শৈল্পিক এবং দূরদর্শী শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের আজ ১০২তম জন্মবার্ষিকী

শিল্প ও সাহিত্য ডেস্ক, সময়ের কণ্ঠস্বর: কথা বলে যাঁর ছবি তিনি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন। তাঁর শৈল্পিক এবং দূরদর্শী বৈশিষ্ট্যের কারণে শিল্পকলায় অবদানের জন্য তাঁর জীবদ্দশায় তিনি পেয়েছেন শিল্পাচার্য খেতাব। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পকলা আন্দোলনের পথিকৃৎ। বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলনের পথিকৃত শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আজ ১০২তম জন্মবার্ষিকী। ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে তার শিল্পীমানস গড়ে ওঠে। তিনি বাঙালি মুসলমানের শিল্পকলার ঐতিহ্য নির্মাণ ও আধুনিক চিত্রকলার পথিকৃত্ ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশে চিত্রকলার আধুনিকতা ও প্রসারে, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিদ্যমান অচলায়তন ভাঙতে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সৃষ্টিকর্ম ও তার ব্যক্তিগত কর্মতত্পরতা যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে। তার অসাধারণ নেতৃত্বগুণে ১৯৪৮ সালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে গড়ে তুলেছিলেন ঢাকা আর্ট কলেজ। তিনি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। সে সময় তার যুগান্তকারী পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশ আজ চিত্রকলায় এক অনন্য অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। শিল্পাচার্যের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৭৫ সালে ঐতিহাসিক সোনারগাঁয়ে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

silpa-joinulজয়নুল আবেদিন ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার বর্তমানে কিশোরগঞ্জ জেলার কেন্দুয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবা তমিজউদ্দিন আহমেদ ছিলেন পুলিশের দারোগা। মা জয়নাবুন্নেছা গৃহিনী। ৯ ভাইবোনের মধ্যে জয়নুল আবেদিন ছিলেন সবার বড়। পড়াশোনার হাতেখড়ি পরিবারের কাছ থেকেই। খুব ছোটবেলা থেকেই তিনি ছবি আঁকা পছন্দ করতেন। পাখির বাসা, পাখি, মাছ, গরু-ছাগল, ফুল-ফলসহ আরও কত কি এঁকে মা-বাবাকে দেখাতেন।

ছেলেবেলা থেকেই শিল্পকলার প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। মাত্র ষোল বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে তিনি বন্ধুদের সাথে কলকাতায় গিয়েছিলেন শুধু মাত্র কলকাতা গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস দেখার জন্য। কলকাতা গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস দেখে আসার পর সাধারণ পড়াশোনায় জয়নুল আবেদিনের মন বসছিল না। তাই ১৯৩৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষার আগেই স্কুলের পড়ালেখার বাদ দিয়ে কলকাতায় চলে যান এবং মায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস-এ ভর্তি হন। তাঁর মা জয়নুল আবেদিন আগ্রহ দেখে নিজের গলার হার বিক্রি করে ছেলেকে কলকাতার তখন আর্ট স্কুলে ভর্তি করান।

পরবর্তীতে ছেলে জয়নুল আবেদিনও মায়ের সেই ভালবাসার ঋণ শোধ করেছেন দেশের স্বনামধন্য শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে। জয়নুল আবেদিন ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত কলকাতার সরকারি আর্ট স্কুলে পড়েন। ১৯৩৮ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টসের ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

তার চিত্রকর্মে ফুটে উঠেছে বুভুক্ষ মানুষের আর্তনাদ এবং একইসঙ্গে প্রতিবাদী ভঙ্গি মূর্ত হয়ে উঠেছে। তার ‘সংগ্রাম’ ও দুর্ভিক্ষ সিরিজের চিত্রগুলো আজো মানুষকে শক্তি দেয়। দেয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবার সাহস।

pic1এই শিল্পী ১৯৪২-৪৩ সালে দুর্ভিক্ষের করুণ ছবি এঁকে আমাদের অন্তর আত্নাকে নাড়া দিয়েছেন। যে ছবি গুলোর মাধ্যমে আজো আমরা সেই দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা ও বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করতে পারি । শুধু দুর্ভিক্ষের ছবি নয়, তার আঁকা প্রতিটি ছবিই একেকটি সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে এবং বাস্তব অবস্থাকে আমাদের চোখের সামন্যে তুলে ধরে। বাংলা ১৩৪৯ সালের দুর্ভিক্ষের সময় রাস্তায় পড়ে থাকা ছিন্নমূল মানুষের ছবি ও স্কেচে জয়নুলের ক্যানভাস জীবন্ত হয়ে উঠে। এ ছবি একেঁই মানবতাবাদী এই শিল্পীর খ্যাতি ও সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

pic2চিত্রশিল্পও যে কোন প্রতিবাদের প্রতিচ্ছবি বা প্রতিরোধের হাতিয়ার অথবা অধিকার-সাম্য-স্বাধীনতার ভাষা হতে পারে তা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন আমাদের দেখিয়েছেন। শিল্পীর তুলিতে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপকতা কতটা বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে জ্যান্তরূপে আবির্ভূত হতে পারে, তা জয়নুলের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবিগুলো না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না।“ ১৯৭০ সালে জয়নুল এঁকেছিলেন দীর্ঘ এক ছবি,নবান্ন। এ ছবি গ্রাম বাংলার জীবনের প্রতিচ্ছবি ।

pic3দেশের দক্ষিণে উপকূলবর্তী চর ‘মনপুরা’; যা শান্ত, সবুজ এক বনানী। ১৯৭০ সালের প্রলংয়করী ঘূর্ণিঝড় এ দ্বীপে আঘাত হানে। লক্ষাধিক লোকা মারা যায় সে ঝড়ের তাণ্ডবে। জয়নুল সেই ধ্বংসলীলার ছবি একছিলেন – ’মনপুরা ৭০’। তুলির আচড়ে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন প্রকৃতির সেই নির্মম আচরন। প্রচণ্ড ঢেউয়ের দাপটে তীরে উঠে আসা মৃত গবাদিপশু, নারী-পুরুষ, শিশুর মিছিল। এ যেন সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দী শ্বাসরুদ্ধকর মুহর্ত। প্রকৃতির তাণ্ডবে বেঁচে যাওয়া এক মানুষ হাঁটুমুড়ে বসে আছে-জীবন্মৃত, অসাড়। এ ছবি প্রকৃতির এক নির্মম, নিষ্ঠুর ইতিহাস।

জয়নুল আবেদীন ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমীর সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি এখানে কাজ করেন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর অন্যতম উপদেষ্টা মনোনীত হন। একই বছর জয়নুল বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় অধ্যাপক নিযুক্ত হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। তাঁরই প্রচেষ্টায় ১৯৭৫ সালে শিল্পকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হয়।

এক বিরল শিল্পপ্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি নিজস্ব শৈল্পিক দক্ষতার গুণে ছাত্রজীবনেই সর্বভারতীয় পর্যায়ে শিল্পী হিসেবে সুনাম অর্জন করেন এবং পরবর্তী কয়েক বছরে (১৯৩৯-৪৭) মুষ্টিমেয় আধুনিক ভারতীয় শিল্পীর নামের তালিকায় স্থান করে নেন। দেশবিভাগের পর ঢাকায় এসে তিনি এ অঞ্চলে শিল্প-শিক্ষালয়ের অভাব অনুভব করেন। তিনি আগ্রহী হয়ে ওঠেন আমাদের সমাজ থেকে রুচির দুর্ভিক্ষ দূর করতে, মানুষের মধ্যে সৌন্দর্যবোধ জাগ্রত করতে। তা তাঁর একার ছবি আঁকার মাধ্যমে সম্ভব ছিল না। এ কারণেই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ব্যাপারে তিনি মনোনিবেশ করেন। আজ সারা বাংলাদেশে শিল্পচর্চার বিপুল কর্মযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করে আমরা তাঁর স্বপ্ন কীভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে তা উপলব্ধি করতে পারি। তাঁর ছাত্রদের কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের হাতে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বগুড়া ও নারায়ণগঞ্জে গড়ে উঠেছে শিল্পশিক্ষার প্রতিষ্ঠান। ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন শিশুদের জন্য চিত্রাঙ্কনের একটি বিদ্যালয়। আজ সারাদেশের শিশুদের মধ্যে চিত্রাঙ্কনের যে-আগ্রহ ও সমারোহ আমরা লক্ষ্য করি, তার উত্সমূলে ওই খুদে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা অনস্বীকার্য। এভাবেই সমগ্র জাতির মধ্যে তিনি শিল্পশিক্ষার যে-বীজ বুনেছিলেন তা আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে।

জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে জয়নুল উত্সব এবং লোকজ মেলা শুরু হবে আজ বৃহস্পতিবার। এ বছর ‘জয়নুল সম্মাননা-২০১৬’ প্রদান করা হবে ভারতের প্রখ্যাত শিল্পী অধ্যাপক যোগেন চৌধুরী এবং বাংলাদেশের প্রতিথযশা শিল্পী অধ্যাপক হাশেম খানকে। অনুষ্ঠানে শিল্পী তারক গড়াইয়ের নির্মিত ভাস্কর্যের আবরণ উন্মোচন করা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদে সকাল ৯টায় শিল্পাচার্যের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্য দিয়ে উত্সবের উদ্বোধন করা হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এবং বিশেষ অতিথি থাকবেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সহধর্মিণী জাহানারা আবেদিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আআমস আরেফিন সিদ্দিক অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন।