেন বলে তিনি আশঙ্ক প্রকাশ করেছেন।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ মোঃ আব্দুল বাসেত খান বলেন, প্রাকৃতিক উপায়ে মোটাতাজা গরুর মাংস খেয়ে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। গরুকে ষ্টেরয়েড জাতীয় ঔষুধ খাওয়ালে তা যেমন গরুর জন্য ক্ষতিকর, তেমনি ওই গরুর মাংস বিষাক্ত হয়ে পড়ে। এই মাংস ফরমালিনের মতো মানুষকে ধীরে ধীরে নিস্তেজ করে ফেলে। এতে মানুষ লিভার, কিডনি, হৃদযন্ত্র, পুরুষত্ব ও মতৃত্বহীনতাসহ মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়।