SOMOYERKONTHOSOR

ঠাকুরগাঁওয়ে রক্তে রাঙ্গা এক দীঘির নাম খুনিয়াদীঘি!


কামরুল হাসান, ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধিঃ

ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার রক্তে রাঙা এক দীঘির নাম খুনিয়াদীঘি। আমরা গত ৮ই জানুয়ারী ঘন কুয়াশায় গিয়েছিলাম ঠাকুরগাঁও জেলার পশ্চিমের উপজেলা গুলোর নিদর্শন দেখতে।

ভ্রমণে সঙ্গে ছিল সময়ের কণ্ঠস্বরের প্রতিনিধি (কুষ্টিয়া) এক বন্ধু, আর একটা মোটর বাইক ও সাথে নিলাম বালিয়াডাঙ্গীর তরুণ এক সাংবাদিকসহ তার এক বন্ধুকে। প্রথমেই শহর থেকে বেরিয়ে বালিয়াডাঙ্গীর পথে যেতে যেতে গল্প শুরু করলাম চলমান রাস্তা নিয়ে। কি-সুবিশাল সুন্দর রাস্তা দেখে মনে হচ্ছে বহির বিশ্বের উন্নত কোন রাস্তায় আমরা বাইক চালাচ্ছি। প্রথমেই গেলাম বালিয়াডাঙ্গী হয়ে রাণীশংকৈল উপজেলার ভান্ডারা গ্রামে। যে গ্রামে রয়েছে ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে খুনিয়া দীঘির পানি : মানবতা বিরোধী অপরাধের নীরব সাক্ষী।

স্থানীয় বেশ কিছু লোকজনের  সাথে কথা বলে যা জানতে পারি তাহলো (সংক্ষিপ্ত) এই দীঘিকে ঘিরে রযেছে পাক বাহিনী ও তাদের দোসরদের নির্মম খুনের এক বিরল ইতিহাস। স্বাধীনতা সংগ্রামে ঠাকুরগাঁওয়ের জনপদে আছে হাজারও মুক্তিকামী মানুষের গৌরব উজ্জ্বল ইতিহাস। আছে ত্যাগ আর শহীদের আত্মত্যাগের ইতিহাস। ১৯৭১ সালের ২৭শ মার্চ পাক সেনাদের হাতে প্রথম শহীদ ঠাকুরগাঁওয়ের রিকশাচালক মোহাম্মদ আলী। তারপর থেকে পাক সেনারা চালায় বিভিন্ন জায়গায় বাঙালী নিধন অভিযান। কিন্তু তবুও স্বাধীনতার জন্য ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিকামী মানুষের আত্মত্যাগ থেমে থাকেনি।

ঠাকুরগাও জেলার রাণীশংকৈল উপজেলার ভান্ডারা গ্রামের খুনিয়াদীঘি এখন শুধু ইতিহাস নয়, বাঙ্গালীর স্বাধীনতার এক নীরব দলিল। যে দীঘি ছিল মানুষ ও পশু-পাখির তৃষ্ণা নিবারণের জন্য। সেই দীঘি হয়ে উঠে পাক হানাদার বাহিনীর প্রাণ হননের এক নির্মম বধ্যভূমি। এই দীঘি হয়ে উঠে অসংখ্য মানুষের রক্তে রাঙা রঙিন। হাজার খুনের দুঃসহ যন্ত্রণা গাঁথা এই দীঘির নাম খুনিয়াদীঘি। আর তাই এর নামকরণ তার প্রকৃত স্বার্থকতা খুঁজে পেয়েছে। খুনিয়াদীঘির বুকে রয়েছে একাত্তোরের সংঘটিত গণহত্যার এক নিষ্ঠুরতম ইতিহাস।

স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ঠাকুরগাঁওয়ের সীমান্ত এলাকা রাণীশংকৈল, হরিপুর ও বালিয়াডাঙ্গী মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা তৎপরতায় পাক বাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়ে ১৯৭১ এর মে মাসে তারা পরিকল্পিতভাবে শুরু করে বাঙ্গালী নিধন। বিভিন্ন স্থানে তারা ক্যাম্প স্থাপন করে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শুরু করে বাঙ্গালী ধর পাকড় এবং হত্যাযজ্ঞ। এমনি এক হত্যাযজ্ঞের জন্য পাক বাহিনী রাণীশংকৈল থানাতে স্থাপন করে একটি ক্যাম্প। সে সময় তাদের সহযোগিতা করে ‘মালদইয়া’ বলে কথিত এই দেশের স্বাধীনতা বিরোধী এক শ্রেণীর লোক। এই দোসরদের সহায়তায় তারা বাঙ্গালী মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের লোকজন ও মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে জড়ো করতো খুনিয়াদীঘির পাড়ে।

ছেলে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার অপরাধে পিতা ও ভাই এবং তাদের আত্মীয় স্বজনদের ধরে এই ক্যাম্পে নিয়ে আসতো পাক সৈন্যরা। এরপর ভান্ডারা গ্রামের খুনিয়াদীঘির পাড়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ও গুলি করে হত্যা করতো। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার অপরাধে অনেক যুবক ও তাদের আত্মীয় পরিজনদের ধরে এনে দিঘীরপাড়ের শিমুল গাছে বেঁধে পেরেক মেরে গাছে অটকে রাখত। এক সময় রক্ত ঝরতে ঝরতে তার মৃত্যু হত। মৃত্যু বা হত্যার পর লাশ পুকুরের পানিতে ফেলে দিত। কখনো কখনো হত্যার পূর্বে লোকজনকে কবর খুঁড়তে বাধ্য করতো।পরে হত্যার পর দীঘির পাড়ের উঁচু জমিতে মাটি চাপা দিত । দিনের বেলা কুকুর ও শকুন আর রাতের বেলা শিয়ালের মহোৎসব চলতো খুনিয়াদীঘির পাড়ে। কদিন পাক বাহিনী ১৮ জন বাঙ্গালীকে এক সঙ্গে লাইন করে দাঁড় করে গুলি করে হত্যা করে। পরে তাদের লাশ দীঘির পানিতে ফেলে দেয়।

১৮ জনের মধ্যে একজন ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যায়। সারাদিন দীঘির কচুরী পানার মধ্যে মাথা ভাসিয়ে বেঁচে থাকে। রাতে লাশ ঠেলে পাড়ে উঠে কোন মতে পালিয়ে গিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। আর এরপরেই চারিদিকে প্রচার হয়ে যায় খুনিয়াদীঘির নির্মমতার কথা। চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাণীশংকৈল উপজেলার কদমপুর, উত্তরগাঁও, নাথনগর, কাঁঠালডাঙ্গী, টেংরিয়া, ভাতুরিয়া ও রুপসা গ্রামের শত শত বাঙালীকে এখানে হত্যা করা হয়। খুনিয়াদীঘির আশেপাশে যাদের হত্যা করা হয় তাদের মধ্যে আছেন খোকা, দবিরুল, কুরমন, বসিরউদ্দীন ও সাইফুদ্দিন। এমনি অনেক নিরাপরাধ অসহায় মানুষ প্রাণ দিয়েছে পাক বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে খুনিয়া দীঘি পাড়ে। আজ খুনিয়াদীঘি আশেপাশের গ্রামের মানুষের কাছে এক বেদনাবিধুঁর স্মৃতি।

খুনিয়াদীঘির হত্যাকান্ডের কথা বলতে গিয়ে অনেকেই শিঁউরে উঠেন। রাণীশংকৈল উপজেলার সন্ধ্যারই গ্রামের পবার আলী ও বনগাঁও গ্রামের নুরুল ইসলাম জানান, প্রায় ২ হাজারেরও বেশী বাঙালীকে এই খুনিয়াদীঘিতে হত্যা করা হয়। তবে অনেকের অনুমান এর সংখ্যা আরও বেশী। অনেকের মতে এখানে প্রায় ৩ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে । স্বাধীনতার পর এই আত্মত্যাগের নির্মম ইতিহাসের সে সব শহীদদের কথা স্মরণ করে দীঘির পাড়ে নির্মিত হয় একটি স্মৃতিসৌধ। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি খুনিয়াদীঘি বধ্যভূমি খননের।