‘সাংবাদিকদের প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে হবে’

রাজু আহমেদ, সময়ের কণ্ঠস্বর:

দেশজুড়ে অব্যহত ও ধারাবাহিক সাংবাদিকদের প্রতি বর্বোরচিত হামলা, নির্যাতন ও লাঞ্ছনার ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে দেশের গোটা সাংবাদিক সমাজ। এ ঘটনায় গোটা জাতির বিবেক আজ প্রশ্নবিদ্ধ।

আধুনিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠ বাহন সংবাদপত্র। সংবাদপত্র সমস্ত বিশ্বের নতুন নতুন খবর নিয়ে প্রতিদিন সকালেই আমাদের দ্বার প্রান্তে হাজির হয়। গণতান্ত্রিক যে কোন দেশে সংবাদপত্রই সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের দর্পণ। সমাজ গঠনে দৈনন্দিন পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পৃক্ততায় এবং নিরন্তর তার বস্তুনিষ্ঠ উপস্থাপনায় সংবাদপত্র শক্তিশালী গণমাধ্যম। জনমতের প্রতিফলনে ও জনমত গঠনে সংবাদপত্র পালন করে শক্তিশালী ভূমিকা, গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বহু দল ও মতের ধারক-বাহক হিসেবে সংবাদপত্র সরকার ও জনগণের মাঝে সেতুবন্ধন রচনা করে।

মানুষের ছোট-বড় নানা কৌতুহল মেটাতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সংবাদপত্রের নানা রূপান্তর ঘটেছে। দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক পত্রিকা, বিভিন্ন টেলিভিশন সহ অনলাইন ভিত্তিক নিউজ পোর্টাল গুলোও বিশ্বব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আর এই সংবাদপত্র গুলো জনসাধারনের স্বার্থ রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরী। সংবাদপত্র তার আদর্শানুযায়ী বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন সহ একদিকে যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, তেমনি ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠার জন্যও বিশ্বব্যাপী সংগ্রাম করে আসছে বহুকাল। সংবাদপত্র কখনোই ক্ষুদ্র স্বার্থের কথা চিন্তা না করে দেশ ও জাতির বৃহত্তর কল্যানে কাজ করে। ফলে বিশ্বের সকল দেশেই সংবাদপত্র জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম ও সার্থক হয়েছে। বিশ্বের রাজনীতি, সমাজ নীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, বাণিজ্য, সাহিত্য, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, আমোদ-প্রমোদ সহ সকল ক্ষেত্রেই সংবাদপত্রের অবাধ পদচারণা। দৈনন্দিন জীবনের নানা অপরিহার্য তথ্যও প্রতিদিন আমাদের হাতে তুলে দেয় সংবাদপত্র। সম্রাজ্যবাদী কিংবা আগ্রাসী তৎপরতা যখন সভ্যতাকে গ্রাস করে, তখন সংবাদ পত্র তার বিরুদ্ধে মানবতার জাগরণ ঘটায়। যেখানেই মানবতার লাঞ্ছনা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিবেকের কণ্ঠরোধ, সেখানেই সংবাদপত্রের কণ্ঠস্বর নেয় প্রতিবাদী ভূমিকা।

press-somoyerkonthosor

এভাবে দেশ ও বিশ্ববাসীকে দ্রুত ঘটনাস্থালে ছুটে গিয়ে বিপন্ন মানবতার পাশে দাঁড়ায় সংবাদপত্র গুলোতে কর্মরত সাংবাদিকগণ।

চরম দুঃখজনক হলেও সত্য, এই মহান পেশাগত দায়ত্বি পালন করতে গিয়ে দেশের সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত ও নির্যাতিত হওয়ার ঘটনা দেশব্যাপী উদ্বেগ জনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার পটুয়াখালীতে ফ্লেক্সিলোডের দোকানে পোষ্টার ছিড়ে ফেলার মত সাধারণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাইনুল নামের এক সংবাদকর্মীর মুখমন্ডল ইট দিয়ে থেতলে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। গত ৯ই ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মিরপুরের গুদারাঘাট এলাকায় চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করায় লাঞ্ছনার স্বীকার হন মিরপুর ভিত্তিক সাংবাদিক কল্যান কো-অপারেটিভ সোসাইটির যুগ্ম- সম্পাদক ও বিশিষ্ট সাংবাদিক রাজু আহমেদ। ১৭ই ফেব্রুয়ারি মিরপুরের পল্লবীতে আক্তার নামের একজন স্থানীয় সাংবাদিক কে নির্যাতনের ঘটনার প্রতিবাদ করায় স্থানীয় চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ ও প্রতারক চক্রের হাতে বর্বোরচিত হামলার স্বীকার হয়েছেন স্থানীয় আটজন সাংবাদিক। গত মাসে সিরাজগঞ্জে একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে দৈনিক সমকালের স্থানীয় প্রতিনিধি শিমুলকে। শাহাবাগে সংবাদ সংগ্রহের সময় পুলিশের বর্বোরচিত হামলার স্বীকার হন দেশের জনপ্রিয় একটি টেলিভিশন চ্যানেলের দুই সাংবাদিক। এই ঘটনাগুলোর রেশ এখনো দেশ জুড়ে বিদ্যমান। ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে দেশের গোটা সাংবাদিক সমাজ আজ ফুঁসে উঠেছে। সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যা মামলাটিও বছরের পর বছর আদালত থেকে আদালতে আইনের ফাঁক-ফোঁকড়ের সমুদ্রে বিচারের আশায় খাবি খাচ্ছে।

দেশ জুড়ে সাংবাদিকদের প্রতি এই সহিংসতা বন্ধসহ বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে সাংবাদিকদের সার্বিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা বিধানে সরকারকে আশু ইতিবাচক ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে বলে বিশেষজ্ঞ মহল দাবি করেছেন। এ সংক্রান্ত বর্বোরচিত ঘটনাগুলির দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত সহ অপরাধীদের যথাযোগ্য শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

সংবাদপত্র গুলোর শুধুমাত্র ইতিবাচক দিকই রয়েছে তাই নয়; কিছু নেতিবাচক দিকও পরিলক্ষিত হয়। সংবাদপত্র জনকল্যানের একটি বস্তুনিষ্ঠ মাধ্যম হলেও আজকাল কিছু সংবাদপত্রের পরিচালক ও সাংবাদিকগণ জনকল্যাণের মহান উদ্দেশ্যকে ভুলে গিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ কিংবা দলগত স্বার্থ সিদ্ধির জন্য সংবাদপত্রকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। যার মারাতœক প্রভাব পড়ছে জাতীয় জীবনে। কিছু দায়িত্ব-জ্ঞানহীন সংবাদপত্রের উসকানিমূলক প্রচারের জন্য দেশে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, মারামারি-হানাহানি, হিংসা-বিদ্বেষ, কুৎসা ও মিথ্যা রটনা ব্যাপক আকার ধারণ করে।
এক্ষেত্রে, জনস্বার্থ ও মানবতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থানই সংবাদ পত্রকে সত্যিকার অর্থে জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।