দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বেদে সম্প্রদায়দের বাঁচার জন্য লড়াই

অনীল চন্দ্র রায়, ফুলবাড়ী প্রতিনিধি: দেশে বেদে সম্প্রদায়ের মানবেতর জীবন-যাপনের করুন পরীনিতি। এরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বেদে সম্প্রদায়রা দু-মুঠো খাবারের জন্য লড়াই সংগ্রাম করে দিন কাটাচ্ছে। যেন দেখার কেউ নেই। তারা কি ভাবে জীবন-যাপন করছে, বাস্তবে না দেখলে বোঝার উপায় নেই।

bada

বেশির ভাগ বেদে সম্প্রদায়ের পরিবার গুলি দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলাতে পরিবার পরিজন নিয়ে খোলা আকাশের নিছে তাবু টাংগিয়ে দিনের পর দিন পার করছে। তার কি খেয়ে বেঁচে আছে এবং কিভাবে জীবন-যাপন করছে এটুকু খোঁজ খবর নেওয়া এ জগতে কেউ নেই বলে জানান, বেদে সম্প্রদায়ের সদ্দার আব্দুল রব মিয়া (৫৬), ধনা মিয়া (৪০), সাদ্দাম মিয়া (৩৬)। তারা সবাই ঢাকা সাভার থেকে এসেছে।

দশ থেকে পনেরটি পরিবার গত দেড় মাস আগে ঢাকা সাভার থেকে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়ন ও বর্তমানে নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের সীমান্ত ঘেষা গোরক মন্ডপ গ্রামের বিডিআর বাজারের দক্ষিণ পার্শ্বে খোলা আকাশের নিচে তাবু টাংগিয়ে বসবাস করে। বেদে সম্প্রদায়ের একমাত্র পেশা সাপ ধরা, গ্রামে গ্রামে সাপের খেলা দেখানো, ময়না পাখির খেলা, দাতের পোকা বের করানো, সিংগা বিশ বার করা ও তাবিজ কবোজ বিক্রি করেই যা আয় হয় তা দিয়ে কোন রকমে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে থাকা। তবে এখনকার যুগে মানুষ আর আগের মত সাপের খেলা, পাখির দাতের পোকা বের করাসহ ঝাঁড় ফুক ও তাবিজ কোবজ যের প্রতি মানুষের বিশ্বাস উঠে গেছে। তার পরেও তারা বাপ-দাদার পেশা যুগের পর যুগ ধরে আছে।

আজ সোমবার দুপুরে বেদে সম্প্রদায়ের বসবাস স্থলে গিয়ে দেখা গেছে তাদের এই করুন চিত্র। দু-বেলা খাবারের জন্য তাদের কেউ কেউ চলে গেছে গ্রামের নির্ভৃত পল্লীতে সাপের খেলা, ময়না পাখির খেলা, দাঁতের পোকা বের করা ঝাড় ফুকসহ তাবিজ-কোবজ বিক্রির জন্য। বেদে সম্প্রদায়ের সদ্দার আব্দুল রব তাদের পোশা সাপ গুলোকে খাবার খাওয়াচ্ছেন। কেউ আলু সেদ্ধ ভাত চুলায় তুলেছে। আবার কেউ সাদা ভাত আলুর সানা দিয়ে ক্ষীধা নিবারনের জন্য অনেক কষ্টে খাচ্ছে। সাত থেকে আটজন শিশু তাবুর পাশে খেলছে।

শিশু সকিরন, শাকিলা, রুজিনা, সাব্বির, আশা, সানিসহ তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময়ে তারা সকলেই জানান, ভাল নেই, আমরা গরীব ঘরের সন্তান, ঠিকমত দু-বেলা খেতে পারি না, বাবা সারাদিন ১শ থেকে দেড়শ টাকা আয় করে তা দিয়ে কি হামার জীবন চলে। হামার ঠিকমত খাবারে জোটে না আবার পড়াশুনা করবো কি ভাবে। আমাদের দেখছেন না আমরা তাবুতে থাকি। আপনারা তো ধনী মানুষ বড় বড় ঘরে থাকে ভাল ভাল খাবার খান। আমরা প্রতিদিনেই সাদা ভাত আর আলু সানা দিয়ে দু-বেলা খাবার জোটে। কোন কোন দিন খাবারও জোটে না। সেই দিন না খেয়ে থাকতে হয়।

নাই ভাল জামা-কাপড়, লেখাপড়ার জন্য মনটা চায় কিন্তু দু-বেলা খাবারের জন্য দেশ-বিদেশে বাবার সাথে থাকতে হয় কি করে স্কুলে যাব। আমাদের পড়াশুনা করে কি হবে ? আমরা পেট ভরে খেতে চাই। কেউ আমাদের খোঁজ খবর রাখে না। এই কথাগুলো অনেকটা কষ্টের সাথে এই প্রতিবেদককে বললেন নয় থেকে দশ বছরের শিশুরা।

বেদে সম্প্রদায়ের সদ্দার আব্দুল রব মিয়া জানান, দেশে প্রায় ৬০ হাজার বেদে সম্প্রদায় আছে। তাদের বেশির ভাগ পরিবারের করুন পরিনিতি। তিনি জানান, আমরা দু-মুঠো খাবারের জন্য বাংলাদেশের শেষ প্রান্তে এসেছি। আমাদের মত শত শত গরীব অসহায় বেদে পরিবার বেঁচে থাকার তাগিতে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় গিয়ে একই পেশায় নিয়জিত। সরকার বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিলেও বেদে সম্প্রদায়ের সচ্ছল পরিবাররাই এ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। আমাদের মত গরীব অসহায় বেদে সম্প্রদায় এ সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাই আমরা দু-মঠো খাবারের জন্য স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে দেশে বিদেশে ঘুরে জীবন বাঁচার জন্য লড়াই সংগ্রাম করছি।