সংবাদ শিরোনাম
  • আজ ৬ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

কক্সবাজারে কৃএিম উপায়ে গরু মোটাতাজাকরন : ঈদকে সামনে রেখে জমে ওঠেছে কোরবানীর হাট

১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, সেপ্টেম্বর ৩, ২০১৬ চট্টগ্রাম, দেশের খবর

জামাল জাহেদ, কক্সবাজার থেকে: কক্সবাজার জেলার সবকটি উপজেলায় গরু মোটাতাজাকরন কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে অসাধু ব্যবসায়িরা। ইনজেকশন প্রয়োগ ও বিভিন্ন ট্যাবলেট খাইয়ে গরু মোটাতাজাকরণে প্রতিযোগিতায় নেমেছেন জেলার খামারি ও ব্যবসায়ীরা। জনস্বাস্ব্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হলেও আসন্ন ঈদুল আযহাকে কেন্দ্র করে অধিক লাভের আশায় তারা এ ধরনের ক্ষতিকর কাজ করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

goru-hat

গ্রাম্য পশু ডাক্তাররা গরু মোটাতাজা করতে ইনজেকশন ও ট্যাবলেট নিয়ে ছুটছেন খামারি ও গরু ব্যবসায়ীদের বাড়ি বাড়ি। আর অল্প দিনে অধিক লাভের আশায় তারা নিষিদ্ধ ইনজেকশন প্রয়োগ ও পাম বড়ি খাওয়াচ্ছেন।

টেকনাফের সাহাপরদ্বীপ গ্রামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন গরু ব্যবসায়ী জানান, সাধারণত কোরবানি ঈদের দুই-তিন মাস আগ থেকেই হাট থেকে কম দামে গরু কিনে খাবারের সাথে ক্ষতিকর বড়ি খাওয়ানো হয়। মোটাতাজার জন্য নিষিদ্ধ যে স্টেরয়েড বড়ি খাওয়ানো হচ্ছে তা পার্শ্ববর্তী দেশ মায়ানমার ও ভারত থেকে অবৈধভাবে আমদানি করা হচ্ছে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলেন, নিষিদ্ধ ওইসব বড়ি গরুকে খাওয়ালে হৃদযন্ত্র দুর্বল হয় এবং হার্ট অ্যাট্যাকে মারা যায়। খামার মালিকদের নিষেধ করার পরও তারা নাকি মুনাফার লোভে এসব বড়ি গরুকে খাওয়াচ্ছে। তবে অভিযোগ কোথাও পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরো জানান, স্টেরয়েড জাতীয় ঔষুধ খাওয়ানোর ফলে গরুর দেহে অধিক মাত্রায় পানি ধারণ করায় শরীর ফুলে ওঠে ও স্বাস্থ্যবান মনে হয়। এ ধরনের গরুর মাংস খাওয়া মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

কক্সবাজার জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, মিল্কভিটাকে কেন্দ্র করে জেলার গ্রামগুলোতে অধিকাংশ বাড়িতে গবাদিপশু পালন করা হয়। এ অঞ্চলের শতাধিক খামার ও ১ সহস্রাধিক ব্যবসায়ী ও কৃষকের গোয়ালে প্রায় ১০ কোটি টাকার এক থেকে সোয়া লাখ গরু কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, সাধারণত গরুকে প্রাকৃতিক পন্থায় মোটাতাজা ও সুস্থ রাখতে খড়, তাজা ঘাস, খৈল ও ভূষিসহ পুষ্টিকর খাবার দেয়া হয়। গরুর জন্য এটা বিজ্ঞানসম্মত। এ নিয়মে গরু মোটাতাজা করা হলে ক্রেতা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন না। এ ধরনের গরুর মাংস খেয়ে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। কিন্ত গত ৮-৯ বছর ধরে অতি মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ী ও খামারীরা প্রাকৃতিক উপায়ে গরু মোটাতাজা না করে কৃত্রিম উপায়ে বিভিন্ন ক্ষতিকর ঔষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে মোটাতাজা করছে।

অবাধে ব্যবহার করা হচেছ নানা ব্রান্ডের পাম, ডেক্সামেথাথন ও স্টেরয়েডের মতো ভয়ানক ক্ষতিকর উপাদানের ঔষুধ। এসব ঔষুধ গরুর দেহে প্রয়োগ করে রোগাক্রান্ত, কম ওজন ও চিকন স্বাস্থ্যের গরু মোটাতাজা করছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পাম, ডেক্সামেথাথন ও স্টেরয়েড ট্যাবলেট খাওয়ানোর পর গরু চামড়ার ভেতরে বাড়তি পানির স্তর জমে গরুকে বেশি মোটাতাজা ও সবল দেখায়। এতে কমে যায় গরুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। পাম বড়িতে ক্ষতিকর স্টেরয়েড থাকে। স্টেরয়েড গরুর দেহে মারাত্মক বিষ ছড়িয়ে দেয়। এতে গরুর লিভার নষ্ট হয়ে যায়। স্টেরয়েড মিশ্রিত গরুর মাংস ও লিভার মানব শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এটি এমন পদার্থ যা মাত্রাতিরিক্ত তাপেও ধ্বংস হয় না। এখন মোটাতাজা গরু মানেই মানুষের জন্য তাজা বিষ।

উখিয়ার গরুর ব্যাপারী কামাল বলেন, এখন বড় বড় গরুর সে রকম তেজ নেই। মনে হয় মাদকাসক্ত মানুষের মতো ঝিমিয়ে থাকে। বর্তমানে এ অঞ্চলের শতকরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ গরুই ইনজেকশন বা ঔষুধ দিয়ে দ্রুত মোটাতাজা করা হয়।

প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বাজারে এ ধরনের মোটাতাজা গরুর মধ্যে রয়েছে পাবনা ব্রিড, অস্ট্রেলিয়ান-ফ্রিজিয়ান ব্রিড, ইন্ডিয়ান হরিয়ান ব্রিড, পাকিস্তানি সাহিয়াল ব্রিড। তবে এর পাশাপাশি রয়েছে স্থানীয় ব্রিডিং পদ্ধতি যা লোকাল ক্রস ব্রিড নামে পরিচিত। এসব ব্রান্ডের সব গরুই মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়ায় বড় করে বাজারে তোলা হয়।

মিল্কভিটার পশু চিকিৎসক ডাঃ সাইফুল বলেন, ডেক্সামেথাথন জাতীয় ঔষুধ পশু বা মানুষকে খাওয়ালে এক সপ্তাহের মধ্যে মোটাতাজা হবে। তবে এই মোটাতাজা বেশি দিন স্থায়ী হবে না। বড়জোর দুই থেকে তিন মাস।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ নুরুল আলম বলেন, গরুকে স্টেরয়েড জাতীয় ঔষুধ খাওয়ালে তা যেমন গরুর জন্য ক্ষতিকর তেমনি ওই গরুর মাংসও বিষাক্ত হয়ে পড়ে। এই মাংস ফরমালিনের মতো মানুষকে ধীরে ধীরে নিস্তেজ করে ফেলে। এতে মানুষ লিভার, কিডনি, ক্যান্সার, হৃদরোগসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন অনুষদের ডিগ্রীপ্রাপ্ত রামু উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামাল উদ্দিন সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, স্টেরয়েড ও ডেক্সামেথাথন জাতীয় ঔষুধ গরুর শরীরের কোষকে দ্রুত বিভাজিত করে। অনেক ক্ষেত্রে কোষে পানির পরিমাণ বেড়ে যায়, গরু মোটা দেখায়। এসব ইনজেকশন ব্যবহার না করেও বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজা করে অধিক লাভবান হওয়া সম্ভব।