‘ফকিরের ভাব তো মনোজগতে! ভাব আনতে গাঁজা খেতে হবে কেন?’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক- আশ্রয় লালন। ফকিরি গান তাঁর কাছে একরকম যুদ্ধ। রবীন্দ্রভক্ত মনসুর ফকিরের গল্প শুনলেন এবেলার স্যমন্তক ঘোষ।

imakkkgeলোকে বলে, বাউল-ফকিরি গানে আপনি নিজেই একটা প্রতিষ্ঠান। মানেন সে কথা?
বাউল-ফকিরের কোনও প্রতিষ্ঠান হয় না ! ফলে, নিজেকে প্রতিষ্ঠান মনে করার কোনও কারণ নেই। আর যদি সেভাবে ভাবতেই হয়, তাহলে বাবার কথা বলতে হয়। ওঁর জন্যই আজ গোরভাঙায় সকলে গান-বাজনা করতে পারছি।

আপনি আজহার ফকিরের কথা বলছেন! নদিয়ার এই প্রত্যন্ত প্রান্তে কীভাবে ফকিরি গানের চর্চা শুরু হল, ছড়িয়ে পড়ল, সে বিষয়ে কিছু বলবেন?
সে তো অনেক কথা ! সব কথা সবসময় মনেও থাকে না। তবে, ছোটবেলা থেকেই দেখতাম, বাবার কাছে কত সাধক আসেন ! বাড়িতে সারাদিন দর্শনচর্চা, গান ! শুনে-শুনেই তো শিখেছি গান ! আর পাশাপাশি শিখেছি গানের জন্য যুদ্ধ করতেও।

যুদ্ধ? গান গাওয়ার জন্য যুদ্ধ করতে হয় নাকি?
হয় না? কম যুদ্ধ করেছি আমরা? আমাদের এই অঞ্চলে বাউল-ফকিরের গানকে একসময় গুনাহ হিসেবে ধরা হতো। আমরা গানবাজনা করতাম বলে সমাজ আমাদের একঘরে করে রেখেছিল। কোনও সামাজিক উৎসবে যোগ দিতে পারতাম না। আমাদের বাড়ির অনুষ্ঠানেও কেউ যোগ দিতেন না। মৌলবাদীদের ভয়ে। রাস্তায় নেমে লড়াই করতে হয়েছে ওদের বিরুদ্ধে। মৌলবাদের সঙ্গে। মানুষকে বোঝাতে হয়েছে, শিল্প কখনও গুনাহ হতে পারে না। বহু লড়াইয়ের পর আজ সকলে ফকিরি গান শুনতে আমাদের এলাকায় আসেন। এখানকার মানুষও আমাদের সম্মান করেন। সেটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া। সকলে দেখছেন, দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ ছুটে আসছেন আমাদের ছোট্ট এই গোরভাঙায়। বাবার মাজারে বসে গান শুনছেন। মেলায় আসছেন। পরিবেশটাই বদলে গিয়েছে।

মৌলবাদীরা কি তাহলে পিছু হটেছে? আর সমস্যা হচ্ছে না?
(এক গাল হাসি) আপাতত আর কোনও লড়াই নেই। ওরা বুঝতে পেরেছে যে, হেরে গিয়েছে। যদি আবার আসে, আবার লড়াই হবে। গানই তো আমাদের অস্ত্র !

বাউল-ফকিরেরা তো প্রেমের কথা, ভালবাসার কথা বলেন ! আপনি লড়াইয়ের কথা বলছেন?
এ লড়াইও তো প্রেমের লড়াই ! ধর্মের লড়াই ! ধর্মের নামে দীর্ঘদিন ধরে যারা হিংসার কথা বলে আসছে, এ লড়াই তাদের বিরুদ্ধে। মানুষকে বোঝানো দরকার, ধর্ম কখনও শিল্পবিরোধী হতে পারে না। প্রেমের জিনিসকে কাছে পেতে গেলে কখনও কখনও লড়াই করতে হয় বইকী !

বাউল-ফকিরের গান তো এখন শহুরে ফ্যাশন! গিটার-ড্রামস বাজিয়ে শহরের ব্যান্ডগুলো বাউলগান গাইছে। আপনার ভাল লাগে এসব?
ভাল হলে ভাল লাগে ! ওসব ফিউশন-টিউশন আমি বুঝি না। ভাল এবং মন্দ কানে ধরা পড়ে। চারদিকে যা হচ্ছে, তার সবটাকে ভাল বলা যায় না। বাউল-ফকিরের গান নিয়ে ব্যবসা চলে না। দুঃখের কথা, সেটা হচ্ছে !

মন ভাল না-থাকলে কার গানে আশ্রয় খুঁজে পান?
লালন, লালন আর লালন। ওঁর গানেই মন ভাল হয়, মন ভেঙে যায় ! ঘুম ভাঙে, ঘুম আসে ! আরও একজনও অাছেন ! রবীন্দ্রনাথ ! তিনিও আশ্রয় ! মস্ত মাপের বাউল ছিলেন লোকটা !

অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসংগীতও তো গান আপনি?
শান্তিদেব ঘোষের কাছে গিয়ে শিখেছি রবীন্দ্রসংগীত। শান্তিনিকেতনে। খুব ভালবাসতেন আমায়। রবীন্দ্রনাথের গান আমার হৃদয়ে।

লোকজন বলে, গাঁজা না-খেলে নাকি বাউলের ভাব আসে না। মানেন?
বাজে কথা। একদম বাজে কথা এসব। ফকিরের ভাব তো মনোজগতে ! ভাব আনতে গাঁজা খেতে হবে কেন? ‘শহুরে বাউলে’রাই ওসব কথা বলে। যাদের কলিজায় সত্যিকারের ভাব নেই। শহরের বাউল-ফকির উৎসবে গিয়ে দেখেছি, মাঠ জুড়ে যেন নেশার ঠেক বসে গিয়েছে ! দেখলে বিরক্ত লাগে !