‘নতজানু হলো শিক্ষক সমাজ’! ‘লজ্জার এক নতুন ইতিহাস’ জন্ম দিলো ছাত্রলীগ কর্মীরা?

রাজশাহী প্রতিনিধি, সময়ের কণ্ঠস্বর-

প্রিয় পাঠক, শিরোনামেই কিছুটা ‘ঝাকি’ নিশ্চয়ই খেয়েছেন আপনিও! এতদিন তবে কী ‘ভুলটাই’ জেনে এসেছি আমরা ?  নৈতিক দায়িত্ব আর কর্তব্যের যত্নে যুগ যুগ ধরে পরীক্ষার হলে অসদুপায় অবলম্বনকারী শিক্ষার্থীদের  শাস্তি দিয়ে এসেছেন শিক্ষকেরা। সামান্য কিছু ক্ষেত্রে এ নিয়মের খানিকটা ‘ব্যত্যয়’ ঘটলেও,  পুরো চিত্র উল্টে যাবার দৃশ্য খুব একটা চোখে পড়েনি আমাদের।

তবে দ্রুতই সবকিছু বদলে যাবার যুগে এবার বুঝি সামিল হলো ব্যতিক্রমি ‘চিত্র বদলের’ একটি ঘটনা।  এমন ঘটনা ইতিহাসের ‘কলংক’ হবারও প্রবল সম্ভাবনা রাখে! নকলরত অবস্থায় শিক্ষার্থীকে ধরার ‘অপরাধে’ এবার ‘ভাগ্যের জোরে’ কোনমতেই হয়তো  নিশ্চিত ‘উল্টো শাস্তি’র হাত থেকে ‘রক্ষা পেয়েছেন এক শিক্ষক!

এ নিয়ে চলছে জোর আলোচনা- সমালোচনা। তবে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ ভাবে এই ঘটনার প্রতিবাদে ঐ ‘অসহায় শিক্ষকের’ পাশে না দাঁড়িয়ে অনেকটা কৌশলে সহকর্মী শিক্ষকেরা ‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’ পদ্ধতিতে গাঁ বাঁচিয়ে চলছেন আপাতত!

শিক্ষক সমাজের অনেকেই বলছেন, এমন ঘটনা আগামীতে শিক্ষক সমাজের জন্য একটি ‘অশনীসংকেত বার্তা’ও হতে পারে। নিজের জীবন বিপন্ন করে অনেক শিক্ষক নিশ্চইয় পরবর্তীতে নকলরত কোন শিক্ষার্থীকে ধরে শাস্তি দেবার আগে চিন্তা করবেন, ‘উলটো শাস্তির মুখে আবার না পড়ি নিজেই!’

এবার অভিযোগ উঠেছে, নকল করে ধরা পড়ে শাস্তির মুখে পড়ার আগে নিজেই শাস্তির মুখে পড়েছেন এক কলেজ শিক্ষক। তবে শিক্ষার্থী ছাত্রলীগের ঐ  কর্মীর কাছে ক্ষমা চেয়ে আপাতত ‘পার পেয়েছেন’  রাজশাহীর নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের ঐ শিক্ষক।

শিক্ষার্থীর নকল ধরায় কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি ও সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল আওয়াল আনসারীকে অস্ত্রশস্ত্রের মুখে জিম্মি করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেছেন ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা।

শনিবার দুপুরের পর এ ঘটনা ঘটে। এর আগে ওই শিক্ষকের ওপর চড়াও হন বিক্ষুদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা।  বিষয়টিকে  শিক্ষক সমাজের জন্য অবমাননাকর বলে উল্লেখ করেছেন সেখানকার অন্য শিক্ষকরা। তবে ‘অজানা আতংকে’ এ নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলছে না কেউ।

নাম না প্রকাশের শর্তে প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাথে আলাপকালে তারা সময়ের কণ্ঠস্বরকে  জানায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে শনিবার নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজের প্রথম বর্ষের ইনকোর্স পরীক্ষা চলছিল। দুপুর ১টার পর শুরু হয় এ পরীক্ষা। পরীক্ষা চলাকালে ৪০১ নম্বর কক্ষে অসদ-উপায় অবলম্বনের চেষ্টা করেন ছাত্রলীগ কর্মী ফাহিম।

এসময় তাকে বাধা দেন কর্তব্যরত শিক্ষক রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি আব্দুল আওয়াল আনসারী এবং সহকারী অধ্যাপক তানবিরুল হক। শিক্ষকের এমন সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করে প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ফাহিম পরীক্ষার হলে চিৎকার-চেঁচামেচি করে বের হয়ে আসেন। কিছুক্ষন পরে তিনি ছাত্রলীগের অন্য নেতাকর্মীদের ফোনে ডেকে নেন ক্যাম্পাসে। সাবেক ও বর্তমান ছাত্রলীগের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের একদল নেতা-কর্মী চলে আসেন ক্যাম্পাসে।

এরপর ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদে ফেটে পড়েন ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা। একপর্যায়ে অফিসকক্ষে একপ্রকা’ অবরুদ্ধ’ করে ওই শিক্ষককে সবার সামনে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতার কাছে ‘ক্ষমা চাইতে বাধ্য’ করেন তারা।মান-সম্মানের ভয়ে কলেজে বিশৃংখল পরিস্থিতি এড়াতে ও ‘ নিশ্চিত আসন্ন বিপদ’ থেকে রক্ষা পেতে ওই শিক্ষক অফিসের সামনে ক্ষমা চান তার প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফাহিমের কাছে।

এ সম্পর্কে জানতে ওই শিক্ষকের মুঠোফোনে বেশ কবার চেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি ।

এরপর এ বিষয়ে জানতে অধ্যক্ষ অধ্যাপক জার্জিস কাদিরকে ফোন করা হলে তিনি জানান,  এমন ঘটনার কথা তাকে অফিশিয়ালি কেও জানায়নি । যদি সত্যিই  এ ঘটনা ঘটেই থাকে তা হলে এটি শিক্ষকদের জন্য কলঙ্কজনক। অধ্যক্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য তিনি বর্তমানে  ঢাকায় আছেন উল্লেখ করে তিনি জানান, ঢাকা থেকে ফেরার পর  বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন তিনি।

অন্যদিকে, বর্তমানে অধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকা উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক হাবিবুর রহমানের কাছে মুঠোফোনে  ঘটনার সত্যতা জানতে চাইলে তিনি ঘটনার কথা  স্বীকার করে  বলেন, ‘ বিষয়টি সবার উপস্থিতিতেই ‘মীমাংসা’ হয়ে গেছে। এ নিয়ে আর কিছু বলার নেই আমার।

কিন্তু কী ধরনের মীমাংসা হয়েছে?  এমন প্রশ্নের জবাব  এড়িয়ে গিয়ে এই অধ্যক্ষ্য জানান, ‘লাঞ্ছিত’ করার মতো ঘটনা ঘটেনি! ওই শিক্ষার্থী এর আগেও বিধি ভঙ্গ করে একটি পরীক্ষা দেয়নি। শনিবারও সে পরীক্ষা হল থেকে বের হয়ে যেতে চাচ্ছিল। ইনকোর্স পরীক্ষায় বের হওয়ার কোনো নিয়ম নেই। সে কারণে সেখানে কর্তব্যরত শিক্ষক  বাধা দেন। পরে ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন নেতা সেখানে উপস্থিত হয়ে বিষয়টির ‘শান্তিপূর্ণ’ সমাধান করেন।’

সাধারন শিক্ষার্থীদের বক্তব্য হলো, ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ একটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠন। বৃহৎ এই সংগঠনের দেখভাল করার গুরু দায়ভার নিজের হাতে রেখে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপ্রান চেষ্টা করেন তাদেরকে সুশৃংখল রাখার। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় পরিষদের দায়িত্বে থাকা ছাত্রনেতারও দলটিকে ‘সন্ত্রাসমুক্ত করে সুশৃঙ্খল করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কাজ করে চলেছেন। সেখানে ছাত্রলীগের ব্যানারে  কোন দুস্কৃতিকারী গোষ্ঠীর দ্বারা ‘অপকর্ম, সন্ত্রাস, উছৃংখলতার দায়ভার অবশ্যই নেবেনা কেন্দ্রীয় নেতারা। তাদের দাবী, খুব দ্রুতই তদন্ত সাপেক্ষে  বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।