সৃজনশীল প্রশ্ন কি শিক্ষার মান বৃদ্ধি করে !

এস.এস.সি বিষয়ক তথ্য জানতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে যান। সেখানে তিনি এক বিজ্ঞপ্তি দেখে থমকে যান, বিজ্ঞপ্তিটি হল: ২০১৭ সাল থেকে একটি
করে সৃজনশীল প্রশ্নের জবাব বেশি দিতে হবে।

উদহারন  (১) ঃ
আরিফ (ছদ্দনাম) এবারে দশম শ্রেণিতে উঠেছে। সামনে এস.এস.সি পরিক্ষা,
পড়াশুনায় খুবই মনোযোগ তার। কিন্তু হঠাৎ কিছুদিন ধরেই বিছানায় শুয়ে-বসে
সময় পার করছে সে। পড়াশুনাও ঠিকভাবে করছে না। চেহারায় কিছুটা হতাশা ভর
করেছে। আরিফের মা-বাবা বেশ চিন্তায় পরে গিয়েছিলেন। মানসিক ডাক্তারও
দেখানো হয়। তিনি কিছু পরামর্শ দেন। এর কিছুদিন পর আরিফের বাবা-মা ধরতে
পারেন, আরিফের মন খারাপের কারন। আরিফের বাবা আবু নাসের (ছদ্দনাম) একদিন
এস.এস.সি বিষয়ক তথ্য জানতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে যান। সেখানে
তিনি এক বিজ্ঞপ্তি দেখে থমকে যান, বিজ্ঞপ্তিটি হল: ২০১৭ সাল থেকে একটি
করে সৃজনশীল প্রশ্নের জবাব বেশি দিতে হবে। তিনি তাৎক্ষানিক ভাবে তার
ছেলের কাছে যান, তাকে সান্তনা দিতে থাকেন।

education-1

উদহারন  (২) ঃ
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যাবস্থা নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রশ্ন এসেছে।
সেসব প্রশ্নের সঠিক জবাব শিক্ষামন্ত্রণালয় দিয়েছে কি না, সে বিষয়ে আমার
জানা নেই। তবে সৃজনশীল পরিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা
স্বচক্ষে প্রমাণ পেয়েছি। “সমপ্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের
কর্মকর্তাগণ (মাউশি) দেশের ৯টি শিক্ষা প্রশাসনিক অঞ্চলের ৬ হাজার ৫৯৪টি
বিদ্যালয় পরিদর্শনপূর্বক একটি ‘একাডেমিক সুপারভিশন প্রতিবেদন’ তৈরি
করিয়াছেন। তাহাতে দেখা যায়, দেশের প্রায় ৪১ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়
সৃজনশীল পদ্ধতির প্রশ্নপত্র তৈরি করিতে পারে না। তাহাদের মধ্যে ২৩ দশমিক
৭২ শতাংশ বিদ্যালয় তাহাদের শ্রেণিকক্ষের বিভিন্ন সাময়িক পরীক্ষার
প্রশ্নপত্র তৈরি করে অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সহায়তা নিয়া। আর ১৬ দশমিক
৭৬ শতাংশ বিদ্যালয় বাহির হইতে বাণিজ্যিকভাবে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করিয়া
পরীক্ষা নেয়। কিছুদিন আগে একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক
প্রতিবেদনেও বলা হয় যে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫৫ শতাংশ শিক্ষক সৃজনশীল
পদ্ধতি বোঝেন না।” (দৈনিক ইত্তেফাক/ ৩ মার্চ ২০১৬) এই যদি হয় দশা, তবে
আমাদের শিক্ষার্থীরা কি এতে লাভবান হচ্ছেন? নাকি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? তা
বিবেচনা করতে হবে। এছাড়াও প্রশ্নফাস, লাখো জিপিএ ৫ এর বন্যা, জিপিএ ৫
পেয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে মাত্র দু’জন পাশসহ বিভিন্ন বিষয়ে
ঘুরে ফিরেই আমাদের শিক্ষাব্যাবস্থায় দুরাবস্থার কথা স্বরণ করিয়েছে। এই
দুরাবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হবে। তার মানে এই নয় শিক্ষাব্যাবস্থার দোষ
শিক্ষার্থীরা বহন করবে। সাতটি সৃজনশীল তথা সৃজনশীল প্রশ্ন বর্ধিতকরণ নিয়ে
প্রশ্ন করায় অনেকে বলেন, “যেখানে ৬ টি সৃজনশীল লিখতে হাত ব্যাথা হয়ে যায়,
সেখানে আরেকটি প্রশ্ন বৃদ্ধি করা প্রশাসনের বোকামি এবং শিক্ষার্থীদের উপর
বাড়তি চাপ।” অভিভাবকরাও শিক্ষার্থীদের পক্ষেই কথা বলেন এবং বিরূপ
প্রতিক্রিয়া জানান।

উদহারন  (৩) ঃ
১৯৭১ সালে এদেশের অগণিত বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছিল। হয়তো সেসব মেধা
বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যাবস্থায় আরো অনেক উন্নতি হতে পারতো।
কিন্তু অতি দুঃখের বিষয়, জাতী তাঁদের হারিয়ে ফেলেছে। এখন যারা বুদ্ধিজীবী
বা শিক্ষাবিদ, তারাও যথেষ্ট মেধা রাখেন। প্রশাসন যদি তাদের কথাগুলো
শুনতো, তবে শিক্ষাব্যবস্থা অন্যরকম হতে পারতো। আমি বিশ্বাস করি, প্রশাসন
চাইলেই আমাদের শিক্ষাব্যাবস্থা পরিবর্তন করতে পারে। যার নজির বিভিন্ন সময়
আমরা পেয়ে আসছি। কোনো পরিক্ষা বা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ছাড়াই, শুধুমাত্র
প্রশাসনের আদেশেই সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি এদেশে এসেছে। আবার এখন ছয়টি
সৃজনশীলের জবাব না দিয়ে সাতটির দিতে হবে। অর্থাৎ একটি বেশি। সব ক্ষেত্রেই
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা পিছিয়ে আছে, এটা সত্য। তার মানে এই নয়, সৃজনশীল
প্রশ্ন বৃদ্ধি করলে শিক্ষা ব্যাবস্থার মান বাঁড়বে।
উদহারন  (৪) ঃ
বোর্ড পরিক্ষার রেজাল্ট বেড় হলে, বিভিন্ন পত্রিকায় বিশিষ্ট জনেরা কলাম
লিখেন। অনেকে রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল কিংবা বর্তমানে শীর্ষ ধনী ব্যাক্তি
বিল গেটসের তুলনা দেন। কথাগুলো শিক্ষার্থীদের উপর কতটা নির্মম, তা কি
ভেবে দেখেছেন? অনেকে লিখেন, জিপিএ ৫ ছাড়াও অনেক বড় কিছু হওয়া যায়। কিন্তু
এটা কি চিন্তায় এসেছে, আমাদের দেশের বেশীরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে জিপিএ ৫
ছাড়া ভর্তি আবেদনই করা যায় না। আমরা প্রায় বিদেশের তুলনা দেই। কিন্তু
এখনে তো আমরা বিফল। আপনারা জিপিএ ৫ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ
দেবেন না, আর মাইকে দাঁড়িয়ে বলবেন, সাকিব আল হাসান জিপিএ ফাইভ পায় নি,
রবীন্দ্রনাথ জিপিএ ফাইভ পায় নি, বিলগেটস ফেল করেছিল। এসব তো শিক্ষার্থীরা
শুনতে চায় নি। আপনারা সুযোগ দিন। শিক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তন আনুন। শুধু
সৃজনশীল প্রশ্ন বাড়ালেই যে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে এই ধারণা বদলান।
শিক্ষার্থীদের হিয়ে কাজ করুন, বিপক্ষে নয়। শিক্ষাব্যবস্থা সহজ করুন, কঠিন
নয়।