মেঘনাদ সাহা : একজন বাঙালি জীবনযোদ্ধা ও “আয়নায়ন তত্ত্ব” এর আবিষ্কারক! (শেষ পর্ব)

মেঘনাথ সাহা

আরেফিন শিমন, লাইফস্টাইল কন্ট্রিবিউটর, সময়ের কণ্ঠস্বর।

ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম বাঙালি রত্ম মেঘনাদ সাহার প্রাথমিক জীবন সংগ্রাম নিয়ে গত পর্বে আলোচনা করা হয়েছিল। এই পর্বে শেষ অংশ আলোচনা করা হল।

স্যার আশুতোষ মুখার্জী ১৯১৬ সালে কলকাতায় নবপ্রতিষ্ঠিত কলেজ অব সায়েন্স-এ মেঘনাদ সাহাকে পদার্থবিজ্ঞান ও মিশ্র গণিতের একজন প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দান করেন। এই পেশায় নিয়োজিত থাকাকালে মেঘনাদ সাহা লন্ডনের কিংস কলেজে তাঁর  ডক্টরাল থিসিস উপস্থাপন করেন।

১৯১৯ সালে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন এবং একই বছর ‘Selective Radiation Pressure and its Application to the Problems of Astrophysics’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ বৃত্তি লাভ করেন। এই অভিসন্দর্ভের মধ্য দিয়ে তিনি নভোপদার্থবিদ্যার (Astrophysics) গবেষণা জগতে প্রবেশ করেন এবং তাঁর নতুন কর্মকান্ডের অধ্যায় সূচিত হয়।

প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ বৃত্তি এবং গুরুপ্রসন্ন ঘোষ বৃত্তি মেঘনাদ সাহাকে ১৯২০ সালে ইউরোপ যেতে উৎসাহিত করে এবং তিনি সেখানকার ইম্পিরিয়াল কলেজে কিছুকাল গবেষণা করেন। ইম্পিরিয়াল কলেজে তিনি নরম্যান লকইয়ার-এর উত্তরাধিকারী প্রফেসর এ ফাউলার-এর সঙ্গে তাঁর সর্বাধিক বিখ্যাত বিজ্ঞান গবেষণাকর্ম ‘গ্যাসসমূহের তাপীয় আয়নায়ন’ (Thermal Ionisation of Gases) প্রকাশনার লক্ষ্যে কাজ করেন।

তাঁর তত্ত্ব হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় মানমন্দির-এর স্যার নরম্যান ও প্রফেসর পিকারিং কর্তৃকসঞ্চিত তথ্যসমূহের সুস্পষ্ট ও যথাযথ ব্যাখ্যা প্রদানে সক্ষম হয়। উপর্যুক্ত বিজ্ঞানিদ্বয় দুই লক্ষ তারকার বর্ণালি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাদের সুনির্ধারিত দলে শ্রেণীবিন্যস্ত করে।

মেঘনাদ সাহা ১৯২১ সালে তাঁর তত্ত্বের পরীক্ষামূলক যাচাই-এর উদ্দেশ্যে বার্লিন গমন করেন এবং সেখানে প্রফেসর ডবি­উ নেরনস্ত-এর গবেষণাগারে কাজ শুরু করেন। বার্লিনে গবেষণারত অবস্থায় তিনি জার্মানির পদার্থবিদদের তাঁর তত্ত্ব সম্পর্কে অবহিত করার জন্য মিউনিখের প্রফেসর সমারফিল্ডের কাছ থেকে আমন্ত্রণ লাভ করেন।

১৯২১ সালের মে মাসে মেঘনাদ সাহা বার্লিনে বক্তৃতা প্রদান করেন এবং তাঁর এই বক্তৃতা Zeitschrift fur Physik-এর ষষ্ঠ খন্ডে প্রকাশিত হয়। বার্লিনে অবস্থানের সময় তিনি কালজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন-এর সাহচর্যে আসেন। প্রায় একই সময়ে স্যার আশুতোষ খয়রা-র রাজার আর্থিক অনুদানে মেঘনাদ সাহার জন্য পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে একটি চেয়ার প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাঁকে কলকাতায় ফিরিয়ে আনেন।

তৎকালীন সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়এক সঙ্কটপূর্ণ কাল অতিবাহিত করছিল এবং ড.সাহা কলকাতায় অবস্থান করে তাঁর তত্ত্বের পরীক্ষামূলক যাচাই সংক্রান্ত গবেষণাকর্মের জন্য একটি গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

অবশেষে বন্ধু ড. এন আর ধরের চেষ্টায় অধ্যাপক সাহা ১৯২৩ সালের অক্টোবর মাসে এলাহাবাদে পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। তিনিঅত্র বিভাগের উন্নয়ন সাধন এবং এর পাঠ্যক্রম পুনর্গঠন ও গবেষণাসূচি প্রণয়নে আত্মনিয়োগ করেন।ইতোমধ্যে অধ্যাপক সাহার ‘আয়নায়ন তত্ত্ব’ (Ionisation Theory) নিয়ে কাজ করার জন্য অনেক খ্যাতনামা বিজ্ঞানীই আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

তাঁদের মধ্যে সর্বপ্রথম এবং সর্বাগ্রে ছিলেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হেনরী নরিস রাসেল। অধ্যাপক রাসেল বিভিন্ন প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র নিয়ে সাহার তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারণ নিয়ে গবেষণাকর্ম পরিচালনা করেন এবং সাহার অনেক অনুমানের যথার্থতা প্রমাণ করেন।

প্রফেসর রাসেলের পথ ধরে ক্যামব্রিজের দুজন মেধাবী স্নাতক আর.এইচ ফাউলার এবং ই.এ মিলনি মেঘনাদ সাহার তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রাখেন এবং এই তত্ত্বের নতুন নতুন প্রয়োগ চিহ্নিত করেন। ১৯২৫ সালে বিজ্ঞানী আলফ্রেড ফাউলার রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপের জন্য অধ্যাপক সাহার নাম প্রস্তাব করলে দুবছর পর সাহা এই সম্মাননা লাভ করেন।

তিনি ফ্রান্সের অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির আজীবন সদস্য এবং লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্স-এর একজন প্রতিষ্ঠাতা ফেলো ছিলেন। তিনি এককভাবে অথবা সহকর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানের বহু গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান প্রবন্ধপ্রকাশ করেন। তাঁর নতুন প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব ‘পরমাণুর গঠন’ (Structure of Atoms) পদার্থের ভৌত ধর্মাবলী (Physical phenomena) অধ্যয়নে একটি বিরাট অবদান হিসেবে প্রমাণিত হয়।

১৯৩৩ এবং ১৯৩৫ সালে ড. সাহা দুটি বিজ্ঞান সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন- একটি হচ্ছে ইন্ডিয়ান ফিজিক্যাল সোসাইটি (১৯৩৩) এবং অন্যটি  ইন্ডিয়ান সায়েন্স নিউজ এসোসিয়েশন (১৯৩৫)। এই সংবাদ সংস্থাটি ১৯৩০-এর দশকের মধ্যভাগ হতে Science and Culture নামে একটি জার্নাল প্রকাশ করে আসছিল, যেটিভারতের জাতীয় পুনর্গঠন ও পরিকল্পনা সংক্রান্ত বিতর্কে বিকল্প রাজনৈতিক উচ্চারণহিসেবে কাজ করত।

১৯৫১ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেঘনাদ সাহা তাঁর নিকটতম কংগ্রেস প্রার্থীকে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করে ভারতের লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সংশি­ষ্ট ছিলেন। শরণার্থী পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করার লক্ষ্যে ড. সাহা বেঙ্গল রিলিফ কমিটি গঠন করেছিলেন।

১৯৫৪-র পর থেকে পরিশ্রমী এই জ্ঞানকর্মীর স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে। ১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এক বৈঠকে যোগদানের উদ্দেশ্যে দিল্লীর পরিকল্পনা কমিশন দপ্তরে যাওয়ার পথে প্রফেসর মেঘনাদ সাহার মহাপ্রয়াণ ঘটে। তিনি চলে গেছেন তবু এখনো রয়ে গেছেন বিজ্ঞান জগৎ এর এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে সকলের হৃদয়ে।

সুত্রঃ ইনটারনেট।

আগের পর্ব পড়তে চাইলেঃ http://www.somoyerkonthosor.com/2017/02/18/97743.htm