ঐতিহ্য হারাচ্ছে মিরপুরের হযরত শাহ আলী (রঃ) এর মাজার শরীফ!

রাজু আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার, সময়ের কণ্ঠস্বর :

চর্চা সংকটে দেশীয় নিজস্ব সংস্কৃতির বহু পুরোনো অংশ, বহুল তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী বাউল শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। অনাহারে- অর্ধাহারে দিনঃপাত করছেন রাজধানীর মিরপুরস্থ হযরত শাহ্ আলী বাগদাদী (রঃ) এর মাজার শরীফ ভিত্তিক সহস্রাধিক ছিন্নমূল বাউল ও যন্ত্র সংগীত শিল্পী। ঐতিহ্য হারাচ্ছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য সমৃদ্ধ এই মাজার শরীফ।

বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্য সমৃদ্ধ সংস্কৃতি সম্ভারের বিরাট এক অংশ দেশের বাউল শিল্পের অস্তিত্ব আজ চরম সংকটাপন্ন। শহরে – শহরতলীতে, গ্রামে-গ্রামান্তরে বসবাসরত দেশের মোট জনসংখ্যার ৮০ ভাগ মানুষই প্রকৃতির অপরূপ রূপবৈচিত্রের সংগে সংগে গুরুভাব গাম্ভীর্য সম্পন্ন এই শিল্প ও সংস্কৃতিকে হৃদয়ে লালন করে আসছে বহুকাল। ওলি-আউলিয়া, পীর-মাশায়েখ, আউল-বাউলের দেশ বাংলাদেশ। এদেশের মাটিতে বহু জগৎ বিখ্যাত মহৎ ব্যক্তি জন্মগ্রহন ও রচনা করেছেন হাজার হাজার বাউল গান। যা দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষায় অকৃত্রিম সুরে আজও চর্চা হওয়ায় পৃথিবীর বুকে বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি ও সম্মানকে পৌছে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতায়।

পক্ষান্তরে দেশের মাটিতেই অনাদর, অবহেলা, অসম্মান, নিয়মিত চর্চা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাব! প্রযুক্তিনির্ভর পশ্চিমা দেশগুলির অপসংস্কৃতির ভীড়ে জারী-সারি, পল্লীগীতি, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, বৈঠকী, কবিগান, পালাগান, মুর্শীদিগান, বাউলগান আজকাল শোনাই যায় না। মহান তাপসপ্রবর সুলতানুল আউলিয়া হযরত শাহ্ আলী বাগদাদী (রঃ) সুদূর ইরাক হতে এদেশে ইসলাম প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে এসে একপর্যায়ে রাজধানীর মিরপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। কালের বিবর্তনে তারই নামে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসমৃদ্ধ আজকের বিশালাকার এই মাজার শরীফ কমপ্লেক্স। দেশ-দেশান্তর হতে বিপুল ভক্তবৃন্দ ও দর্শনার্থী সমাগম হতে থাকে। সকল শ্রেনী পেশার মানুষ জেয়ারত করতে এসে মাজার শরীফের ভাবগাম্ভীর্যে মুগ্ধ হন। সপ্তাহের প্রতি বৃহঃবার বিভিন্ন পীর মাশায়েখগণ তাদের ভক্তবৃন্দ নিয়ে দলবদ্ধ হয়ে মাজার শরীফ জিয়ারত করতে আসেন। এ সকল ভক্ত-শিষ্যগণ তরিকতের শিক্ষা গ্রহন করতেই এখানে আসেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল হতে আসা জেয়ারতকারীগণের কাফেলায় আবাল, বৃদ্ধ, মহিলা, শিশু সহ সকল বয়সের বিপুল সংখ্যক মানুষ সমবেত হয়ে জিকির, মিলাদ মাহফিল ও বিভিন্ন ইবাদাতে মশগুল হয়ে রাত্রিযাপন করে ভোরবেলা ফিরে যেতেন।

mirpur-shah-ali-majar-somoyerkonthosor

উচ্চ পর্যায়ের অনেক পীর-মাশায়েখ, ফকির, দরবেশ, পাগল, মাস্তান, মজ্জুম, ছালেক, সংসার ত্যাগী সাধূ সন্নাসীর অবস্থান ছিল। অবস্থানকালে তারা সাধন কার্যের পাশাপাশি আল্লাহ-রাসুলের নিগূঢ় তত্বের বিষয়ে মানুষকে শিক্ষা দিতেন। শুধুমাত্র সপ্তাহের প্রতি বৃহঃপতিবার আসন পেতে দলবদ্ধভাবে বিভিন্ন ভক্তিমূলক গান পরিবেশনে সুরের মূর্ছনায় মাজার শরীফ প্রাঙ্গন ভারী হয়ে উঠত। বহু কাওয়াল, বাউল শিল্পীদের সমাগম থাকত প্রতিনিয়ত। বাউল গানের কথা, ভাবগম্ভীর্য ও সুরের মূর্ছনায় মুগ্ধ হয়ে দর্শনার্থীগণের অনেকেই তাদের অর্থ, টাকা-পয়সা উপহার দিত। ধীরে ধীরে বাউল গান চর্চার আদর্শ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করায় দেশের জাতীয় বাউল শিল্পী সমিতির প্রধান কার্যালটিও এখানেই প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বর্তমানে দেশের সুপ্রতিষ্ঠিত ও বিখ্যাত বাউল শিল্পীগণ নিয়মিত এই কার্যালয়ে অবস্থান করেন। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা বাউল গান শিক্ষার্থীগণ বিখ্যাত বাউল শিল্পীদের শিষ্যত্ব গ্রহন করায় সিংহভাগ বাউল শিল্পী-শিক্ষার্থীগণ মিরপুর ভিত্তিক বসবাস শুরু করেন। দেশের সুপ্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত বাউল শিল্পীদের যে সকল শিষ্যরা ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠা লাভের আশায় বাউল গান চর্চা করে, তারাই আজ ছিন্নমূল বাউল শিল্পী হিসেবে পরিচিত। বাউল গানের সকল বাদ্যযন্ত্র শিল্পীরাও রয়েছে ছিন্নমূল বাউল শিল্পীদের দলেই।

মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারের (ডি.সি.) দৃঢ় হস্তক্ষেপ কামনা করে বাংলাদেশ জাতীয় বাউল শিল্পী সমিতিরি মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা দেশ-বরেণ্য বাউল শিল্পী লিপি সরকারের স্বামী কামাল হোসেন সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, বাউল শিল্পীরা এখন টিকে আছে ধীরলয়ে।

এখানে বহুকাল থেকে নিয়মিত বাউল গানের চর্চা ও পরিবেশন হলেও সম্প্রতি মাজার শরীফ কমপ্লেক্স প্রাঙ্গনে বাউল গান চর্চা ও পরিবেশন অজ্ঞাত কারনে বন্ধ থাকায় দর্শনার্থীদের সংখ্যা হ্রাসের পাশাপাশি ছিন্নমূল বাউল শিল্পীদের দুঃখ দূর্দশার শেষ নেই।

সহস্রাধিক ছিন্নমূল বাউল শিল্পী অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। অনেক প্রতিভাবানই জীবিকার তাগিদে বাউল গান ছেড়ে দিয়েছে। দর্শনার্থীগণ হযরত শাহ্ আলী বাগদাদী (রঃ) মাজার শরীফ বিমুখ হওয়ায় এতিহ্যে ভাটা পড়তে শুরু করেছে এই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঐতিহ্যসমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানটির। সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা পেলে হয়ত অচিরেই এই শিল্পটিকে দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি হতে বিলুপ্তি হওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে ডিএমপি’র মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আহম্মদ সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, যেহেতু বাউল শিল্প দেশীয় সংস্কৃতির একটি বিরাট ঐতিহ্যবাহী অংশ বিশেষ। সেহেতু এই শিল্পকে রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের সহযোগীতার পাশাপাশি সকল ব্যবস্থা গ্রহনের আশ্বাস দিচ্ছি। অচিরেই বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।