নারীর কাজের অর্থনৈতিক মূল্য না থাকলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়

নিউজ ডেস্ক,সময়ের কণ্ঠস্বরঃ নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠিত হলে উভয়েই লাভবান হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্টজনেরা। তারা মনে করেন, এর ফলে লাভবান হবে পরিবার ও সমাজ। ফলে এগিয়ে যাবে রাষ্ট্র। তারা আরও বলেন, সমতা প্রতিষ্ঠিত না হলে এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশ সাফল্য অর্জন করলেও এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যের অধিকাংশই অপূর্ণ থাকবে।

গতকাল সোমবার দৈনিক ইত্তেফাক ভবনে অনুষ্ঠিত ‘নারীর মজুরিবিহীন শ্রম মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তারা এসব কথা বলেন। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ‘মর্যাদায় গড়ি সমতা’ প্রচারাভিযানের আওতায় গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে দৈনিক ইত্তেফাক। সহযোগিতায় ছিল মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও মাত্রা ।

w0manman

গোলটেবিলে প্রধান আলোচক ছিলেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি সিপকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী। স্বাগত বক্তব্য দেন ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন। নির্ধারিত আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি ও নারী নির্যাতন ও মাল্টি সেক্টরাল প্রোগ্রামের পরিচালক ড.আবুল হোসেন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, জনপ্রিয় অভিনেতা আফজাল হোসেন, বিআইডিএস-এর অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ডা. প্রতিমা পাল মজুমদার, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর, ইউএনডিপির জেন্ডার বিশেষজ্ঞ ফৌজিয়া খন্দকার ইভা, নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা মিনু, এ বছর রোকেয়া পদক প্রাপ্ত মানবাধিকার কর্মী এ্যারোমা দত্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ও সহকারি অধ্যাপক তানিয়া হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালের নৃবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক রাশেদা রওনক খান, উইম্যান চ্যাপটারের সম্পাদক সুপ্রীতি ধর, এভারেস্ট বিজয়ী প্রধম বাংলাদেশী নারী নিশাত মজুমদার, দৈনিক ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত প্রমুখ।

নির্ধারিত বিষয়ের ওপর প্রেজেনটেশন উপস্থাপন করেন এমজেএফ সমন্বয়কারি বনশ্রী মিত্র। এসময় সংসারে নারীর কাজকে সহযোগিতা করে মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ওপর দুটি ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী বলেন, এমজেএফ ‘মর্যাদায় গড়ি সমতা’ প্রচারাভিযানের আওতায় নারীর মজুরিবিহীন শ্রমের গবেষণায় যে চিত্র উঠে এসেছে তা র্দুভাগ্যজনক। এই দুর্ভাগ্যজনক অবস্থাকে কিভাবে সৌভাগ্যে পরিণত করা যায় আমাদের তা বের করতে হবে। তিনি বলেন, নারী-পুরুষের যে বৈষম্য নিরসনে কেবল শিতাতপ নিয়ন্ত্রীত ঘরে বসে মিটিং করলে হবে না, এর জন্যে তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, দেশের ৫০ ভাগ জনগোষ্ঠী নারীকে পিছিয়ে রেখে এসডিজি অর্জন করা সম্ভব নয়, সে কারণে নারীদের সর্বক্ষেত্রে সমান মর্যাদা দিয়ে এগিয়ে নিতে হবে।

ড.আবুল হোসেন বলেন, সমতার লড়াইয়ে এগিয়ে যেতে আমাদের মানসিকতার একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন দরকার। সরকার নারীর ক্ষমতায়র ও নির্যাতন প্রতিরোধে নারী-পুরুষের ক্লাব, কিশোর -কিশোরী ক্লাব করেছে। এই ক্লাবগুলোতে ভিডিও চিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টির পরামর্শ দেন তিনি।

শাহীন আনাম বলেন, বিবিএসএর গবেষনায় দেখা যায় ৮০ শতাংশ নারী নির্যাতনের শিকার। সেখান থেকে আমরা নারীর সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ শুরু করি। নারী যে গৃহস্থালির কাজ করে তার মূল্যমান বেশি হলেও ডিজিপিতে অর্ন্তভূক্ত করা কঠিন। আমাদের মনের দিক থেকে মর্যাদা এবং সমতা আনতে হলে নারীপুরুষের চিন্তায় পরিবর্তন আসতে হবে।

ডা. প্রতিমা পাল মজুমদার বলেন, ‘নারীর মজুরিবিহীন শ্রম মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি’ বিষয়টি এসডিজির সাথে সর্ম্পকযুক্ত।’ নারীর কাজের অর্থনৈতিক মূল্য না থাকলে স্বীকৃতি হবে না বলে মন্তব্য করেন এই গবেষক।

রোকেয়া কবীর বলেন, নারী-পুরষ উভয়েরই সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব আছে। অন্যদিকে, আমাদের দেশে এখন ভিন্নরূপে কৃতদাস প্রদা প্রচলিত আছে বলে উল্লেখ করে নাসিমুন আরা মিনু বলেন, অনেক কাজ নারীরা নিজেরাই মেনে নেয়। ঘরের কাজে সমতা আনতে না পারলে সমমর্যাদা ও সমতা স্বীকৃতি পাবে না।

বেগম রোকেয়ার দর্শনকে পাঠ্যসূচীসহ সকল ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত করার তাগিদ দেন এ্যারোমা দত্ত।

তাসমিমা হোসেন বলেন, সমমর্যাদা ও সমতার বিষয়টি পরিবার থেকে যেমন শিক্ষা দিতে হবে, তেমন গণমাধ্যমকেও ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা অনেক সময় চিরায়ত রীতির কারণে নিজেরাই বৈষম্য তৈরী করে ফেলি। আমাদের এই দিকগুলো সসর্ম্পকেও সচেতন হতে হবে।

ফৌজিয়া খন্দকার ইভা বলেন, কোনো পেশায় না থাকলে নারীরা বলেন, ‘আমি কিছু করি না’। ঘর সংসারের কাজ যে বড় কাজ তা তারা স্বীকার করতে শেখেনি। এটা পুরুষতান্ত্রিকতার জন্য।

আফজাল হোসেন, একজন স্ত্রী স্বপ্ন দেখেন স্বামী সব কাজে তার সঙ্গী হবেন। কিন্তু তিনি ভাবেন এটা কেবল নাটক সিনেমায় হয়। আমাদের সবার মধ্যে যে বিভেদ আছে তা দূর করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তানিয়া হক বলেন, সংসার সন্তানের জন্য নারীর পেশা আছে কিন্তু ক্যারিয়ার নেই। মাতৃত্বকালীন ছয় মাস ছুটির জন্য নারীর পদন্নোতি ব্যাহত হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। নিশাত মজুমদার সমমর্যাদার বিষয়টি পাঠ্যপুস্তকে অর্ন্তভূক্ত করে শৈশব থেকে শেখানোর কথা বলেন।

রাশেদা রওনক খান বলেন, এই সমস্যার মূল জায়গাটা হচ্ছে আমাদের মানসিক সমস্যা। আমার মনে হয় আমাদের মানসিক অবস্থার পরিবর্তনের জন্য ধীরে ধীরে আঘাত করতে হবে পুরুষতান্ত্রিকতার মূলে।