বহুল আলোচিত মডেল তিন্নি হত্যাকান্ড: সেদিন যা ঘটেছিলো

বিনোদন ডেস্ক – ‘লাশটি কার?’-এই শিরোনামে একটি জাতীয় দৈনিকের ভিতরের পাতায় ছোট্ট একটি সংবাদ ছাপা হয়। এক তরুণীর লাশের ছবিসহ ওই সংবাদে বলা হয়, সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মর্গে অজ্ঞাতনামা এক তরুণীর লাশ দুই দিন ধরে পড়ে আছে। কোনো দাবিদার না থাকায় বেওয়ারিশ হিসেবে লাশ দাফনের প্রস্তুতি চলছে। পত্রিকার এই সংবাদেও কোনো দাবিদার মেলেনি। এর দুই দিন পর আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে লাশ দাফন করা হয়। দাফনের এই খবরটিও একই পত্রিকায় ছবিসহ ছাপা হয়। এই সংবাদটি তরুণীর আত্মীয়স্বজনের নজরে আসে। তারা নিশ্চিত হতে ছুটে যান আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামে। লাশ দাফনের আগে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের পক্ষ থেকে বেওয়ারিশ লাশের তুলে রাখা ছবি দেখানো হয় তাদের। স্বজনরা ছবি দেখেই নিশ্চিত! বেওয়ারিশ লাশটি আর কেউ নয়! লাশটি তাদের প্রিয় সন্তান তিন্নির! এই তিন্নি হলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় মডেল সৈয়দা তানিয়া মাহবুব তিন্নি।

আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর আগের ওই হত্যাকাণ্ডটি সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। জনমনে জন্ম দিয়েছিল নানা প্রশ্ন, কৌতূহল ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার। তদন্তের পর তদন্তে বেরিয়ে আসে নাটকীয়তায় ঘেরা নানা রহস্য। রহস্যের উন্মোচনেও যেন অপেক্ষা করছিল আরো বড় চমকের বিস্ফোরণ। যেনতেন কেউ নয়। সাবেক ছাত্রনেতা তৎকালীন এমপি মো. গোলাম ফারুক অভির সম্পৃক্ততা ওঠে আসে। শুধু হত্যা নয়, রাতের আঁধারে বুড়িগঙ্গায় লাশের সলিল সমাধির চেষ্টাও করা হয়।

কি কারণে ঘটেছিল এই হত্যাকাণ্ডটি :

মডেল তিন্নির সঙ্গে অভির পরিচয় হওয়ার পরই তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি হয়। তারা দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ান। তিন্নি ছিলেন বিবাহিত। অভির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তিন্নির সঙ্গে স্বামী শাফকাত হোসেন পিয়ালের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ২০০২ সালের ৬ নভেম্বর অভি নিজে তিন্নি ও তার স্বামী পিয়ালের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটান। এমনকি তিন্নির দেড় বছরের শিশুকন্যাসহ পিয়ালকে বাসা থেকে বের করে দেন অভি। অভি ওই বাসায়ই অবস্থান নেন। এ সময় তিন্নি বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকেন অভিকে। কিন্তু অভি তাকে বিয়ে করবেন বলে আশ্বাস দিতে থাকেন। কিন্তু কবে করবেন, তা স্পষ্ট ভাবে কখনো তিন্নিকে বলেননি। পিয়ালের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি ও তিন্নির সঙ্গে অভির সম্পর্কের বিষয়টি জানাজানি হতে থাকে। এ সময় তিন্নির সঙ্গে অভির সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। বিয়ে নিয়ে তাদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ হতে থাকে। অভির কথা মিডিয়াকে জানিয়ে দেবে বলে তিন্নি হুমকি দেয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে অভি। এরপরই হত্যার পরিকল্পনা।

পুলিশের তদন্ত থেকে জানা যায়, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অভি ২০০২ সালের ১০ নভেম্বর সন্ধ্যার পর তিন্নিকে মাথায় আঘাত করে হত্যা করেন। লাশ গুম করার জন্য গাড়িতে করে নিয়ে বুড়িগঙ্গা সেতু থেকে ফেলে দেন। তখন লাশটি পিলারের উঁচু জায়গায় পড়ে থাকে। এদিকে ১০ নভেম্বর থেকে তিন্নি নিখোঁজ হলে তার আত্মীয়স্বজনরা খোঁজখবর নিতে থাকে। পত্রিকায় তিন্নির ছবি প্রকাশের পরই অভি গাঢাকা দেন। তার আগ পর্যন্ত অভি ছিলেন প্রকাশ্যেই।

tinni-bd-model

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, আলোচিত তিন্নি হত্যা মামলার তদন্ত করতে যেয়ে পুলিশ ও গোয়েন্দারা বিভিন্ন স্থানে গিয়েছেন। তিন্নিদের বাসায় প্রতিদিনের আড্ডায় যারা আসতেন তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ জেলখানায় আটক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের সঙ্গেও কথা বলেছে। ইমন এই ঘটনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয় পুলিশকে।

লাশ উদ্ধার করা হয় যেভাবে :

১১ নভেম্বর, ২০০২ সাল। সকাল ৮টা। বুড়িগঙ্গা নদীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর নিচে পিলারের উঁচু জায়গায় অজ্ঞাতনামা এক তরুণীর লাশ পড়ে আছে। সেখানে মানুষের ভিড় বাড়ছে। ময়নাতদন্তের জন্য সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মর্গে লাশ পাঠানো হয়। সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির সময় পুলিশ লাশের শরীরের বিভিন্ন অংশে থেঁতলানো জখম দেখতে পায়। মাথার খুলিতে ভোঁতা অস্ত্রের আঘাত ছিল। আঘাতের চিহ্ন দেখে পুলিশ নিশ্চিত হয়, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। কেরানীগঞ্জ থানার এএসআই শফিউদ্দিন ওইদিন দুপুরে একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় কাউকে আসামি করা হয়নি। মামলায় বলা হয়, আগের দিন রাতের আঁধারে অজ্ঞাতনামা তরুণীকে হত্যা করে লাশ গোপন করার জন্য বুড়িগঙ্গা সেতুর নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

ময়নাতদন্ত শেষে দাবিদার না থাকায় মর্গেই পড়ে থাকে লাশটি। ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত কোনো দাবিদার না আসায় লাশটি আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেই দিনই লাশটি দাফন হয়ে যায়। এরই মধ্যে দুবার পত্রিকায় লাশ উদ্ধার ও দাফনের সংবাদ প্রকাশ হয়। পত্রিকায় ছবি দেখে তিন্নির চাচা সৈয়দ রেজাউল করিম লাশটি শনাক্ত করেন। পরে ২১ নভেম্বর লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে ফের ময়নাতদন্ত করা হয়।

এখন কোথায় অভি :

এক সময়ের আলোচিত-সমালোচিত ছাত্রনেতা গোলাম ফারুক অভি এখন কোথায়? দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় আগে দেশত্যাগ করা সাবেক এই এমপিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কোনো খবরেই। দেখাও মিলছে না কোথাও। মামলার অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, অভি এখন কানাডায় রয়েছেন। রাজধানীর রমনা থানায় দায়ের করা ১৯৯২ সালে একটি অস্ত্র মামলার ১৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ডের রায়ের পর হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে তিনি দেশ থেকে পালিয়ে যান। ২০০৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলার ঘটনায় রেড অ্যালার্ট নোটিস জারি করা হয়। ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাকে দেশে আনার চেষ্টাও করা হয়।

২০০২ সালের ১০ই নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডটি একটা বড় সময় ধরেই দেশে আলোচনার শীর্ষে ছিল। ঘটনাটির খুঁটিনাটিও ছিল টক অব দা কান্ট্রি। লাপাত্তা অভি কিংবা মামলাটি এখনও বারবার আলোচনায় ওঠে আসছে। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের বিচারও আজ সম্পন্ন হয়নি।

বিচার শুরুর পরই স্থগিত হয়ে যায় ব্যাপক আলোচিত তিন্নি হত্যা মামলার কার্যক্রম। এরপর থেকে প্রায় অর্ধযুগ ধরেই তা স্থগিত রয়েছে। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশে ঢাকা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ৭ম আদালতে মামলাটি পার করছে বছরের পর বছর। মামলার ৪১ সাক্ষীর মধ্যে একজনের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলেও সাড়ে ৫ বছরেও তা সম্পন্ন হয়নি।

ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) খোন্দকার আবদুল মান্নান বলেন, মামলাটি চাঞ্চল্যকর। প্রায় ৬ বছর ধরে স্থগিত। উচ্চ আদালতে আদেশের পর এখনও সে অবস্থায়ই রয়েছে।

আদালতসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা যায়, ১৪ বছর ৩ মাস আগে খুন হন তিন্নি। ২০০২ সালের ১০ই নভেম্বর রাতে। এর আগে ৬ই নভেম্বর অভি তিন্নিকে তার স্বামী সাক্কাত হোসেন পিয়ালের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য করে। তিন্নিও তাকে তালাক দেন। ওই দিনই অভি পিয়ালকে তার কোলের দেড় বছর বয়সী কন্যা সন্তানসহ রাজধানীর বাড়ি থেকে বের করে দেন। এরপর বিয়ে করার জন্য অভিকে চাপ দিতে থাকেন তিন্নি। একপর্যায়ে তিন্নি বিষয়টি সাংবাদিকদের কাছে ফাঁস করে দেয়ার হুমকি দেন। ১০ই নভেম্বর রাতে তার মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়। এরপর গুমের উদ্দেশ্যে ওই রাতে গাড়িতে নিয়ে বুড়িগঙ্গায় ১নং চীন মৈত্রী সেতুর ওপর থেকে নদীতে লাশ ফেলে দেয়। কিন্তু পানিতে নয়, লাশটি পড়ে পিলারের উচুঁ অংশে।

পরদিন ১১ই নভেম্বর সকালে লাশ ঘিরে জড়ো হয় উৎসুক জনতার ভিড়। কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ উদ্ধার করে সুরতহালের পর ময়নাতদন্ত করে। মর্গে চারদিন রাখার পর ১৫ই নভেম্বর অজ্ঞাত হিসেবেই জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়। এদিকে তার চাচা সৈয়দ রেজাউল করিম কেরানীগঞ্জ থানায় একটি হারানো ডায়েরি করেন। লাশ উদ্ধারের দিনই একই থানায় একটি হত্যা মামলা করেন একই থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মো. শফি উদ্দিন। অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তদের তাতে আসামি করা হয়। পরে সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি ছোট্ট সংবাদের সূত্র ধরে তিন্নির স্বজনরা আঞ্জুমানে মুফিদুলে যান। ছবি দেখেই চিনে ফেলেন তাদের প্রিয় তিন্নির লাশ। এরপরই ঘটনাটি ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।