‘রহস্যময়’ যেসব কারনে হুট করেই দেখা মেলে যুগলবন্দী ‘নাগ-নাগিনী’র অবাক করা ‘নৃত্য’

 

সম্পাদনা- আহমেদ তৌফিক,

চিত্র-বিচিত্র ফিচার ডেস্ক, সময়ের কণ্ঠস্বর-

গল্পে নয় রুপকথায় নয় বাস্তবেও মাঝে মাঝে দেখা মেলে নাগনাগিনীর প্রেম। সাপ নিয়ে অনেক ছায়াছবি তৈরি হয়েছে। হিন্দু ধর্মেও রয়েছে সাপকে নিয়ে নানা পৌরাণিক কাহিনী।

সাপুড়ের বীন বাজানোর মাধ্যমে খাঁচা থেকে বের করে আনা সাপের নাচ গ্রাম-গঞ্জে প্রায়ই দেখতে পাওয়া যায়। এমন দৃশ্য গ্রামে গঞ্জে কারো দেখার সুযোগ না হলেও সিনেমা দৃশ্যে এরকম চিত্র দেখেননি এমন মানুষ পাওয়া ভার। কিন্তু সাপুড়ে নেই, নেই বীনের সুর। কেবল টলমলে খালের পানিতে অথবা জনবহুল লোকালয়ে হুট করেই দুটি সাপ দুজন দুজনকে পেচিয়ে ফনা তুলে তুলে বিমোহিত নাচের অভূতপূর্ব দৃশ্য ফুটিয়ে তোলে কোন কোন সময়ে। এমন ‘বিরল’ সাপের প্রেমলীলা বা নৃত্য দারুন বিনোদন দেয়, অবাক করে শত -হাজার দর্শনার্থীকে।

সাপের যুগল নৃত্য নিয়ে দেশজুড়ে নানা গল্প-গুঞ্জন, কল্পকাহিনী ছড়িয়ে পড়ে নানা সময়ে । কেউ কেউ সাপের নয়নাভিরাম নৃত্যশৈলীকে আধ্যাত্মিক শক্তিধর কিছু মনে করেও তা প্রচার করে । হিন্দু সম্প্রদায়ের কারো কারো দৃষ্টিতে সাপের মুখোশ পরে দেবতার আবির্ভাব হয় এসময়ে ।

couple-snake-dance-sk

তবে প্রানীবিজ্ঞানিরা বলছেন ভিন্নকথা, তাদের মতে, একমাত্র গোখরা সাপই ফণা তুলে পানিতে নাচতে পারে। সাধারণত এ প্রজাতির সাপের পক্ষেই শরীরের তিন ভাগের এক ভাগ পানির উপরিভাগে উঠিয়ে মনোমুগ্ধকর নৃত্য করা সম্ভব। ফণা তোলার কারণে সাপ ভারসাম্য রাখতে পারে। সেই সঙ্গে মুগ্ধ-বিমোহিত নাচের অভূতপূর্ব দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতেও তারা সক্ষম। সাধারণত জুন-জুলাই মাস গোখরা সাপের প্রজনন মৌসুম। এ সময়ে সঙ্গীর মনোরঞ্জন কিংবা দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সাপ জলকেলিতে মেতে ওঠে বলে জানিয়েছে প্রানিবিজ্ঞানীরা । একেকটি সাপ বছরে একবার গড়পড়তা ৬০ থেকে ৭০টি ডিম দিয়ে থাকে।

গোখরা সাপ দু’প্রজাতির। পদ্ম ও খৈয়া। সাধারণত লোকালয়ের বাইরে খানিকটা শুকনো, খানিকটা ভেজা জায়গায় এদের আবাস। নদী কিংবা জলাধারের পাশে জঙ্গলে অথবা ইঁদুরের গর্তে এরা থাকে। টিকটিকি, ইঁদুর, পোকামাকড় ও পশুপাখির ডিম খায়। মাছে আগ্রহ নেই। গাছে উঠতে বেশ পারঙ্গম। সুন্দরবনে সংখ্যাধিক্য বেশি।

সাপুড়ে নেই, নেই বীনের সুর। কেবল টলমলে খালের পানিতে অথবা প্রকাশ্যেই দেখুন এমন কিছু বিরল সাপের নাচের ভিডিও

ইউটিউব থেকে সরাসরি দেখতে এখানে ক্লিক করুন – ভিডিও লিঙ্ক 

প্রাণিবিজ্ঞানীরা বলছেন, সাপ নিয়ে নানা পৌরাণিক কাহিনী থাকলেও বিভিন্ন লোকালয়, দিঘী বা খালে হুট করে দেখতে পাওয়া নৃত্যরত সাপ নিয়ে বাড়াবাড়ির কোনো সুযোগ নেই। এই সাপেদের আধ্যাত্মিক শক্তি বলে কিছু নেই। সাপকে দুধকলা ভোগ দিয়েও লাভ নেই। কেননা সাপ কখনই দুধকলা খেতে পারে না।

সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জ জেলায় এমনি একটি সাপের নৃত্য নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে নানা কল্পকথা আর গুঞ্জন ।

মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মহাকালী ইউপি ভবনের পার্শবর্তী চৌধুরী বাজারের সুউচ্চ মঠের পাশ দিয়ে বয়ে চলা সাতানিখিল খালের পরিষ্কার টলমলে পানিতে টানা কদিন দুটি সাপ দুটি দিনে দু’তিনবার নেচে মাতিয়েছিলেন সবাইকে । প্রত্যক্ষ্যদর্শীদের বর্ননায়, সাড়ে ৪ থেকে ৫ ফুট লম্বা কালো আর পেটের অংশে সাদা রঙের সাপ দুটিকে নাগ-নাগিনীর নাচন বলে অভিহিত করেন স্থানীয়রা ।

এলাকায় এই সাপ দুটি নিয়ে ছড়ি পড়ে নানা কল্পকাহিনী। কেউ কেউ বলেন এ দুটি আসলে দাঁড়াশ সাপ। তবে ধর্মপ্রাণ অনেক হিন্দু এগুলোকে সাপ বলতে নারাজ। তাদের চোখে ‘এরা দুই সাক্ষাৎ দেবতা’ । এলাকার হারেশ শেখ সাপ দুটিকে আধ্যাত্মিক শক্তিধর কিছু মনে করে সেসময় পত্রিকায় সাক্ষাতকারও দেন । আর ঐ অঞ্চলের নামকরা সাপুড়ে  আসলাম শেখ ডাবলু সাপ দুটিকে ধরতে গিয়ে ব্যর্থ হবার পর ছিলেন দারুন ভয়ে!

এ প্রসঙ্গে আসলাম শেখ (৩৫) সেসময় বলেন , পানিতে নেমে সাপ ধরার পরপরই অন্য রূপ নিয়ে নিচ্ছে। তাই শত চেষ্টা করেও তালুবন্দি করতে পারিনি।

এলাকাবাসীর মতে, এই স্থানটিতেই একদা হিন্দু জমিদার কেদার চৌধুরীর বাড়ি ছিল। মেয়ের জন্য প্রায় সাড়ে ৩ শ’ ফুট উচ্চতার মঠটি তৈরি করেছিলেন আড়াই শ’ বছর আগে। মঠের ঠিক ওপরে ছিল একটি কলসি। সেখানে অনেক ধনরত্ন রয়েছে বলে কথিত আছে। এছাড়া ওই মঠে হিন্দুরা পূজা-অর্চনা করতেন। মঠের ভেতর দুটি সাপ পুষতেন জমিদার কেদার চৌধুরী। সেখানে সাপ দুটিকে দুধকলা ভোগ দেওয়া হতো। পরে জমিদাররা এলাকা ছাড়লে মঠটির পাদদেশে বাজার গড়ে ওঠে, যা আজকের চৌধুরীবাজার। তবে আড়াই শ’ বছরের সেই মঠটি আজ অযত্নে আর অবহেলায় পড়ে আছে। মঠের চূড়ার সেই কলসিটি গত সিডরে ভেঙে গেছে।

এসব কারনেই খালের পানিতে নৃত্যরত সাপ দুটিই মঠের সেই সাপ বলে মনে করেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। এমনকি কিছু মুসলমাদেরকেও সাপ দুটিকে দুধকলা দিয়ে ভোগ দিতে দেখা যায়!