বরগুনায় তিন হাজার শিশু ইটভাটায় শ্রমিকের কাজে নিয়োজিত

মোঃ আবু সাইদ খোকন, বরগুনা প্রতিনিধি: বরগুনায় বৈধ-অবৈধ শতাধিক ইটভাটায় প্রায় তিন হাজার শিশু শ্রমিকের কাজে নিয়োজিত আছেন।

it-vata

এতে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া এবং ধুলা ময়লার কারনে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে এসব কোমলমতি শিশুরা। পরিবারের অসচেতনতা ও দারিদ্রতার কারনেই এ পরিস্থিতির শিকার বলে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে।

বরগুনা সদর, আমতলী, তালতলী, বেতাগী ও পাথরঘাটা উপজেলার একাধিক ইটভাটায় গিয়ে দেখা গেছে, এসব শিশুরা বাবা-মায়ের সাথে অথবা বাবা-মা ছাড়াই ৮ থেকে ১৬ বছরের কমপক্ষে তিন হাজার শিশু ভাটার কাজে নিয়োজিত আছে। এসব শিশু এবং শিশুদের বাবা-মায়ের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অনেকটা বাবা-মায়ের অসচেতনতা এবং দারিদ্রতার কারনেই তাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নামানো হচ্ছে। অন্যদিকে ভাটার মালিকরা কম বেতনে বেশি কাজ করানোর জন্যই এসব কোমলমতি শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করছেন।

বরগুনা জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলায় অনুমোদিত ইটভাটা ২৭টি। অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে ভাটার সংখ্যা ৫৪টি। এর মধ্যে পরিবেশ ছাড়পত্র আছে ৩২টির, অনুমোদনহীন ইটভাটা ১৫টি ও ১২০ ফুট উচ্চতার স্থায়ী চিমনি আছে ৭টি। তবে স্থানীয় হিসাবে জেলায় বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে শতাধিক ইটভাটা ও পাজা আছে। প্রতিটি ইটভাটাতেই শিশুরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে।

জেলার আমতলী উপজেলার তালুকদার বাজারে এইচআরপি ব্রিক্স-এ গিয়ে দেখা যায়, বেশ কিছু শিশু ভাটার বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত আছে। এ সময় কথা হয় উপজেলার রাওগা গ্রামের জয়নাল হাওলাদারের দুই ছেলে মনু (১৩) ও রাসেল (১১) এর সাথে। তারা জানায়, ৮ বছর বয়স থেকেই তারা ইটভাটায় কাজ করে আসছে। বর্তমানে কাজ করে সপ্তাহে ৭শ’ থেকে ৮শ’ টাকা পায় তারা। এ টাকা নিয়ে বাবার সংসারেই দেয় মনু ও রাসেল।

লেখাপড়া করতে ইচ্ছা হয় কিনা এমন প্রশ্ন করা হলে মনু বলেন, “ ল্যাহা পড়া করতে তো মোনে চায়-ই, তাইলে মোরা কাজ না করলে খামু কি?”। একই ভাটায় শ্রমিকের কাজে নিয়োজিত রায়হান ও হৃদয় জানান, তারা দুইজনই এ বছর পঞ্চম শ্রেণীতে পাশ করে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছেন। দুটি বাই সাইকেল কেনার জন্য তারা ভাটায় শ্রমিকের কাজ করতে আসছে। কথা হয় শাহীন নামের আরেক শিশুর সাথে। শাহীন বলেন, মোরা পাঁচ ভাই বোন, সবাই শ্রমিকের কাজ করি। ধুলা ময়লায় শরীরের ক্ষতি হয়না ? শাহীনকে এমন প্রশ্ন করা হলে বলেন, “রাইতে ঘুমাইতে গ্যালে মাঝে মাঝে কাশ (কাশি) হয়”।

শুধু তালুকদার বাজারে এইচআরপি ব্রিক্স নয়, উপজেলার মহিষডাঙ্গায় সোবাহান কাজীর এমসিকে ব্রিক্স, তালতলা এইচবিএম, কশোরখান ব্রিক্সসহ সকল ভাটায়ই এভাবে শত শত শিশু শ্রমিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন।

বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুস সালাম বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ইটভাটায় কর্মরত শিশুরা মারত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইটভাটায় দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে বিষাক্ত ধোঁয়া ও ধুলাবালিতে শিশুদের ত্বক ও নখ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি রক্তস্বল্পতা, অ্যাজমা, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

শ্রম আইন-২০০৬-এর ২৮৪ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি কোনো শিশু বা কিশোরকে চাকরিতে নিযুক্ত করলে অথবা আইনের কোনো বিধান লঙ্ঘন করে কোনো শিশুকে চাকরি করার অনুমতি দিলে, তিনি ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডে দন্ডনীয় হবেন।

ঝুঁকিপূর্ণ এসব কাজে শিশুদের নিযুক্ত করার বিষয়ে বরগুনা ইটভাটা সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন দাবি করেন, অধিকাংশ ইটভাটাতেই শিশু শ্রমিক নেই তবে কিছু শিশু আছে যারা তাদের বাবা মায়ের সাথে এখানে আসে। এক্ষেত্রে তাদেরকে শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় না।

এ বিষয়ে বরগুনার জেলা প্রশাসক ড. মহা: বশিরুল আলম সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, শিশুশ্রম আইনগত ভাবে নিষিদ্ধ। তবে বিভিন্ন কারনে অনেক সময় হয়ে থাকে। তাই বরগুনার ইটভাটা মালিকদের সাথে কথা বলে এবং খোঁজ খবর নিয়ে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিযুক্ত পাওয়া গেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।