চাঞ্চল্যকর এমপি লিটন হত্যা: আরো একজন গ্রেপ্তার, নতুন আসামির সন্ধানে পুলিশ

গাইবান্ধা প্রতিনিধি – বহুল আলোচিত গাইবান্ধার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম লিটন হত্যা মামলায় আরো এক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আনোয়ারুল ইসলাম ওরফে রানা নামের এই আসামিকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এনিয়ে এ মামলায় সাবেক এমপি কাদের খানসহ ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হলো।

লিটন হত্যা মামলার অগ্রগতি জানাতে বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংবাদ ব্রিফিং করেন পুলিশ সুপার মো. আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, বুধবার বিকেলে গ্রেপ্তারের পর রানাকে গাইবান্ধায় আনা হচ্ছে। রানা বাবার নাম তমশের আলী। সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ভেলারায় কাজিরভিটা গ্রামে তাঁর বাড়ি।

বুধবার চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, সাংসদ মনজুরুল হত্যার ‘পরিকল্পনাকারী’ আবদুল কাদের খান। তাঁর ইচ্ছা ছিল, মনজুরুলকে সরিয়ে পথ পরিষ্কার করে পরবর্তী সময়ে সাংসদ হবেন।

এদিকে লিটন হত্যা মামলায় জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি ডা. আবদুল কাদের খানকে ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। পুলিশের আবেদনের প্রেক্ষিতে বুধবার দুপুরে গাইবান্ধার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম মইনুল হাসান ইউসুব রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

mp-liton-death-arest

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি শফিকুর রহমান বলেন, লিটন হত্যা মামলায় কাদের খানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানায় পুলিশ। শুনানি শেষে পুলিশের আবেদন মঞ্জুর করেন আদালত।

মামলার অগ্রগতি জানাতে বুধবার সকালে গাইবান্ধা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক সঙবাদ সম্মেলনে পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক দাবি করেন, লিটন হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী গাইবান্ধা-১ আসনে সাবেক এমপি ও জাতীয় পার্টির (জাপা-এরশাদ) সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) ডা. মো. আবদুল কাদের খান। তিনি এক বছর ধরে এই হত্যার পরিকল্পনা করেন।

এর আগে টানা ৬ দিন কার্যত গৃহবন্দি করে রাখার পর মঙ্গলবার বগুড়ার শহরের বাসা থেকে কাদের খানকে গ্রেপ্তার করে গাইবান্ধা জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর বুধবার তাকে আদালতে তুলে রিমান্ড চাওয়া হয়।

রাতে জেলা পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘খুনের মোটিভ এখনো আমরা শতভাগ নিশ্চিত হতে পারিনি। তাকে (কাদের খান) রিমান্ডে এনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’

তিনি জানান, কাদের খানের ব্যক্তিগত লাইসেন্স করা অস্ত্র ব্যবহার করে এমপি লিটনকে খুন করা হয়। কাদের খানের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় ভাড়া করা সন্ত্রাসী দিয়ে এমপি লিটনকে খুন করা হয়।

লিটন হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা উঠে এসেছে গ্রেপ্তার ৩ যুবকের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে। তারা ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

তারা হলেন- কাদের খানের ভাতিজা শাহীন মিয়া, গাড়িচালক আবদুল হান্নান ও ব্যক্তিগত সহকারী রাশেদুল ইসলাম মেহেদী।

মঙ্গলবার ভোরে গাইবান্ধা শহরের ব্রিজ রোড এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করে রাত ৮টার দিকে গাইবান্ধার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে তোলা হয়। আদালতে বিচারক মইনুল হাসান ইউসুফের কাছে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে তারা জবানন্দি দেয়।

পুলিশের দাবি, লিটনকে হত্যার জন্য কাদের খান ৭ লাখ টাকায় তিন খুনি ভাড়া করেন। এই খুনিরা আবার তার সহযোগী। এদের মধ্যে মেহেদী ও শাহীন গ্রেপ্তার হয়েছে। এরা দু’জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। আরেক খুনি রানা পলাতক রয়েছে। স্বীকারোক্তিতে তারা খুনের আদ্যপান্ত বর্ণনা করেছে। এমনকি সুন্দরগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি শামীমকে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কেও বলেছে ওই দুই জন।

পুলিশের দাবি, কাদের খানের পরবর্তী টার্গেট ছিল সুন্দরগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী।

কাদের খান ২০০৮ সালে গাইবান্ধা-১ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেছেন, ‘ডা. কর্নেল (অব.) কাদের খান ৩ বছর আগেই জাতীয় পার্টি ছেড়েছেন। তার সঙ্গে এখন পার্টির কোনো সম্পর্ক নেই।’

উল্লেখ্য, গত ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নিজের বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয় গাইবান্ধা-১ আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে। ঘরের ভেতর ঢুকে খুব কাছ থেকে এমপিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে সন্ত্রসীরা। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এ মামলায় এ পর্যন্ত ২৩ জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ।